মঙ্গলবার , ৬ অক্টোবর ২০২৬
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আন্তর্জাতিক
  4. খেলা
  5. খেলাধুলা
  6. জাতীয়
  7. তথ্য-প্রযুক্তি
  8. দেশজুড়ে
  9. প্রবাস
  10. প্রাকৃতিক দুর্যোগ
  11. বিনোদন
  12. মতামত
  13. রাজনীতি
  14. লাইফস্টাইল
  15. শিক্ষা

রাজনীতিক ও দার্শনিক আল্লামা আবুল হাশেম: উপমহাদেশের তৎকালীন রাজনীতি

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন । ঢাকা ইনফো।
অক্টোবর ৬, ২০২৬ ১১:৪৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন

আল্লামা আবুল হাশেমকে বুঝতে হলে শুধু তাঁকে একজন মুসলিম লীগ নেতা হিসেবে দেখলে চলে না। তাঁকে দেখতে হয় ঔপনিবেশিক ভারতের শেষ দশকের এক জটিল রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণের চিন্তক হিসেবে; যেখানে পাকিস্তানের দাবি, বাঙালির স্বাতন্ত্র্য, হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক, কৃষকের অর্থনৈতিক সংকট এবং উপমহাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো একই সঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল।

বিশ শতকের চল্লিশের দশক ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অস্থির সময়গুলোর একটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সংকট, মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবি, কংগ্রেসের অখণ্ড ভারতের অবস্থান এবং বিভিন্ন প্রদেশে স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষা; সব মিলিয়ে রাজনীতির পুরোনো কাঠামো দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। বাংলায় এই পরিবর্তনের নিজস্ব একটি চরিত্র ছিল। এখানে কৃষকসমাজের অর্থনৈতিক সমস্যা, জমিদারি ব্যবস্থা, ঋণ ও মহাজনি শোষণ, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং বাঙালি জাতিসত্তার প্রশ্ন পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। আর এই জটিল সময়েই আবুল হাশেমের রাজনৈতিক উত্থান।

আবুল হাশেম ১৯০৫ সালে বর্ধমানের কাশিয়াড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বর্ধমান রাজ কলেজ থেকে শিক্ষালাভের পর তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের সময় থেকেই তাঁর সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হন।

তবে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান মুসলিম লীগের প্রচলিত অভিজাত নেতৃত্বের সঙ্গে পুরোপুরি এক ছিল না। তিনি সংগঠনকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এবং বাংলার মুসলমান কৃষক ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের অর্থনৈতিক সমস্যাকে রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে আনেন। গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৪০-এর দশকে তাঁর নেতৃত্বে বঙ্গীয় মুসলিম লীগকে আরও গণভিত্তিক ও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় করার চেষ্টা হয়েছিল। 

এই জায়গাতেই আবুল হাশেমের রাজনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। তাঁর কাছে ধর্মীয় পরিচয় ছিল রাজনীতির একটি বাস্তব উপাদান, কিন্তু বাংলার রাজনৈতিক সমস্যাকে কেবল ধর্মীয় সংঘাতের কাঠামোয় দেখার প্রবণতা তিনি গ্রহণ করেননি। কৃষকের অর্থনৈতিক বঞ্চনা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন তাঁর চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছিল।

১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন ছিল ব্রিটিশ ভারতের শেষ বড় নির্বাচনগুলোর একটি। বাংলায় মুসলিম লীগ বিপুল সাফল্য অর্জন করে; ২৫০ সদস্যের বিধানসভায় দলটি ১১৩টি আসন পায় এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে সরকার গঠন করে। 

এই সাফল্যের পেছনে আবুল হাশেমের সাংগঠনিক ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ও সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগের প্রচার বাংলার গ্রামাঞ্চলে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়। একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৪৬-এর নির্বাচনী প্রচারে অর্থনৈতিক দাবি ও কৃষকসমাজের সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং বাংলার মুসলিম লীগের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিতে হাশেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। 

তবে এই নির্বাচনের ফলকে শুধু ধর্মীয় আবেগের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করলে বাংলার তৎকালীন সমাজ-রাজনীতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। বাংলার মুসলমান কৃষকের একটি বড় অংশ জমি, ঋণ, মহাজনি ব্যবস্থা, সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নের সঙ্গে পাকিস্তানের দাবিকে যুক্ত করে দেখেছিল। সমকালীন ও পরবর্তী গবেষণায় বাংলার পাকিস্তান আন্দোলনের এই অর্থনৈতিক ও প্রাদেশিক মাত্রার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

আবুল হাশেম মুসলিম লীগের রাজনীতির মধ্যেই কাজ করেছেন এবং পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার মধ্যে কেবল একটি কেন্দ্রীভূত মুসলিম রাষ্ট্রের ধারণা ছিল না। বরং বাংলার নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রশ্ন তাঁর চিন্তায় ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এখানে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের রাজনৈতিক তাৎপর্যও বিবেচনায় আসে। প্রস্তাবে ভারতীয় মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রসমূহ বা রাষ্ট্রকাঠামোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল; পরবর্তী সময়ে এর ব্যাখ্যা নিয়ে মুসলিম লীগের ভেতরে বিভিন্ন মত তৈরি হয়। বাংলার কিছু নেতা এই ধারণার মধ্যে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের সম্ভাবনা দেখতে শুরু করেন। 

আবুল হাশেমও এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। তাঁর চিন্তার একটি বিশেষ দিক ছিল; ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা। পরবর্তী পর্যায়ে তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গিই অবিভক্ত ও স্বাধীন বাংলার ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়। 

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির সম্ভাবনা যখন বাস্তব হয়ে উঠছে, তখন বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দেয়: বাংলা কি ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হবে, নাকি একটি স্বাধীন ও অবিভক্ত রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে থাকবে?

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শরৎচন্দ্র বসু, কিরণশঙ্কর রায়সহ কয়েকজন নেতা অবিভক্ত ও স্বাধীন বাংলার ধারণাকে সামনে আনেন। আবুল হাশেমও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৪৭ সালের ২০ মে শরৎচন্দ্র বসুর বাড়িতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আবুল হাশেম ও শরৎ বসুসহ সংশ্লিষ্ট নেতারা একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছান। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় যৌথ নির্বাচকমণ্ডলী, প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার এবং হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির মতো বিষয় ছিল। 

এই পরিকল্পনার পেছনে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা কাজ করছিল, তা ছিল অত্যন্ত জটিল। একদিকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলার পূর্ব ও পশ্চিম অংশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, অন্যদিকে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন। ফলে অবিভক্ত বাংলার প্রস্তাব ছিল একই সঙ্গে একটি আঞ্চলিক রাষ্ট্রচিন্তা এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজন এড়ানোর একটি রাজনৈতিক প্রচেষ্টা।

কিন্তু এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। কংগ্রেসের একটি অংশ, হিন্দু মহাসভা এবং বাংলার বহু হিন্দু নেতা এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন; অন্যদিকে মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় রাজনীতিতেও অবস্থান পরিবর্তিত হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভক্ত হয়। 

আল্লামা আবুল হাশেম রাজনীতিকের পাশাপাশি একজন চিন্তক। তারঁ  রাজনৈতিক জীবনকে তাই সরলরেখায় বিচার করা কঠিন। তিনি একদিকে মুসলিম লীগের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক, অন্যদিকে দলের অভ্যন্তরে গণভিত্তিক ও প্রগতিশীল রাজনীতির প্রবক্তা; একদিকে পাকিস্তান আন্দোলনের অংশ, অন্যদিকে পরবর্তী পর্যায়ে স্বাধীন ও অবিভক্ত বাংলার ধারণার সমর্থক।

এই আপাত বৈপরীত্য আসলে তাঁর সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। ১৯৪০-এর দশকের বাংলায় ‘পাকিস্তান’, ‘বাংলা’, ‘মুসলিম’, ‘কৃষক’, ‘স্বায়ত্তশাসন’ ও ‘জাতীয়তা’—এই শব্দগুলোর অর্থ আজকের মতো স্থির ছিল না। রাজনৈতিক কর্মীরা ক্রমাগত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির মধ্যে এসব ধারণার নতুন অর্থ খুঁজছিলেন।

আবুল হাশেমের চিন্তার মূল্য এখানেই; তিনি রাজনীতিকে শুধু ক্ষমতা দখলের কৌশল হিসেবে দেখেননি; ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও মানুষের রাজনৈতিক অধিকারকে বৃহত্তর রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাখ্যা থাকলেও বাংলার মুসলিম রাজনীতির গণভিত্তি গড়ে তোলা এবং ১৯৪৭-এর বিভাজনের আগে বিকল্প রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা উপেক্ষা করা যায় না। 

উপমহাদেশের ইতিহাসে আবুল হাশেম এমন এক রাজনৈতিক চরিত্র, যাঁকে কেবল ‘মুসলিম লীগ নেতা’ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার ব্যাপ্তি ধরা পড়ে না। তিনি ছিলেন এমন এক সময়ের মানুষ, যখন ব্রিটিশ ভারত ভাঙনের দিকে এগোচ্ছিল এবং একই সঙ্গে নতুন রাষ্ট্র, নতুন জাতীয়তা ও নতুন রাজনৈতিক সম্পর্কের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছিল।

তাঁর রাজনৈতিক পথচলায় আমরা দেখতে পাই পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, বাংলার কৃষক ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক প্রশ্ন, মুসলিম লীগের গণভিত্তি বিস্তারের প্রচেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় বিভাজনের বাইরে একটি স্বাধীন-অবিভক্ত বাংলার সন্ধান।

ইতিহাসের বিচারে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এই যে, একটি ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শুধু ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে নির্ধারিত হয় না; তার সঙ্গে যুক্ত থাকে ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, শ্রেণি, আঞ্চলিক স্বার্থ এবং মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা। আবুল হাশেমের রাজনৈতিক জীবন সেই বহুমাত্রিক বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

লেখক:

ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

mahbubhossain786@yahoo.com

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন । ঢাকা ইনফো।

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন একজন ফ্রান্স প্রবাসী সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও সমাজ বিশ্লেষক। তিনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনযাত্রা, সামাজিক উন্নয়ন, সমসাময়িক রাজনীতি এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সংবাদ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।

📰 ঢাকা ইনফো২৪

দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, প্রবাসীদের তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট

আরও পড়ুন
`);w.document.close();setTimeout(function () { w.focus(); w.print(); }, 500);});});