ইউরোপের সবুজ হৃদয়খ্যাত অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্বক ও যৌনস্বাস্থ্য বিষয়ে ইউরোপের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন ইউরোপিয়ান একাডেমি অব ডার্মাটোলজি অ্যান্ড ভেনেরিওলজি (ইএডিভি) কংগ্রেস ২০২৬। গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত জাতিসংঘের ভিয়েনা সদরদপ্তরের পাশের অস্ট্রিয়া সেন্টার ভিয়েনায় চার দিনব্যাপী এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২১ হাজার চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী এতে অংশ নেন। সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশি চিকিৎসক ডা. পিনাকী ভট্টাচার্য।
আন্তর্জাতিক এ সম্মেলনে ব্যস্ত সময় কাটানোর মধ্যেও অস্ট্রিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময়ে অংশ নেন ডা. পিনাকী। এ উপলক্ষে ঐতিহাসিক দানিউব নদীর তীরে অবস্থিত হোটেল হিলটনে অস্ট্রিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক কফি আড্ডা ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।
সভায় বাংলাদেশ, সমকালীন রাজনীতি, সমাজ, ধর্ম, ইসলাম ও আলেম সমাজসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ডা. পিনাকী ভট্টাচার্যের সঙ্গে উপস্থিত অতিথিদের প্রাণবন্ত আলোচনা হয়।
আয়োজনে ভিয়েনাস্থ জাতিসংঘ সদরদপ্তরে কর্মরত কয়েকজন বাংলাদেশি, অস্ট্রিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী, আলেম-ওলামা, বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং সামাজিক ও পেশাজীবী নারী-পুরুষ নেতৃবৃন্দ অংশ নেন।
আলোচনার একপর্যায়ে তাঁর লেখা ‘মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম’ বই এবং ইসলাম ও ওলামায়ে কেরামের প্রতি তাঁর আগ্রহ ও শ্রদ্ধার বিষয়ে শায়খ ফাহিম বিল্লাহ হাশেমীর এক প্রশ্নের জবাব দেন ডা. পিনাকী ভট্টাচার্য।
নিজের চিন্তাধারার পরিবর্তনের প্রসঙ্গে তিনি ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনাকে ঘিরে তাঁর অনুসন্ধানের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি নিজেকে নাস্তিক হিসেবে বিশ্বাস করতেন। পরবর্তীতে শাপলা চত্বরের ঘটনাবলি নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও আলেমদের সঙ্গে তাঁর আলোচনা ও মতবিনিময়ের সুযোগ হয়।
তিনি দাবি করেন, ওই অনুসন্ধানের একপর্যায়ে শাহরিয়ার কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শাপলা চত্বরের ঘটনাকে ঘিরে বিভিন্ন তথ্য সম্পর্কে অবগত হন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে আগে তাঁর ভিন্ন ধারণা থাকলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন সূত্র থেকে শতাধিক মৃত্যুর দাবি সম্পর্কে জানতে পেরে তিনি বিস্মিত ও মর্মাহত হন।
ডা. পিনাকী আরও বলেন, পরবর্তীতে বিভিন্ন আলেমের সঙ্গে তাঁর আলোচনার মাধ্যমে তাঁদের চিন্তা, দর্শন এবং দেশ ও সমাজ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি জানার সুযোগ হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলাম সমাজে শৃঙ্খলা, সাম্য ও ন্যায়বিচারের ওপর গুরুত্ব দেয়—এ বিষয়টি তাঁকে ইসলাম সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
নিজের বামপন্থী রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সাম্য ও সমতার ধারণা নিয়ে সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা তাঁর মধ্যে আগে থেকেই ছিল। পরবর্তীতে আলেমদের চিন্তাভাবনা, দেশের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা এবং সমাজে ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে ইসলাম, আল্লাহর অস্তিত্ব ও বিশ্বাসের বিষয়ে গভীরভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়াই তাঁকে পরবর্তীতে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী হতে সহায়তা করে।
আলোচনায় তুরস্ক ভ্রমণের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সেখানকার সুমধুর আজানের কথা উল্লেখ করেন ডা. পিনাকী। স্মৃতিচারণের একপর্যায়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। দেশের কথা বলতে গিয়ে তাঁর চোখে পানি চলে আসে। একইসঙ্গে মহান আল্লাহর সৃষ্ট জীবজন্তু, পশু-পাখি, মাছ ও কীটপতঙ্গের প্রতিও তাঁর মমত্ববোধের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তাঁর আবেগঘন বক্তব্যে সভায় এক আবেগপূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে কঠোর ও সরব বক্তব্যের জন্য পরিচিত ডা. পিনাকীকে এ আয়োজনে ভিন্ন এক মানবিক আবহে দেখা গেছে বলে উপস্থিত কয়েকজন মন্তব্য করেন।
মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ ও সমসাময়িক রাজনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা করেন তিনি। উপস্থিত অতিথিরা বিভিন্ন প্রশ্ন করেন এবং ডা. পিনাকী সেগুলোর উত্তর দেন। বাংলাদেশ, ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা, চিন্তাভাবনা এবং দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা চলে।
অনুষ্ঠানে ভিয়েনাস্থ জাতিসংঘ সদরদপ্তরে কর্মরত প্রকৌশলী জনাব আবুল হাশেম সমাপনী বক্তব্য দেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মতবিনিময় সভার সমাপ্তি ঘটে।
সভায় উপস্থিত অতিথিরা ডা. পিনাকী ভট্টাচার্যের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন। বাংলাদেশ, ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে এ ধরনের মুক্ত ও গঠনমূলক আলোচনা ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তাঁরা।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রকৌশলী এম. এ. হাসিম, মাহেরুল হক শামীম, শেখ মহিউদ্দিন আহমেদ, হাবিবুর রহমান, শায়খ ফাহিম বিল্লাহ হাশেমী, সাইদুর রহমান বকুল, শায়খ আবু মুসা, শাকিল আহমেদ, রুবেল প্রমুখ।