পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি ঘিরে দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে পর্যটকের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। ঈদের দ্বিতীয় দিন রোববার (২২ মার্চ) সকাল থেকেই বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে পর্যটকদের উপস্থিতিতে সরগরম হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্টজুড়ে দেখা গেছে উপচে পড়া ভিড়।
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার ঈদে ১০ থেকে ১১ লাখ পর্যটক কক্সবাজার ভ্রমণে আসতে পারেন। এতে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যে ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকেই সৈকত ও হোটেল-মোটেল জোনে ব্যাপক পর্যটক সমাগম শুরু হয়েছে।
সৈকতের বালুচরে সকাল থেকে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে সময় কাটাতে দেখা যায় হাজারো পর্যটককে। কেউ সাগরে নেমে সমুদ্রস্নান করছেন, কেউ জেটস্কি বা স্পিডবোটে চড়ছেন। আবার কেউবা বিচ বাইক কিংবা ঘোড়ার পিঠে চড়ে উপভোগ করছেন সৈকতের সৌন্দর্য। সাগরের নীল জলরাশি, নরম বালুচর আর হালকা বাতাস মিলিয়ে এক ভিন্ন আবহ তৈরি হয়েছে পুরো এলাকায়।
সৈকতের প্রতিটি পয়েন্টে পর্যটকদের ছবি তোলা, আড্ডা দেওয়া আর আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠার দৃশ্য ছিল চোখে পড়ার মতো। শিশুদের কোলাহল আর বড়দের উচ্ছ্বাস মিলিয়ে ঈদের আনন্দ যেন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো সৈকতজুড়ে।
রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক কবির আহমদ বলেন, পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে কক্সবাজারে আসা তার দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল। এখানে এসে সমুদ্র, পাহাড় আর সবুজ প্রকৃতির মিলন দেখে তিনি মুগ্ধ।
চট্টগ্রামের রাউজান থেকে আসা আফরুজা সেলি বলেন, সমুদ্রস্নান ও বিচ বাইক ভ্রমণ করে বেশ আনন্দ পাচ্ছেন। পর্যটকের চাপ বাড়লেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সন্তোষজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঢাকার বনশ্রী থেকে আসা নাজমুল বলেন, প্রতিবছর ঈদে কক্সবাজারে আসেন তারা। এবার ভিড় তুলনামূলক বেশি হলেও প্রশাসনের প্রস্তুতি ভালো মনে হয়েছে।
সিলেট থেকে আসা কামরুল হাসান বলেন, পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে সময় কাটানো এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটি অনেক আনন্দের।
হোটেল-মোটেল মালিকরা জানান, ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকেই অধিকাংশ হোটেলের কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে। আগামী কয়েক দিন পর্যটকের চাপ আরও বাড়বে বলে তারা আশা করছেন।
হোটেল ওশান প্যারাডাইজের পিআরও সায়ীদ আলমগীর বলেন, ১৯ মার্চ থেকে পর্যটক আসা শুরু হয়েছে এবং ২৩ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
কক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ঈদের পরদিন থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক লাখ পর্যটক কক্সবাজারে আসতে পারেন। এই ধারা টানা ১০ দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এতে পর্যটন খাতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রবাহ তৈরি হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ট্যুরিস্ট পুলিশ, জেলা পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। সৈকত এলাকায় বাড়ানো হয়েছে পুলিশি টহল। ইউনিফর্মধারী সদস্যদের পাশাপাশি সাদা পোশাকে নজরদারি দল ও গোয়েন্দা টিমও কাজ করছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পরিদর্শক পারভেজ আহমেদ বলেন, তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করছে বিভিন্ন টিম।
সৈকতে দায়িত্ব পালনকারী লাইফগার্ড সদস্যরা জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে লাল পতাকা টাঙানো হয়েছে। পর্যটকদের সতর্ক করে নিরাপদে সমুদ্রস্নানের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজার সি সেফ লাইফ গার্ডের ফিল্ড টিম লিডার ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, দুর্ঘটনা এড়াতে নিয়মিত মাইকিং ও নজরদারি চালানো হচ্ছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে জেলা পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ঈদের ছুটিতে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমনকে সামনে রেখে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে জমে উঠেছে পর্যটনের মৌসুম। সৈকতের ঢেউ, বালুচর আর মানুষের উচ্ছ্বাস- সবকিছু মিলিয়ে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে পুরো সমুদ্রনগরী।
