দুই যুগ ধরে দুর্গম চরাঞ্চলে নৌকা ঘাটে সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সহ এলাকাবাসী।
কিন্তু ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর কেউ আর খোঁজ নেয় না। আর স্থানীয় এমপি-মন্ত্রীদের কাছে ধরনা দিলে শুধু আশ্বাস মিললেও, সেতু নির্মাণ হয় না। সেই সেতু হয় হয় করেও হচ্ছেনা।
এসব কথা বলেন সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার মনসুর নগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান কামরুল হাসান গোলজার। তিনি বলেন, ভেটুয়াঘাট হয়ে প্রতিদিন কমপক্ষে দেড় থেকে থেকে দুই হাজার মানুষ স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, বাজার ও সরকারি অফিসে চলাচল করে। কিন্তু সেতু না থাকায় কী যে কষ্ট, সেটা দুইপাড়ের মানুষ ছাড়া কেউ বোঝেনা। এই আক্ষেপ শুধু আমার না, ঘাটের দুই পারের হাজারও মানুষের।
জানা যায়, যমুনার একটি শাখা নদী ভেটুয়া। নদীর পশ্চিমে সিরাজগঞ্জের সদর ও কাজীপুর উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন এবং পূর্ব অংশে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
এসব ইউনিয়নের মানুষ সেতু না থাকায় নৌকায় করে এ ঘাটে নদী পারাপার হচ্ছে। ঘাটের দুইপাড়ে থাকা নৌকা দুটিও নড়বড়ে। তবুও ২০ থেকে ২৫ জনেরও বেশি লোক ঝুঁকি নিয়েই পারাপার হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে সাদাবালু পেরিয়ে চলাচল করলেও বর্ষায় নৌকাই তাদের একমাত্র ভরসা। ঘাটটি দিয়ে টাঙ্গাইল জেলার ভূয়াপুর এলাকার বেশ কিছু ব্যবসায়ী কৃষিপণ্য নিয়ে নিয়মিত চলাচল করেও বলে জানান স্থানীয়রা।
কৃষক আব্দুল কাদের (৫৬) বলেন, সেতু না থাকায় তারা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এলাকার লোকজন বারবার সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। নেতারা ভোটের আগে আশ্বাস দিলেও, সেতু নির্মাণ হয়নি। এতে দুই পারের ১৫টি ইউনিয়নের মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে।
ভেটুয়াঘাট এলাকার মুদি ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, এ অঞ্চলের মানুষের সমাগমের একমাত্র স্থান নাটুয়ারপাড়া হাট। আর এ হাটে যেতে নিয়মিত নৌকায় নদী পার হতে হয়। ব্যবসায়ী, ক্রেতা ও বিক্রেতা ছাড়াও গবাদিপশু নিতেও নৌকায় চলাচল করতে হয়। সেতু না থাকায় মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়েই পারাপার হচ্ছে। তবে বর্ষাকালে নদীর প্রশস্ত আরও বেড়ে ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। ফলে নৌকা চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে বলে তিনি জানান।
আলহাজ্ব ফরহাদ আলী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে বলেন, বর্ষা মৌসুমে ভেটুয়া নদী পারাপারে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় কলেজে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায়। এতে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীরাও পাঠদান থেকে বঞ্চিত হওয়ায় ফলাফল খারাপ করে। নদীর ওপর সেতুটি নির্মিত হলে শিক্ষা ছাড়াও চরাঞ্চলের কৃষকরা উৎপাদিন ফসল বিক্রি করে লাভবান হবে তিনি দাবি করেন।
মাজনাবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামাল উদ্দিন বলেন, আমাদের এই ভোগান্তি কেউ দেখতে আসে না। আর ভোগান্তি কবে শেষ হবে জানি না। কতবার কত লোক এসে মাপ নিল। কিন্তু কোনো কাজই তো হলো না।
নৌকায় পারাপার হওয়া আবুল হোসেন বলেন, সেতু নির্মাণের দাবিটা দীর্ঘদিনের। কিন্তু এখনো সেতু হয়নি। কেবলমাত্র আশ্বাসই মিলেছে। সেতু আদৌ হবে কিনা, সেটা নিয়েও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
এদিকে জনদুভোর্গের বিষয়টি স্বীকার করে কাজীপুর উপজেলা প্রকৌশলী মুনসুরুল হক বলেন, ওই ঘাটে সেতু নির্মাণের জন্য কিছুদিন আগে চীনা প্রকৌশলীর একটি দল সম্ভাব্যতা যাচাই করতে এসেছিল। তবে এখন সেটার কি অবস্থা, সেই সম্পর্কে আমি অবগত নই।
এ প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ-১ (কাজীপুর-সদরের আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য সেলিম রেজা বলেন, এলাকাবাসী বহুদিন ধরে ওই সেতু নির্মাণের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। কিন্তু আমি এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই সেতুটি বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছি। কিছুদিন আগে চীনা প্রকৌশলীদের একটি বিশেষ দল স্থান পরিদর্শন করে গেছে। আশা করা যায়, অল্প সময়ের মধ্যেই দুর্ভোগ দূর হবে।