
ছবি: প্রতিনিধি
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় দিন দিন বাড়ছে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, অটোরিকশা ও অটোভ্যানের সংখ্যা। সহজ যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করলেও এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে স্থানীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে বলে মনে করছেন অনেক বাসিন্দা। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় ভোল্টেজের ওঠানামা ও লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তি বাড়ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ছাড়াও ঢাকা-কাপাসিয়া-কিশোরগঞ্জ মহাসড়ক এবং শ্রীপুর, কালীগঞ্জ ও মনোহরদীগামী সড়কে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক ব্যাটারিচালিত যান চলাচল করছে। এসব যানের চার্জিংয়ের জন্য বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় গ্যারেজ ও চার্জিং কেন্দ্র। কাপাসিয়া বাসস্ট্যান্ড, তরগাঁও মোড়সহ বেশ কয়েকটি এলাকায় প্রতিদিন শত শত যানবাহন চার্জ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করেই বাণিজ্যিকভাবে চার্জিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর একযোগে বহু যানবাহন চার্জে বসানো হলে বিদ্যুতের চাপ বেড়ে যায়। ফলে অনেক এলাকায় ভোল্টেজ কমে গিয়ে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে সমস্যা দেখা দেয়।
কাপাসিয়া সদর ইউনিয়নের বানরহাওলা এলাকার বাসিন্দা মো. আব্দুল্লাহ বলেন, রাতে প্রায়ই ভোল্টেজ কমে যায়। এতে ফ্যান, ফ্রিজসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না।
সনমানিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা রওশন আরা বেগম জানান, লোডশেডিং হলে গরমের মধ্যে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়।
তরগাঁও ইউনিয়নের ব্যবসায়ী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভুলেশ্বর গ্রামের এক দুগ্ধ ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দই ও দুগ্ধজাত পণ্য সংরক্ষণে সমস্যা হচ্ছে এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
তবে ইজিবাইকচালকদের মতে, জীবিকার প্রয়োজনে চার্জিংয়ের বিকল্প নেই। চালক আবুল হোসেন বলেন, নির্ধারিত চার্জিং স্টেশন থাকলে সুবিধা হতো। বর্তমানে প্রতিদিন চার্জ বাবদ প্রায় ১০০ টাকা ব্যয় করতে হয়।
অটোরিকশাচালক সুজন জানান, তিনি যে গ্যারেজে চার্জ দেন সেখানে নিয়মিত প্রায় ১০টি অটোরিকশা চার্জ করা হয়।
কাপাসিয়া গ্রামের বাসিন্দা জামাল বলেন, বাড়িতে অটো চার্জ দেওয়ার কারণে তার মাসিক বিদ্যুৎ বিল ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে আসে।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বিদ্যুৎ ঘাটতির জন্য শুধু ইজিবাইককে দায়ী করার সুযোগ নেই।
কাপাসিয়া জোনাল অফিসের ব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. মাহবুব আলম জানান, তাদের আওতাধীন এলাকায় বর্তমানে প্রায় ২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ২৩ মেগাওয়াট। বরাদ্দ স্বল্পতা ও উৎপাদন কেন্দ্রে কারিগরি সমস্যার কারণে অনেক সময় লোডশেডিং দিতে হয়।
তিনি বলেন, ইজিবাইকের জন্য পৃথক বিদ্যুৎ ট্যারিফ রয়েছে। শুধুমাত্র ইজিবাইকের চার্জিংয়ের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হচ্ছে—এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
ভোল্টেজ সমস্যা সম্পর্কে তিনি বলেন, ঝড়-বৃষ্টি, গাছপালা বিদ্যুতের লাইনে পড়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন কারিগরি কারণেই বেশিরভাগ বিভ্রাট ঘটে।
তিনি আরও জানান, কাপাসিয়া জোনাল অফিসের আওতায় বর্তমানে ৬০ হাজার ৩২০ জন গ্রাহক রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও উন্নত করতে লাইন সংস্কার, পুরোনো তার পরিবর্তন, নতুন লাইন নির্মাণ এবং সাবস্টেশন সম্প্রসারণের কাজ চলমান রয়েছে।
অন্যদিকে আমরাইদ সাব-জোনাল অফিসের উপব্যবস্থাপক রব্বানী হাসান জানান, তাদের এলাকায় প্রায় ৭৫ হাজার গ্রাহক রয়েছে এবং বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৩ মেগাওয়াট। অনুমোদিত চার্জিং পয়েন্ট মাত্র একটি হলেও বাস্তবে অনেক অননুমোদিত চার্জিং কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মূল কারণ হিসেবে ঝড়-বৃষ্টি ও কারিগরি ত্রুটিকেই বেশি দায়ী করা যায়।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চার্জিং ব্যবস্থাপনাকেও সুশৃঙ্খল করতে হবে। এজন্য পৃথক বাণিজ্যিক সংযোগ নিশ্চিত করা, অননুমোদিত চার্জিং কেন্দ্রের ওপর নজরদারি বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি বলে তারা মত দিয়েছেন।
তাদের মতে, এখনই কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং এর চাপ সাধারণ গ্রাহকদের ওপর আরও বেশি পড়ে যেতে পারে।