বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ফ্রান্স। বাণিজ্য, বিমান চলাচল, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও জলবায়ু সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশ বিমানের সম্ভাব্য এয়ারবাস উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি নিয়েও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশের (ডিক্যাব) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ফরাসি রাষ্ট্রদূত এসব কথা বলেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ বিমানের এয়ারবাস কেনার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক কারণে নয়, বরং কারিগরি ও ব্যবসায়িক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে ফ্রান্স মনে করে।
এয়ারবাস চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে
ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, প্রস্তাবিত এয়ারবাস চুক্তি নিয়ে দুই পক্ষের আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ বজায় রাখবে বলে ফ্রান্স প্রত্যাশা করছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইউরোপের অন্যান্য দেশও একই ধরনের প্রত্যাশা পোষণ করে।
বাংলাদেশ বিমান বহরে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। এর অংশ হিসেবে ২১টি উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা চলছে, যার মধ্যে ১১টি বোয়িং এবং ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ থাকার কথা। প্রস্তাবিত এয়ারবাস প্যাকেজে চারটি এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে।
বিমানবহর সম্প্রসারণের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ বিমানের আন্তর্জাতিক রুট পরিচালনা, যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে চুক্তির চূড়ান্ত শর্ত, মূল্য, সরবরাহের সময়সূচি ও অর্থায়নসংক্রান্ত তথ্য এখনো সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়নি।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে চায় ফ্রান্স
অনুষ্ঠানে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, ফ্রান্স ও ইউরোপ বাংলাদেশকে কোনো একটি অংশীদার বেছে নেওয়ার জন্য চাপ দিতে চায় না। বরং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতে চায় দেশটি।
তিনি বলেন, অংশীদারত্বের অর্থ অন্য অংশীদারদের বাদ দেওয়া নয়; বরং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। ফরাসি রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে বাণিজ্য, বিমান চলাচল, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও জলবায়ু কার্যক্রমকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় বাজার, তৈরি পোশাক রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফরাসি পক্ষ বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে সম্পর্কের সম্প্রসারণ প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ, বাণিজ্য, শিক্ষা ও কনস্যুলার সহযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশি নাগরিকদের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে প্রবাসীদের জন্য নতুন কোনো ভিসা সুবিধা, বসবাসের অনুমতি, কাজের অধিকার বা কনস্যুলার সেবার নির্দিষ্ট পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ফলে এই বক্তব্যকে প্রবাসীদের জন্য নতুন প্রশাসনিক সুবিধা চালুর ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য পাসপোর্ট, কনস্যুলার সেবা, শিক্ষার সুযোগ এবং বৈধ কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলো দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। এসব বিষয়ে কোনো নতুন সিদ্ধান্ত হলে তা সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান ও দূতাবাসের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বাণিজ্য ও ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান
ফরাসি রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেন। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একটি বড় অংশ ইউরোপের বাজারে রপ্তানি হয়। এ কারণে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য বাজারে প্রবেশের পরিবেশ দুই পক্ষের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এয়ারবাস চুক্তিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতের পাশাপাশি বৃহত্তর বাংলাদেশ–ইউরোপ সম্পর্কও আলোচনায় এসেছে। তবে এয়ারবাস কেনার সিদ্ধান্তের সঙ্গে বাণিজ্যিক, কারিগরি ও কূটনৈতিক বিষয়গুলো কীভাবে সমন্বিত হবে, তা চুক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে আরও স্পষ্ট হতে পারে।
ফরাসি রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও ফ্রান্স পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী। এয়ারবাস চুক্তি নিয়ে আলোচনা চললেও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।