তেলাপোকা পার্টির অভিজিৎ দিপকে কিংবা আইসা সভাপতি নেহা বোরাকে নিয়ে মূলধারার কোনো কৌতুহলই ছিল না। ঠিক যেমন ছিল না ভারতের গদি মিডিয়াকে চ্যালেঞ্জ করা ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে নিয়ে। অথচ সেই তারাই এখন মোদি সরকারের ঘুম হারাম করে দিচ্ছেন। রাহুল-প্রিয়াঙ্কাও যোগ দিয়েছেন তাদের দলে।
বিজেপি সরকার টিকবে কিনা- সেই প্রশ্নকে জোরালো করছেন তারা। নিরুপায় ভারতীয় মূলধারা ট্যাবু ভেঙে ধ্রুব, অভিজিৎ, নেহাদের মতো ইনফ্লুয়েন্সারদের কাভার করতে এখন মরিয়া।
আন্দোলনের স্টাইলও ছিল অভিনব। মূলধারার মিডিয়াও যাদের বুঝেই উঠতে পারেনি। এখন অবধি সেই ধাক্কা সামলাতে পারছে না। আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তরা এখনও সোশ্যাল মিডিয়া-নির্ভর জেনারেশনকে ‘ঘৃণাভরে’ স্মরণ করছে, ‘গালাগালি’ করছে। দশক আগেও দেশীয় মূলধারার কাছে সোশ্যাল মিডিয়ার পাত্তা পাওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না।
অভিজাত সিনিয়ররা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকেই রাগে গজগজ করতেন। নাকে রুমাল চেপে বেরও হয়ে যেতেন। তাদের ভাষ্য ছিল, সোশ্যাল মিডিয়া সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়ায় ‘টোকাইরা’ (প্রান্তিক) এসে রুচিবোধ নষ্ট করছে, পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। যেভাবে অনলাইন-ডিজিটালের নাম শুনলে এখনও কপাল কুচকায় কথিত মূলধারা।
বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, দেশজুড়ে বিশাল নেটওয়ার্কের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো এখনও চাপাতি, পিস্তল, হেলমেটের ওপরেই ভরসা রাখছেন। অনেকে ক্ষমতার স্বপ্নও দেখছেন সেই হকিস্টিক-হেলমেট-পেশির ওপর ভরসা করেই।
দেশের বাইরে থেকে হুমকি-ধামকিও দিচ্ছেন, লাইভে এসে আশি-নব্বই দশকের স্টাইলে বক্তব্য ঝেড়ে বিদায়ও নিচ্ছেন। ঠিক একইভাবে সোশ্যাল মিডিয়াকে পাত্তা না দেওয়ায় প্রতিদিন জালে আটকাচ্ছেন ক্ষমতাসীন নেতারাও।
গবেষকদের ভাষ্য, মূলধারা নয়, শক্তিশালী রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরি করছে এখন সোশ্যাল মিডিয়া। ফলে ন্যারেটিভ তৈরিতে মূলধারা এখন ‘ধারহীন’। সোশ্যাল মিডিয়াই হয়ে উঠছে মূলধারা। তরুণরা যেকোনো ঘটনার ন্যারেটিভবিহীন নির্মোহ সত্যটা জানতে সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজফিড স্ক্রোল করতে শুরু করে। জেনারেশনের এই শিফটিংটাকে বুঝতে না পারায় মূলধারা বিলুপ্তির পথ ধরেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আইকন হয়ে ওঠা দেশের অনেক তরুণ যখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি কাড়ছেন, ঠিক তখন কথিত দেশীয় মূলধারা তাদের বাইনারি ট্যাবু ভাঙতে শুরু করেছে। অস্তিত্ব রক্ষায় জাতীয় দৈনিক বা টিভিগুলো ‘দর্পচূর্ণ’ করতে বাধ্য হলেও ডিজিটাল মিডিয়ার মেধাবীরা কেন যেন ‘মূলধারা’ শুনলেই নাক সিটকাচ্ছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার স্মার্টরা হুড়মুড় করে ডিজিটাল মিডিয়ায় ঢুকে চমক দেখালেও তারা মূলধারাকে শনাক্ত করতেই পারছে না। তারা এটিকে পিছিয়ে পড়া, স্লো, ব্যাকডেটেড হিসেবে মূল্যায়ন করছে। অভিজাতদের ন্যারেটিভ তৈরির কারখানা হিসেবেও দেখছে।
অনেকে মূলধারা বলতে সিনিয়রদের নেতৃত্বে বিগ বাজেটের টিম, ওয়েজবোর্ডের স্যালারি, দল-উপদলে লড়াই, আমলাতন্ত্র, নিউজবাণিজ্য, বিদেশভ্রমণ, ব্যবসায়ী পার্টনারভিত্তিক সেমিনার বাণিজ্যকে বুঝায়।
তাছাড়া জুলাইয়ের পর চেয়ার দখল, হামলা-ভাঙচুরের হাউজগুলোও মূলধারা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে, চব্বিশের পরে মূলধারা মিডিয়ার ধার একেবারেই নষ্ট হয়েছে। বিপরীতে সোশ্যাল মিডিয়া-নির্ভর ডিজিটাল মিডিয়ার বড় বড় হাউজ তৈরি হচ্ছে।
তুখোড় মেধাবীরা ডিজিটাল মিডিয়া বাণিজ্যের নতুন ধারার জন্ম দিচ্ছে। একইসঙ্গে গতানুগতিক রাজনীতির বাইনারি দৃষ্টিভঙ্গি এড়িয়ে ‘ইনক্লুসিভ গণতান্ত্রিক সমাজ’ গঠনে ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছে।
একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম বাংলাদেশ বিনির্মাণে মূলধারার বদলে সোশ্যাল মিডিয়া-নির্ভর ডিজিটাল মিডিয়াই ভরসা হয়ে উঠছে।
অথচ, তথ্যপ্রযুক্তিময় বৈশ্বিক এই প্রবণতা বুঝতে ব্যর্থ বিনিয়োগকারীরাই কোটি কোটি টাকা ঢেলে বাজারে মেগাবাজেটের মূলধারা নিয়ে হাজির হচ্ছে। নন-আপডেটেড সিনিয়র সাংবাদিকদের দিয়ে টিম বানাচ্ছে।
যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পার্টনার হওয়ার চেষ্টা করছে। দলগুলোও সেই লোকসানি মূলধারায় ভর করে শক্তিশালী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
যদিও শেষ অবধি শত শত কোটি টাকা জলে ফেলে পর্দার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে সেসব মূলধারা। রাজনীতির বাইনারি ধারাকে প্রমোট করা এসব মূলধারার রাজত্ব শেষ না হওয়া অবধি দেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মেরুদণ্ড সোজা হবে না।
গণতান্ত্রিক ধারাও শক্তিশালী হবে না। ‘সবার জন্য দেশ’ দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠিতও হবে না। ফলে আরও কয়েক দফায় রক্ত ঝরলে তবেই ধ্রুব, অভিজিৎ, নেহাদের মতো সোশ্যাল মিডিয়া আইকনদের রাজনৈতিক মাঠের দায়িত্ব শেষ হবে।
লেখক : সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.