মঙ্গলবার , ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আন্তর্জাতিক
  4. খেলা
  5. খেলাধুলা
  6. জাতীয়
  7. তথ্য-প্রযুক্তি
  8. দেশজুড়ে
  9. প্রবাস
  10. প্রাকৃতিক দুর্যোগ
  11. বিনোদন
  12. মতামত
  13. রাজনীতি
  14. লাইফস্টাইল
  15. শিক্ষা

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির অতীত ও বর্তমান: ইতিহাসের বাঁকবদল ও নতুন প্রত্যাশা

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন । ঢাকা ইনফো।
সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬ ১:৫৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নাম শুধু দল হিসেবে উচ্চারিত হয় না, উচ্চারিত হয় একটি রাজনৈতিক ধারার প্রতীক হিসেবে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি—তেমনই একটি রাজনৈতিক শক্তি। প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক যাত্রায় দলটি কখনো ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে, কখনো রাজপথে বিরোধী শক্তির নেতৃত্ব দিয়েছে, আবার কখনো এমন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছে, যখন তার অস্তিত্বই বড় প্রশ্নের সামনে পড়েছিল। জিয়াউর রহমানের হাত ধরে যে দলের যাত্রা শুরু, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে যে দল গণআন্দোলনের শক্তিতে পরিণত হয় এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে দল আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করেছে, সেই বিএনপির ইতিহাস মূলত বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।

বিএনপির জন্ম কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার ফল ছিল না। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ প্রবেশ করে অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও রাষ্ট্রক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের এক অস্থির সময়ে। সেই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে উঠে আসেন এবং পরবর্তী সময়ে তার নেতৃত্বেই ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠিত হয়। বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক বয়ানে এই প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বহুদলীয় রাজনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জাতীয় ঐক্য, সার্বভৌমত্ব এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা গভীরভাবে যুক্ত।

বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। এই ধারণার মধ্য দিয়ে দলটি বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়কে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে। জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, গণতন্ত্র, জনগণের অংশগ্রহণ এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ওপর গুরুত্বারোপ ছিল দলটির প্রাথমিক রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপি নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় সাফল্য অর্জন করে। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে দলটি ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন লাভ করে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

তবে বিএনপির জন্ম ও বিকাশের সঙ্গে একটি মৌলিক বিতর্কও শুরু থেকেই জড়িয়ে ছিল। দলটি যেমন বহুদলীয় রাজনীতির কথা বলেছে, তেমনি তার প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সামরিক পটভূমি থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিলেন। ফলে বিএনপির গণতান্ত্রিক পরিচয়, সামরিক উত্তরাধিকার এবং রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে দলটির সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক কখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। বিএনপির ইতিহাস বুঝতে গেলে এই দ্বৈত বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড বিএনপিকে গভীর নেতৃত্ব সংকটে ফেলে। বিচারপতি আবদুস সাত্তার পরবর্তী সময়ে দলের নেতৃত্বে এলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলে যায়। ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর বিএনপির সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়। এই সময়েই খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ঘটে। ধীরে ধীরে তিনি বিএনপির প্রধান নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির চরিত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। যে দলটি একসময় রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সংগঠিত হয়েছিল, সেটিই ক্রমে রাজপথের একটি শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির ভূমিকা দলটির রাজনৈতিক বৈধতা ও গণভিত্তি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের সামনে নতুন গণতান্ত্রিক সম্ভাবনা তৈরি হয় এবং সেই নতুন বাস্তবতায় বিএনপি হয়ে ওঠে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী।

১৯৯১ সালের নির্বাচন ছিল বিএনপির রাজনৈতিক পরিণতির এক বড় পরীক্ষা। নির্বাচনে বিএনপি ১৪৪টি আসন লাভ করে সরকার গঠন করে এবং খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। একই সময়ে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে আবার সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে ফিরে যায়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের সময় অর্থনীতিতে বাজারমুখী নীতি, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রের ভূমিকার পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা দেখা যায়। শিক্ষা, নারীর অংশগ্রহণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগও নেওয়া হয়। কিন্তু সরকার পরিচালনার এই ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি বিরোধী দলের সঙ্গে তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত, সংসদ বর্জন এবং হরতালনির্ভর রাজনীতি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে অস্থিতিশীল করে তোলে। রাজনীতির দুই প্রধান শক্তির মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস তখন থেকেই ক্রমশ গভীর হতে থাকে।

১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের অধ্যায়। বিরোধী দলগুলোর বয়কটের মধ্যে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচন ব্যাপক রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। প্রবল রাজনৈতিক আন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষমতা ছেড়ে দেয়। পরবর্তী জুনের নির্বাচনে বিএনপি বিরোধী দলে চলে যায়।

এই ঘটনা বিএনপির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শিক্ষা বহন করে। ক্ষমতায় থাকার সময় যে নির্বাচনী কাঠামো নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছিল, রাজনৈতিক বাস্তবতার চাপে সেই কাঠামো পরিবর্তনের পথও বিএনপিকেই গ্রহণ করতে হয়েছিল। বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থার ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পরবর্তী বহু বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২০০১ সালের নির্বাচন বিএনপিকে আবার রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বড় বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির দ্বিতীয় পূর্ণ মেয়াদের সরকার বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিএনপি তার শাসনামলের সাফল্যের মধ্যে মেয়েদের শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণ, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার মতো বিষয় উল্লেখ করে।

কিন্তু এই সময়কাল একই সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি। রাজনৈতিক সহিংসতা, দুর্নীতির অভিযোগ, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, জঙ্গিবাদ এবং বিরোধী দলের সঙ্গে তীব্র সংঘাত সরকারটির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা এবং এর পরবর্তী তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর ক্ষত তৈরি করে। ২০০৫ সালের দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলাও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করে।

এখানেই বিএনপির অতীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য দেখা যায়। একদিকে দলটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার কিছু ক্ষেত্রে সাফল্যের দাবি করে, অন্যদিকে একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিরাপত্তা সংকটের কারণে তার সরকার কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে। ফলে বিএনপির ওই সময়কালকে কেবল সাফল্য কিংবা কেবল ব্যর্থতার চোখে দেখলে ইতিহাসের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।

২০০৬ সালের পর বাংলাদেশের রাজনীতি আবার গভীর সংকটে পড়ে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিরোধ, ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থা এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোকে নাড়া দেয়। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে এলে বিএনপি দীর্ঘ সময় বিরোধী রাজনীতিতে অবস্থান করে।

এই দীর্ঘ বিরোধী সময় বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন পর্যায়গুলোর একটি। ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিলেও নির্বাচনের পরিবেশ ও ফলাফল নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনও বিএনপি বর্জন করে। ফলে দলটির রাজনীতি ক্রমশ নির্বাচনকেন্দ্রিক আন্দোলন, সরকারবিরোধী কর্মসূচি এবং রাজপথের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

এই সময়ে বিএনপির নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসে। খালেদা জিয়ার কারাবাস ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেন। জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান—এই ধারাবাহিকতা বিএনপিকে একটি শক্তিশালী পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি দলটির জন্য একদিকে আবেগ ও সাংগঠনিক শক্তির উৎস, অন্যদিকে দলটির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্নেরও কারণ।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পড়ে এবং অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। দীর্ঘদিনের বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির সামনে তখন নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যায়।

কিন্তু এই পরিবর্তন বিএনপির জন্য শুধু সুযোগ ছিল না; ছিল নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জও। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠে নতুন প্রজন্মের শক্তি, ছাত্র ও নাগরিকভিত্তিক রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং ইসলামী রাজনৈতিক শক্তির পুনরুত্থান পুরোনো দ্বিদলীয় রাজনীতির কাঠামোকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। ফলে বিএনপিকে শুধু আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে নয়, একটি পরিবর্তিত বাংলাদেশের জন্য নতুন রাজনৈতিক প্রস্তাব নিয়ে হাজির হতে হয়।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন সেই নতুন বাস্তবতার প্রথম বড় পরীক্ষা। নির্বাচনে বিএনপি বড় বিজয় অর্জন করে এবং দীর্ঘ বিরতির পর আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে অন্তত ২০৯টি আসনে জয়ী হয়; পরবর্তী ফলাফলে তাদের আসনসংখ্যা আরও বেশি দেখানো হয়েছে। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এই প্রত্যাবর্তন বিএনপির জন্য নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাসের বিচারে এর তাৎপর্য শুধু ক্ষমতায় ফিরে আসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন যারা সরকারবিরোধী আন্দোলন করেছে, তাদের এখন রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় সরকারের সমালোচনা করা তুলনামূলক সহজ; কিন্তু ক্ষমতায় থেকে অর্থনীতি সচল রাখা, প্রশাসনকে দক্ষ করা, আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা অনেক বেশি কঠিন।

বর্তমান বিএনপির রাজনৈতিক ভাষ্যেও এই পরিবর্তনের ছাপ রয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে অর্থনৈতিক সংস্কার, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সহায়তা, দুর্নীতি দমন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। অতীতের বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্যে জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি যেভাবে কেন্দ্রীয় ছিল, বর্তমান বিএনপির বক্তব্যে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুশাসন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রশ্ন।

তবে এখানেই বর্তমান বিএনপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। জনগণ এখন আর শুধু রাজনৈতিক স্লোগান শুনতে চাইবে না; তারা বাস্তব ফলাফল দেখতে চাইবে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমবে কি না, তরুণদের কর্মসংস্থান হবে কি না, বিনিয়োগ বাড়বে কি না, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর হবে কি না, প্রশাসনে দুর্নীতি কমবে কি না—এসব বাস্তব প্রশ্নের উত্তরই সরকারের জনপ্রিয়তা নির্ধারণ করবে।

গণতন্ত্রের ক্ষেত্রেও বিএনপির সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন বিএনপি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতা, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে কথা বলেছে। এখন সেই দাবিগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করার দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তেছে। ক্ষমতায় থেকে বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং নির্বাচনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা গেলে বিএনপি তার অতীতের বিতর্ক থেকে বেরিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণ করতে পারবে।

অন্যদিকে, ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ যে কোনো সরকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সংসদে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেয়, কিন্তু কার্যকর বিরোধী দলের অভাব থাকলে রাজনৈতিক জবাবদিহিতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়। অতীতের বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিএনপির সামনে তাই সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তিকে কর্তৃত্বের শক্তিতে নয়, সংস্কারের শক্তিতে পরিণত করার পরীক্ষা রয়েছে।

বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা। তিনি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার বহন করছেন। এই উত্তরাধিকার বিএনপির সমর্থকদের কাছে শক্তিশালী আবেগের বিষয়। কিন্তু আধুনিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা পারিবারিক উত্তরাধিকারের পাশাপাশি নেতৃত্বের দক্ষতা ও ফলাফলও দাবি করে। জনগণ এখন জানতে চাইবে, তারেক রহমান কি বিএনপিকে একটি আরও প্রাতিষ্ঠানিক, আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক দলে রূপান্তর করতে পারবেন?

২০২৬ সালের আগস্টে বিএনপির দীর্ঘদিনের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাও বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতির অন্যতম মুখ হিসেবে পরিচিত একজন নেতা এখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। এর মধ্য দিয়ে বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের আরেকটি অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং নতুন রাষ্ট্র পরিচালনামুখী অধ্যায়ের সূচনা ঘটেছে।

তবে বর্তমান বিএনপির সামনে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন বাস্তবতা রয়েছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং রোহিঙ্গা সংকট—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। বিএনপির অতীতের ‘জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকেন্দ্রিক’ অবস্থানকে বর্তমানের বহুমাত্রিক বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

এখানে বিএনপির সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়ায়—ঐতিহাসিক পরিচয় কি পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে? উত্তর সম্ভবত হ্যাঁ। কারণ কোনো রাজনৈতিক দল ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করলেও যদি সময়ের পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে না পারে, তাহলে তার রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা কমে যায়। বিএনপির সামনে এখন সেই পরিবর্তনের পরীক্ষা।

তরুণ প্রজন্মের কাছে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতাও আগামী দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জিয়াউর রহমানের সময়ের রাজনৈতিক প্রজন্ম এবং বর্তমান বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এক নয়। আজকের তরুণরা শুধু জাতীয়তাবাদী পরিচয় নয়, চাকরি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান চায়। ২০২৪ সালের আন্দোলন তরুণ সমাজের রাজনৈতিক শক্তির একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে। বিএনপি যদি এই প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্রনীতিতে রূপ দিতে পারে, তাহলে দলটি নতুন রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে পারবে। আর যদি তা না পারে, তাহলে ঐতিহাসিক জনপ্রিয়তা ধরে রাখা কঠিন হবে।

বিএনপির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শক্তি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং বিস্তৃত সাংগঠনিক ভিত্তি। প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক পথচলা দলটিকে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির বহু স্তরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। দলটির একটি সুপরিচিত রাজনৈতিক প্রতীক রয়েছে, শক্তিশালী সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতাও রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে অতীতের বিতর্ক, পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ এবং জোটনির্ভরতার মতো বিষয়গুলো তার রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাও নির্দেশ করে।

আজকের বিএনপিকে তাই তার অতীতের সঙ্গে এক ধরনের দ্বৈত সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। একদিকে তাকে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে সেই উত্তরাধিকারের ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ পরিচালনা করলে চলবে না। অতীত হবে তার পরিচয়ের ভিত্তি, কিন্তু ভবিষ্যৎ হবে তার কর্মদক্ষতার পরীক্ষা।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির বর্তমান প্রত্যাবর্তন তাই কেবল একটি দলের ক্ষমতায় ফেরা নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ধারার পুনঃপ্রতিষ্ঠাও। তবে এই প্রত্যাবর্তনের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে ইতিহাসের বিচারে নয়, শাসনের ফলাফলে। বিএনপি যদি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে পারে, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে পারে, কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবর্তে সহনশীলতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে ২০২৬ সালের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।

অন্যদিকে, যদি অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটে, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ বাড়ে, বিরোধী মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা ফিরে আসে কিংবা অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে নির্বাচনী বিজয় দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সাফল্যে পরিণত নাও হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বিএনপির সামনে আজ যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো—দলটি কি তার অতীতকে শুধু গৌরবের স্মৃতি হিসেবে বহন করবে, নাকি সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির ভূমিকা নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। কিন্তু ইতিহাস কোনো দলকে চিরস্থায়ী বৈধতা দেয় না। জনগণের আস্থা প্রতিটি প্রজন্মে নতুন করে অর্জন করতে হয়। বিএনপির জন্য ২০২৬ সালের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন সেই নতুন আস্থা অর্জনের একটি বিরাট সুযোগ। এখন তাদের সামনে রাজপথের পরীক্ষা নেই; আছে রাষ্ট্র পরিচালনার পরীক্ষা। আছে অর্থনীতির পরীক্ষা, গণতন্ত্রের পরীক্ষা, প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পরীক্ষা এবং সর্বোপরি জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পরীক্ষা।

জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপি এক সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করতে এসেছিল। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলটি গণআন্দোলনের শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতির পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে আজকের বিএনপি আবার রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে। এই দীর্ঘ যাত্রায় সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, ভোটারের প্রত্যাশা বদলেছে, রাজনীতির ভাষাও বদলেছে। এখন দেখার বিষয়, বিএনপি নিজেকে কতটা বদলাতে পারে।

কারণ একটি রাজনৈতিক দলের অতীত তাকে পরিচয় দেয়, কিন্তু বর্তমান তাকে বিচার করে এবং ভবিষ্যৎ তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির নতুন অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই ক্ষমতায় আসা নয়—ক্ষমতায় এসে তারা বাংলাদেশকে কতটা বদলাতে পারে এবং সেই পরিবর্তন কতটা গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনকল্যাণমুখী হয়।

সেই উত্তরই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে ইতিহাসের পাতায় বিএনপির বর্তমান অধ্যায় কীভাবে লেখা হবে।

লেখক:

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন

ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।

mahbubhossain786@yahoo.com

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন । ঢাকা ইনফো।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন একজন ফ্রান্স প্রবাসী সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও সমাজ বিশ্লেষক। তিনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনযাত্রা, সামাজিক উন্নয়ন, সমসাময়িক রাজনীতি এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সংবাদ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।

📰 ঢাকা ইনফো২৪

দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, প্রবাসীদের তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট

আরও পড়ুন
`);w.document.close();setTimeout(function () { w.focus(); w.print(); }, 500);});});