দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। রায় ঘোষণার পাঁচ দিন পর আজ মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রামের মহানগর দায়রা জজ ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক এস এম মজিবুর রহমান ৫১৪ পৃষ্ঠার এই পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্বাক্ষর করেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফাকে (ULFA) শক্তিশালী করতেই তৎকালীন প্রভাবশালী মহলের ‘গ্রিন সিগন্যালে’ এই বিশাল অস্ত্রের চালান বাংলাদেশে আনা হয়েছিল।

পর্যবেক্ষণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ‘নীরবতা’
রায়ের পর্যবেক্ষণে ২০০৪ সালের সেই ঘটনার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভূমিকা নিয়ে কঠোর পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত। সেখানে বলা হয়েছে, এত বড় একটি অস্ত্রের চালান ধরা পড়ার পরও তৎকালীন সরকার প্রধানের ‘নীরবতা ও নির্লিপ্ততা’ ছিল রহস্যজনক। এটি প্রমাণ করে যে, ঘটনার গভীরতা সম্পর্কে উচ্চমহল অবগত ছিল।
উলফা ও গোয়েন্দা সংস্থার ‘গভীর সখ্য’
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, এই চোরাচালানের সঙ্গে উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়ার সঙ্গে তৎকালীন বাংলাদেশের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ‘গভীর সম্পর্ক’ ছিল। এনএসআই ও ডিজিএফআই-এর তৎকালীন কর্মকর্তারা এই অপরাধ ঠেকানোর চেষ্টা তো করেননি, উল্টো একে অন্যকে জড়িয়ে যে জবানবন্দি দিয়েছেন, তাতে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা স্পষ্ট হয়েছে। চীনের তৈরি এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ সমুদ্রপথে আনা হয়েছিল মূলত বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতে পাচার করার জন্য।
সিইউএফএল ঘাট ও রাজনৈতিক প্রভাব
রায়ে আরও বলা হয়, জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর নিয়ন্ত্রণে থাকা সিইউএফএল (CUFL) জেটিঘাট এই অস্ত্র খালাসের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। কোনো রাজনৈতিক হয়রানি নয়, বরং অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতেই এই রায় দেওয়া হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ: “আসামিদের অনেকেই সরকার ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য হয়েও দেশপ্রেমের বদলে অপরাধীদের সহায়তা করেছেন। লুৎফুজ্জামান বাবর ও তারেক রহমানের সবুজ সংকেত ছাড়া রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর এমন তৎপরতা অসম্ভব।”
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৪ আসামি
গত ৩০ জানুয়ারি ঘোষিত রায়ের ধারাবাহিকতায় পূর্ণাঙ্গ রায়েও ১৪ আসামির সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন:
- মতিউর রহমান নিজামী: সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতের আমির।
- লুৎফুজ্জামান বাবর: সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
- পরেশ বড়ুয়া: উলফার সামরিক কমান্ডার (পলাতক)।
- মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী: সাবেক মহাপরিচালক, ডিজিএফআই।
- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আবদুর রহিম: সাবেক মহাপরিচালক, এনএসআই।
- এছাড়াও এনএসআই-এর মাঠ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সিইউএফএল-এর তৎকালীন কর্মকর্তারা এই তালিকায় রয়েছেন।
বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫বি ও ২৫ডি ধারায় মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেকের ৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও আইনি লড়াই
২০০৪ সালের ১ এপ্রিল মধ্যরাতে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে সিইউএফএল জেটিঘাটে দুটি মাছ ধরার ট্রলার থেকে অস্ত্র খালাস করে ট্রাকে তোলার সময় পুলিশ এই বিশাল চালান আটক করে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে ছিল ৬৯০টি এসএমজি, ১৫Base রকেট লঞ্চার এবং বিপুল পরিমাণ গ্রেনেড ও গোলাবারুদ।
দীর্ঘ ১০ বছর মামলাটি ঝুলে থাকলেও ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার আসল রূপ বেরিয়ে আসে। এরপর ৫৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করা হলো।
