হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন বিএপিএসের একটি প্রতিনিধিদলের সফরের সময় নারী কর্মীদের দায়িত্ব থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় প্যারিসের বিখ্যাত এফিল টাওয়ার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক প্যাট্রিক ব্রাঙ্কো রুইভো চলতি বছরের শেষ নাগাদ পদত্যাগ করবেন। এফিল টাওয়ার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সোসিয়েতে দেক্সপ্লোয়তাসিওঁ দ্য লা তুর এফেল মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর বিএপিএস-এর একটি হিন্দু ধর্মীয় প্রতিনিধিদল এফিল টাওয়ার পরিদর্শন করে। প্যারিস অঞ্চলে একটি ঐতিহ্যবাহী হিন্দু পাথরের মন্দির উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে ওই সফরের আয়োজন করা হয়েছিল। সফরের পর অভিযোগ ওঠে, প্রতিনিধিদলের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এফিল টাওয়ারের নারী কর্মীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছিল এবং তাদের পরিবর্তে পুরুষ কর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
ঘটনার পর একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তদন্ত করা হয়। তদন্তে ওই সফরের আয়োজন ও ব্যবস্থাপনায় একাধিক পরিচালনাগত ব্যর্থতা ও ত্রুটি শনাক্ত হয়। সোসিয়েতে দেক্সপ্লোয়তাসিওঁ দ্য লা তুর এফেল এক বিবৃতিতে জানায়, এসব ব্যর্থতার ফলে সেদিন নারী কর্মীদের সফর থেকে বাদ দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা প্রতিষ্ঠানটির ভাষায় “অগ্রহণযোগ্য”।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এফিল টাওয়ারের কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। ৭ সেপ্টেম্বর কর্মীরা ধর্মঘটে গেলে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। একজন ইউনিয়ন কর্মকর্তা ব্যবস্থাপনার দেওয়া নির্দেশনাকে “অগ্রহণযোগ্য” বলে উল্লেখ করেন। নারী কর্মীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখার বিষয়টি কর্মীদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
তবে বিএপিএস নারী কর্মীদের বাদ দেওয়ার জন্য কোনো অনুরোধ করার কথা অস্বীকার করেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, তারা কখনো নারী কর্মীদের লুকিয়ে রাখা, সরিয়ে দেওয়া বা সফর থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ করেনি। সংগঠনটির ভাষ্য, তাদের সন্ন্যাসীদের ধর্মীয় অনুশীলন সম্পর্কে এফিল টাওয়ার কর্তৃপক্ষকে আগে থেকেই জানানো হয়েছিল। এসব ছিল সন্ন্যাসীদের ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক অঙ্গীকার, যা অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়। BAPS আরও জানায়, তাদের ধর্মীয় অনুশীলনের কারণে কোনো স্থানে নারীদের বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে সন্ন্যাসীদের ওই অনুশীলনগুলো কী, সে বিষয়ে সংগঠনটি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি।
এদিকে, স্বাধীন তদন্তের ফলাফলে সফরটি পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির বিষয়টি সামনে আসার পর প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক প্যাট্রিক ব্রাঙ্কো রুইভোর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তিনি ২০১৮ সালের শেষ দিকে এফিল টাওয়ার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। চলতি বছরের শেষ নাগাদ তিনি দায়িত্ব ছাড়বেন।
ঘটনার পর ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে নতুন ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সোসিয়েতে দেক্সপ্লোয়তাসিওঁ দ্য লা তুর এফেল। বিশেষ প্রটোকল জোরদার করার পাশাপাশি কর্মীদের লিঙ্গসমতা ও সমঅধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদলের সফরের সময় তাদের ধর্মীয় অনুশীলনের প্রতি সম্মান বজায় রাখার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
প্রায় ৩৩০ মিটার উঁচু এফিল টাওয়ার প্যারিসের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ। প্রতি বছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষ এই স্থাপনা পরিদর্শন করেন। ফলে নারী কর্মীদের বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্ক শুধু কর্মক্ষেত্রের ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গসমতার প্রশ্নও সামনে এনেছে। রুইভোর পদত্যাগের পর নতুন নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা কীভাবে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।