১৯৫০ সালের এই দিনে ঢাকার গুলশানে জন্মগ্রহণ করেন জাফর ইকবাল। সংগীত ছিল তার পারিবারিক ঐতিহ্যেরই অংশ। বড় ভাই আনোয়ার পারভেজ এবং ছোট বোন শাহনাজ রহমতুল্লাহ- দুজনই ছিলেন সংগীতাঙ্গনের পরিচিত মুখ। ফলে ছোটবেলা থেকেই গানের পরিবেশে বেড়ে ওঠেন তিনি। সেই সূত্রেই কৈশোর থেকেই সংগীতের প্রতি তৈরি হয় গভীর আগ্রহ।
১৯৬৬ সালে ব্যান্ড দল ‘র্যাম্বলিং স্টোন’ গঠনের মধ্য দিয়ে গায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন জাফর ইকবাল। শুধু গান গাওয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, গিটার বাজাতেও ছিলেন দক্ষ। তার সংগীত প্রতিভা নজর কাড়ে চলচ্চিত্রের মানুষদেরও। সুরকার আলাউদ্দিন আলীর সঙ্গে কাজের সূত্রে চলচ্চিত্রের আবহসংগীত তৈরিতেও যুক্ত হন তিনি। এভাবেই ধীরে ধীরে গানের জগতের পরিচিত মুখ থেকে চলচ্চিত্রের পর্দার কাছাকাছি চলে আসেন জাফর ইকবাল।
তবে তার চলচ্চিত্রে আসার গল্পটা ছিল আরও বড় পরিসরের। মুক্তিযুদ্ধের আগেই রুপালি পর্দায় যাত্রা শুরু করেন তিনি। ১৯৭০ সালে ‘আপন পর’ সিনেমার মাধ্যমে প্রধান নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন জাফর ইকবাল। এরপর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। স্বাধীনতার পর আবারও নিয়মিত হন চলচ্চিত্রে। ১৯৭৫ সালে ‘মাস্তান’ সিনেমায় নায়ক হিসেবে অভিনয় করে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন তিনি।
জাফর ইকবালের অভিনয়ের বৈচিত্র্যও ছিল চোখে পড়ার মতো। কখনো রোমান্টিক তরুণ, কখনো রাগী ও দুরন্ত যুবক, আবার কখনো জীবনযন্ত্রণায় পীড়িত কিংবা হতাশায় বিপথগামী চরিত্র- বিভিন্ন ধরনের ভূমিকায় নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন তিনি। তার অভিনয়ে ছিল নিজস্ব ভঙ্গি, আর পর্দায় উপস্থিতিতে ছিল এমন এক আকর্ষণ, যা সে সময়ের তরুণ দর্শকদের সহজেই টেনে নিত।
অভিনয়ের পাশাপাশি গানের সঙ্গেও অটুট ছিল তার সম্পর্ক। চলচ্চিত্রে তার ঠোঁটে জনপ্রিয় হয়েছে ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও’, ‘সুখে থেকো ও আমার নন্দিনী’, ‘তুমি আমার জীবন’-এর মতো অসংখ্য গান। ফলে জাফর ইকবালের পরিচয় কখনো কেবল নায়ক কিংবা কেবল গায়ক হয়ে থাকেনি। দুই পরিচয়ই তাকে দর্শকের কাছে আলাদা করে তুলেছিল।
সত্তর ও আশির দশকে তার পোশাক, চুলের স্টাইল, ব্যক্তিত্ব ও আধুনিক উপস্থিতি তাকে তরুণদের কাছে পরিণত করেছিল স্টাইল আইকনে। সে সময়ের প্রচলিত নায়কোচিত ইমেজের বাইরে গিয়ে নিজের ফ্যাশনেবল ও রুচিশীল একটি অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি। পর্দায় তার উপস্থিতি যেমন দর্শকের নজর কাড়ত, তেমনি ব্যক্তিজীবনের স্টাইলও অনুসরণ করতেন অনেক তরুণ।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নায়ক হিসেবে প্রায় ১৫০টি সিনেমায় কাজ করেছেন জাফর ইকবাল। গান দিয়ে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, সেই পথই শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে যায় চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় আলোয়। গায়ক থেকে নায়ক- দুটি ভিন্ন জগতের এই সফল যাত্রাই জাফর ইকবালকে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আলাদা একটি পরিচয় দিয়েছে।