বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডি জি এফ আই-এর প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরী ভারত সফর করেন। সফরে তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং ভারতের অন্যান্য শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ভারতের সংবাদপত্রগুলো বলছে, দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কের বরফ গলছে। অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট উল্লেখ করেছে, “গত সপ্তাহের গোপন সফর দিল্লি–ঢাকা সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের ভিত্তি তৈরি করেছে।” দ্য হিন্দুস্তান টাইমসও একই ইঙ্গিত দিয়েছে যে, বাংলাদেশের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার সফর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র ও জনতার অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে যাওয়ার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক শীতল পর্যায়ে চলে যায়। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে ভারতের প্রতি তরুণ নেতৃত্বের ক্ষোভ, বাণিজ্য সংকোচন, ভিসা সঙ্কট ও কূটনীতিক তলব—সব মিলিয়ে সম্পর্ক তীব্র টানাপোড়েনে ছিল।
এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের বার্তা দিয়েছে। সাড়া মেলায় বাংলাদেশের পক্ষও। এরপরই দিল্লি সফরে যান ডি জি এফ আই–প্রধান মেজর জেনারেল কায়সার রশিদ। তিনি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং-এর প্রধান পরাগ জৈন এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর এস রমনসহ অন্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনায় দুই দেশের গোয়েন্দা প্রধান একটি বোঝাপড়ায় পৌঁছেছেন, যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কোনো দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অপর দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করতে না পারে। এছাড়া, দুই বছরের বেশি সময় ধরে স্থগিত থাকা যোগাযোগ চ্যানেল পুনঃচালু করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
দেড় দশক ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার পরে ভারত ও বাংলাদেশের অনেক যোগাযোগ চ্যানেল স্থগিত ছিল। তারেক রহমানের দায়িত্ব নেওয়ার আগে যোগাযোগ মূলত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মাধ্যমে হচ্ছিল। বাংলাদেশে খলিলুর রহমান এবং ভারতের অজিত দোভালই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চ্যানেলগুলো বজায় রেখেছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডি জি এফ আই–প্রধানের ভারত সফর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চিকিৎসাজনিত’ বলা হলেও, মূলত নয়াদিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে তা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত আশঙ্কা করছে, বাংলাদেশে সহিংসতা বাড়লে তার প্রভাব দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর শান্তি ও স্থিতিশীলতায় পড়বে।
এর আগে, বিএনপি চেয়ারপারসন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। সেই সময় তিনি নয়াদিল্লি থেকে পাঠানো শোকবার্তা তুলে দেন এবং বৈঠক সীমিত রাখেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করেননি।
ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি উপস্থিত ছিলেন। এটি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আটকে থাকা টানাপোড়েন পরিপ্রেক্ষিতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে দ্য প্রিন্ট জানাচ্ছে, দুই দেশের সম্পর্ক এখনও কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে। ঢাকার নিজস্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ভারতের কাছেই এখনও শেখ হাসিনা রয়েছেন, যিনি বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। বাংলাদেশে তার ফেরত পাঠানোর দাবি আছে। তবে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ‘জিম্মি’ করা হবে না।
দুই দেশের মধ্যে এখনও কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি আছে। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালের ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানি চুক্তি, যা এই ডিসেম্বরে নবায়নযোগ্য, উভয়পক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, গত দুই বছরে আরোপিত কিছু অর্থনৈতিক বিধিনিষেধও এখনও বহাল রয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে, ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শহীদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেনকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ) গ্রেপ্তার করেছে। গত বছরের ডিসেম্বরে এই হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে বিক্ষোভের সময় ক্ষোভের লক্ষ্য ভারতের ওপরও ছিল। প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করে ফেরত পাঠানোর দাবিতে ১৭ ডিসেম্বর ঢাকায় ‘জুলাই ঐক্য’ ব্যানারে মিছিলও হয়েছে।
এবার প্রধান আসামির ভারত থেকে গ্রেপ্তার হওয়া দুই দেশের সম্পর্কের নতুন শুরুর ইঙ্গিত বহন করছে। জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করে আসামিদের দেশে ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু করবে।
কুশল/সাএ
