নতুন ভিসা নীতিতে বিদেশি সাংবাদিকদের কাজে বিধিনিষেধ, প্রত্যাহারের দাবি এফবিজেএর

নতুন ভিসা নীতিতে বিদেশি সাংবাদিকদের কাজে বিধিনিষেধ, প্রত্যাহারের দাবি এফবিজেএর

 

শাহ রিয়ার রিজবি , ফ্রান্স থেকে। 
২৭ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের নতুন ভিসা নীতি ২০২৬-এর আওতায় বিদেশি সাংবাদিক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতাদের কাজের ওপর আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ফ্রান্স-বাংলাদেশ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (এফবিজেএ)। সংগঠনটি বলেছে, স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে বিদেশি সাংবাদিকদের পেশাগত কর্মকাণ্ডে কোনো ধরনের অযাচিত সরকারি নিয়ন্ত্রণ, হস্তক্ষেপ বা বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত নয়।

মঙ্গলবার প্যারিস থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এফবিজেএ নতুন ভিসা নীতির আওতায় বিদেশি সাংবাদিক ও তথ্যচিত্র নির্মাতাদের জন্য আরোপিত শর্তগুলোর তীব্র সমালোচনা করে। সংগঠনটির কমিউনিকেশন অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস সেলের পক্ষে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন নিয়াজ মাহমুদ ও মোমিন আনসারি।

বিবৃতিতে বলা হয়, নতুন নীতির আওতায় বিদেশি সাংবাদিকদের বাংলাদেশে অবস্থান করে সংবাদ, প্রতিবেদন বা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সরকার মনোনীত একজন প্রতিনিধির উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার মতো শর্ত আরোপ করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে ফেরার আগে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক বা নির্মাতাকে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট বা এনওসি সংগ্রহ করতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের শর্ত স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই এবং সাংবাদিকতার স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে করছে এফবিজেএ।

সংগঠনটির মতে, একজন সাংবাদিকের কাজের মূল ভিত্তি হলো স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ, বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলা, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা এবং সম্পাদকীয় নীতির আলোকে প্রতিবেদন তৈরি করা। সংবাদ সংগ্রহের পুরো প্রক্রিয়ায় সরকারি প্রতিনিধি উপস্থিত থাকলে সাংবাদিক ও তার সংবাদসূত্রের মধ্যে স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে সাক্ষাৎকারদাতা বা তথ্যদাতারা নিজেদের বক্তব্য প্রকাশে অস্বস্তি কিংবা অনীহা বোধ করতে পারেন। ফলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সংবাদ ও তথ্যের বৈচিত্র্য এবং নিরপেক্ষতার ওপর পড়তে পারে বলে সংগঠনটি মনে করে।

এফবিজেএ আরও বলেছে, সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকদের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি একটি গণতান্ত্রিক সমাজে জনগণের তথ্য জানার অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। কোনো দেশের সাংবাদিকতা যত বেশি স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়, সাধারণ মানুষের কাছে তত বেশি নির্ভরযোগ্য ও বহুমাত্রিক তথ্য পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়। বিদেশি সাংবাদিকদের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য বলে মনে করে সংগঠনটি।

বিবৃতিতে জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে এফবিজেএ বলেছে, ওই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং নাগরিক অধিকারের ওপর আরোপিত বিভিন্ন বাধা ও নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে মানুষের অবস্থান। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মানুষ এমন একটি পরিবেশের প্রত্যাশা প্রকাশ করেছিল, যেখানে সাংবাদিকরা ভয়, চাপ কিংবা অযাচিত হস্তক্ষেপ ছাড়াই তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন করে এমন কোনো নীতি বা ব্যবস্থা গ্রহণ, যা সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করতে পারে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

এফবিজেএর বিবৃতিতে সাংবাদিকতার পেশাগত নৈতিকতা ও সম্পাদকীয় স্বাধীনতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, কোনো সাংবাদিককে এমন কোনো চুক্তি, অঙ্গীকারনামা বা নথিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা উচিত নয়, যার মাধ্যমে তার পেশাগত দায়িত্ব পালনের স্বাধীনতা সীমিত হয়। বিশেষ করে সংবাদসূত্রের পরিচয় ও তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা সাংবাদিকতার একটি মৌলিক নীতি। এই অধিকার ক্ষুণ্ন হলে সাংবাদিকদের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে কথা বলা ব্যক্তিরাও ভবিষ্যতে তথ্য দিতে অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন।

সংগঠনটি মনে করে, বিদেশি সাংবাদিকদের কাজের ক্ষেত্রে যদি অতিরিক্ত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি করা হয়, তাহলে বাংলাদেশ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সংবাদ ও তথ্য পরিবেশনের ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দেশটির রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, সেগুলো তৈরির ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ থাকা জরুরি। একইভাবে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাজের স্বাধীনতাও সমানভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছে এফবিজেএ।

এ অবস্থায় বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি নতুন ভিসা নীতি ২০২৬-এর আওতায় স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সংবাদ সংগ্রহের ওপর বিধিনিষেধ সৃষ্টি করে এমন সব ব্যবস্থা অবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে ফ্রান্স-বাংলাদেশ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন। একই সঙ্গে বিদেশি ও স্থানীয় সাংবাদিকদের কোনো ধরনের ভয়, চাপ বা সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়াই পেশাগত দায়িত্ব পালনের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

এফবিজেএ আরও বলেছে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সম্পাদকীয় স্বায়ত্তশাসন এবং সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার রক্ষা করা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ভিন্নমত ও সমালোচনামূলক সাংবাদিকতার সুযোগ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই একটি রাষ্ট্রে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার পরিবেশ শক্তিশালী হয়। তাই ভিসা নীতির মতো প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যেন কোনোভাবেই সীমিত না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

বিবৃতির শেষাংশে এফবিজেএ বিশ্বের সব সাংবাদিক ও গণমাধ্যম সংগঠনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে, যারা স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জনগণের অবাধ তথ্য পাওয়ার অধিকার রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। সংগঠনটি বলেছে, সাংবাদিকদের ভয় বা কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই সত্য ও জনস্বার্থের বিষয়গুলো তুলে ধরার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশের নতুন ভিসা নীতিতেও সেই নীতির প্রতিফলন থাকা উচিত বলে মত দিয়েছে এফবিজেএ।

শাহ রিয়ার রিজবি – ফ্রান্স প্রতিনিধি, ঢাকা ইনফো২৪

শাহরিয়ার রিজবি একজন বাংলাদেশি সাংবাদিক, যিনি অনলাইন সংবাদমাধ্যম DhakaInfo24-এর সঙ্গে যুক্ত।Shahriar Rijvi is a Bangladeshi journalist working with DhakaInfo24.