আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পুরোনো ঋণ কর্মসূচি থেকে সরে এসে নতুন করে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি নিতে আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ সরকার। তিন বছর মেয়াদি এই কর্মসূচির আওতায় ঋণ পেতে ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কার, বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া, করছাড় যৌক্তিক করা এবং বিভিন্ন খাতে সরকারি ভর্তুকি কমানোর মতো শর্ত নিয়ে দর-কষাকষি চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বর মাসে নতুন ঋণচুক্তি হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রের বরাতে জানা গেছে, নতুন ঋণ কর্মসূচির শর্ত চূড়ান্ত করতে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আগামী নভেম্বর মাসে সংস্থাটির একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করতে পারে। ওই সফরে সংস্কার কর্মসূচি ও ঋণের শর্ত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করবে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি এ বিষয়ে আইএমএফের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবে বলে জানা গেছে।
পুরোনো কর্মসূচিতে কেন অচলাবস্থা ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদন করে আইএমএফ। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০২২ সালের জুলাই মাসে ঋণসহায়তা চেয়ে সংস্থাটির কাছে আবেদন করেছিল। সাত কিস্তিতে অর্থ ছাড়ের পরিকল্পনা থাকলেও পরবর্তী সময়ে কর্মসূচিটির আকার ও শর্তে পরিবর্তন আসে।
২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঋণ কর্মসূচির আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়। এর মধ্যে পাঁচ কিস্তিতে প্রায় ৩৬৪ কোটি ডলার ছাড় হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি অর্থ পেতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের শর্ত ছিল।
তবে ব্যাংক ও রাজস্ব খাতে সংস্কারের ধীরগতি, করছাড় কমানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতির অভাব এবং জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণে কর্মসূচিটি এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমান সরকারও আগের কর্মসূচির পরিবর্তে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগ নেয়।
গত এপ্রিল মাসে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় সরকার পুরোনো কর্মসূচি আর এগিয়ে নিতে না চাওয়ার বিষয়টি জানায়। পরে ৩ জুন নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানো হয়। আইএমএফও নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিল।
নতুন ঋণের শর্তে সংস্কারই প্রধান নতুন ঋণ কর্মসূচিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে আইএমএফ। এর মধ্যে রয়েছে—
১. বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করা।
২. জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রম পৃথক করা।
৩. করছাড় ও কর অব্যাহতির সুযোগ যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা।
৪. সরকারের বিভিন্ন খাতের ভর্তুকি কমানো বা প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বিন্যাস করা।
৫. রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করা।
৬. দেউলিয়াবিষয়ক আইন ও সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়া।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, এসব শর্তের অনেকগুলোই আগের ঋণ কর্মসূচিতেও ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। নতুন কর্মসূচিতে সংস্কারের জন্য বাড়তি সময় ও বাস্তবায়নের নতুন সময়সীমা নির্ধারণের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
এনবিআর সংস্কারেও ধীরগতি
রাজস্ব খাতের সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আগের কর্মসূচির অন্যতম শর্ত ছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাঠামো পুনর্গঠন করে রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব আলাদা করা।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এ-সংক্রান্ত সংস্কার বাস্তবায়নের শর্ত থাকলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে সেটিকে আইনে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া এগোয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি পর্যালোচনায় একটি কমিটি গঠন করা হলেও কমিটির প্রতিবেদন ও পরবর্তী সিদ্ধান্তের অগ্রগতি এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, করছাড় যৌক্তিক করা এবং প্রতিবছর জিডিপির অতিরিক্ত শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশের সমপরিমাণ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যও পূরণ করা যায়নি। ফলে সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হচ্ছে। রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না থাকায় বাজেটের ব্যয় মেটাতে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার চাপও বাড়ছে।
ব্যাংক খাতে কিছু অগ্রগতি, ভর্তুকিতে চাপ ব্যাংক খাতের সংস্কারে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার শর্ত এখনো পূরণ হয়নি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন প্রণয়ন এবং পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে আর্থিক খাতে সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত করা যায়, তার ওপর।
অন্যদিকে, জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে সরকারি ভর্তুকি কমানোর ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি হয়নি; বরং ভর্তুকির চাপ বেড়েছে। ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে তার প্রভাব পড়তে পারে। তাই এ ধরনের সংস্কারে আর্থিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় রাখা জরুরি।
সংস্কার কি শুধু ঋণ পাওয়ার জন্য?
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, ব্যাংক ও রাজস্ব খাতে সংস্কার এবং ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে আগের ঋণ কর্মসূচি প্রত্যাশিতভাবে এগোয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন কর্মসূচিতেও আইএমএফ একই ধরনের সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেবে। এসব সংস্কার কেবল ঋণ পাওয়ার শর্ত হিসেবে নয়, দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থেই বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার আটকে রেখে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা সময়ের অপচয়। আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কর্মসূচি থাকলে সংস্কারের সময়সীমা ও বাস্তবায়নের চাপ তৈরি হয়।
নতুন ঋণ কি অর্থনীতির চাপ কমাবে?
নতুন ঋণ বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়নের চাহিদা পূরণে সহায়তা করতে পারে। তবে ঋণ পাওয়া মানেই অর্থনীতির কাঠামোগত সমস্যার সমাধান নয়। রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো না গেলে ঋণের ওপর নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকতে পারে।
একই সঙ্গে ভর্তুকি কমানো ও করছাড় পুনর্বিন্যাসের মতো পদক্ষেপের সামাজিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। এসব সংস্কার কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, কারা সুবিধা পাচ্ছে এবং কারা বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়ছে—তা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সরকার নতুন ঋণ কর্মসূচি এগিয়ে নিতে আগ্রহী এবং এ বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। তাঁর প্রত্যাশা, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে।
সব মিলিয়ে নতুন ঋণ কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য অর্থায়নের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংস্কারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
ঋণচুক্তি সম্পন্ন হলে তার শর্ত কতটা বাস্তবসম্মতভাবে বাস্তবায়িত হয়, রাজস্ব আদায় কতটা বাড়ে এবং সাধারণ মানুষের ওপর সংস্কারের প্রভাব কীভাবে সামাল দেওয়া হয়—এসবের ওপরই কর্মসূচিটির সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে।
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.