হলান্ডকে বোতলবন্দি করার কৌশল জানা আছে আনচেলত্তির

X
আর্লিং হলান্ড
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে আজ রোববার রাতে নরওয়ের মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিল। কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার এই লড়াইয়ে সেলেসাওদের বড় পরীক্ষা নিতে পারে আর্লিং হলান্ড। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ তছনছ করে দিতে ম্যানচেস্টার সিটির নরওয়েজিয়ান ‘গোলমেশিনের’ জুড়ি নেই।
মাঠে নামার আগেই বিশাল এক মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা পাচ্ছে ব্রাজিল; আর তা হচ্ছে প্রতিপক্ষ শিবিরে হলান্ড থাকলেও, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ডাগআউটে আছেন চতুর এক রণকৌশলী—‘ডন’ কার্লো আনচেলত্তি। ইউরোপীয় ফুটবলে সাফল্যের রাজমুকুট পরা এই ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ডের কাছে নরওয়ের এই ‘গোলমেশিন’ একদম নখদর্পণে। ক্লাব ফুটবলে হলান্ড জুজু কাটানোর মোক্ষম দাওয়াই তাঁর ভালোই জানা আছে। তবে ক্লাবের সেই অধ্যায় শেষে এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই ফরোয়ার্ডকে রুখে দিতে ব্রাজিলের রক্ষণভাগে ঠিক কী কৌশল আঁটছেন আনচেলত্তি, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।
২০২৩ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনালের আগে আনচেলত্তির মূল পরিকল্পনা ছিল এটাই। ম্যাচের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে আনচেলত্তি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন, তার রণকৌশল স্রেফ হলান্ডকে কেন্দ্র করে নয়। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা স্রেফ একজন নির্দিষ্ট খেলোয়াড়কে আটকে রাখা নয়। আমাদের লক্ষ্য পুরো দলটাকে রুখে দেওয়া, বিশেষ করে যখন বল ওদের পায়ে থাকে। হলান্ড নিঃসন্দেহে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, তবে শুধু তার ওপর নজর দিলে বাকিদের ভুলে যাওয়া হবে।’
সেবার আনচেলত্তির এই কৌশল ইংলিশ সংবাদমাধ্যমে বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। যেমন—বিখ্যাত ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য গার্ডিয়ান’ তাদের প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিল যে, পুরো ম্যাচে হলান্ড শট নেওয়ার মতো পজিশনে বলই পেয়েছিলেন খুব কম। সে ম্যাচে হলান্ডকে শারীরিকভাবে বোতলবন্দি করে রাখার মূল দায়িত্বে ছিলেন রিয়াল ডিফেন্ডার আন্তোনিও রুডিগার, আর তাঁকে অনবরত সুরক্ষা দিয়ে গেছেন বাকি সতীর্থরা। ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলে ড্র হয়েছিল।
কয়েক মাস পর, প্রথম লেগের সেই রণকৌশল এবং নরওয়েজিয়ান তারকাকে সফলভাবে ‘বোতলবন্দি’ করার পরও দ্বিতীয় ম্যাচে বাদ পড়া নিয়ে মুখ খুলেছিলেন রুডিগার, ‘একজন খেলোয়াড় হিসেবে সিদ্ধান্তটি মেনে নেওয়া কঠিন হলেও আমাকে তা মেনে নিতেই হতো। প্রথম ম্যাচে আমার মনে হয় হলান্ডকে আটকে রাখার ক্ষেত্রে আমরা সবাই মিলে দারুণ একটা কাজ করেছিলাম; আমার সতীর্থরা বল পজিশন ধরে রেখেছিল, যার ফলে ও মনের মতো পাস পায়নি।’
পরের মৌসুমে হলান্ডকে বোতলবন্দি করার প্রধান দায়িত্বটি আনচেলত্তি আবারও এই জার্মান ডিফেন্ডারের কাঁধেই সঁপে দেন। রুডিগারও তাঁর সেই পুরোনো রণকৌশল ধরে রাখেন-পুরো ম্যাচজুড়ে হলান্ডকে সমানে সমানে শারীরিক দ্বৈরথে ব্যস্ত রাখা এবং সুযোগ পেলেই রক্ষণভাগের অন্য সতীর্থদের কভারিংয়ের সুবিধা নেওয়া।
হলান্ডকে ম্যাচের বাইরে রাখার এই ছক দারুণ কাজে দিয়েছিল; তবে নরওয়েজিয়ান তারকাকে আটকে রাখা গেলেও ম্যানচেস্টার সিটি গোল করার অন্য পথগুলো ঠিকই খুঁজে নেয়। শ্বাসরুদ্ধকর সেই ৩-৩ ড্রয়ের ম্যাচে সিটির হয়ে জালের দেখা পেয়েছিলেন বার্নার্দো সিলভা, ফিল ফোডেন এবং জোসকো গভার্দিওল।
পরে হলান্ডকে নিয়ে রুডিগার বলেছিলেন, ‘আমার মুখোমুখি হওয়া অন্যতম শক্তিশালী স্ট্রাইকার সে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাকে যদি এমন একজনের নাম বলতে বলা হয় যাকে মার্ক করা সবচেয়ে কঠিন ছিল, তবে সে হবে কুন আগুয়েরো (আর্জেন্টাইন সাবেক স্ট্রাইকার); তবে এখন সেই জায়গাটা হলান্ড নিয়েছে। ওকে নিয়ন্ত্রণে রাখা মোটেও সহজ নয়। ও মূলত সতীর্থদের পাসের ওপরই বেশি নির্ভরশীল।’
চ্যাম্পিয়নস লিগের সেই কোয়ার্টার ফাইনালের দ্বিতীয় লেগে আনচেলত্তির সামনে ছিল আরও বড় পরীক্ষা। ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য টাইমস’-এর এক ট্যাকটিক্যাল বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেই ম্যাচে আনচেলত্তি ঠিক তেমনই এক কৌশল বেছে নিয়েছিলেন, যা এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে প্রিমিয়ার লিগে সিটির বিপক্ষে ব্যবহার করেছিল আর্সেনাল।
সেদিন রিয়াল মাদ্রিদ খেলেছিল একদম ‘লো-ব্লক’ বা নিচে নেমে রক্ষণ সামলানোর কৌশল নিয়ে; যেখানে রক্ষণভাগের লাইনগুলো ছিল ঠাসা এবং ডি-বক্সের ভেতর অনবরত সতীর্থদের পাহারা ছিল। হলান্ডকে সামলানোর মূল দ্বৈরথটি বরাবরের মতোই সামলেছেন রুডিগার, যার ফলে পুরো ম্যাচের অধিকাংশ সময়ই নরওয়ের এই স্ট্রাইকার ছিলেন একদম নিষ্প্রভ। ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারে শেষ হাসি হাসে স্প্যানিশ জায়ান্টরাই।
ম্যাচ শেষে রক্ষণভাগের প্রশংসায় আনচেলত্তি বলেছিলেন, ‘প্রথম ম্যাচে ও (হলান্ড) যে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি, তার পুরো কৃতিত্ব আমাদের রক্ষণভাগের।’
সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোর পরিসংখ্যান নরওয়েজিয়ান তারকার ওপর একটা বাড়তি মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করেছিল; কারণ আনচেলত্তির দলগুলোর বিপক্ষে তখনো পর্যন্ত কোনো গোল বা অ্যাসিস্টের দেখা পাননি তিনি।
স্প্যানিশ দৈনিক ‘এএস’ তো ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ প্লে-অফে রিয়াল মাদ্রিদ বনাম সিটির ম্যাচটিকে সরাসরি ‘অ্যাসেন্সিও (রিয়ালের স্প্যানিশ ডিফেন্ডার) বনাম গোলিয়াথ’ (দৈত্য) লড়াই বলে আখ্যা দিয়েছিল। প্রতিবেদনে আনচেলত্তির সেই বিখ্যাত ‘অ্যান্টি-হলান্ড’ পরিকল্পনার কথাও মনে করিয়ে দেওয়া হয়, যার সুবাদে আগের চার ম্যাচে ইতালিয়ান কোচের ছকে হলান্ডকে একদম বোতলবন্দি করে রাখা সম্ভব হয়েছিল।
তবে সেই শেষ দেখায় পাশার দান কিছুটা উল্টে যায়। রিয়াল মাদ্রিদ শেষ পর্যন্ত কোয়ালিফাই করলেও, হলান্ড সেবার জোড়া গোল করে বসেন—যার একটি ছিল পেনাল্টি থেকে। অবশ্য চোটের কারণে দ্বিতীয় লেগের ম্যাচে তিনি খেলতেই পারেননি, যা রিয়াল মাদ্রিদ আবারও নিজেদের করে নেয়।
হলান্ডকে রুখে দেওয়ার ব্যাপারে আনচেলত্তির সুর সবসময় একই রকম ছিল। ‘ম্যান-মার্কিং’ বা একজন খেলোয়াড় দিয়ে ম্যান-টু-ম্যান ব্লক করার চেয়ে, এই স্ট্রাইকারকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে দলগত প্রচেষ্টাকেই সবসময় বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
তবে রুডিগার যখনই মাঠে ছিলেন, হলান্ডকের সঙ্গে শারীরিক দ্বৈরথে নামার মূল গুরুদায়িত্বটি এই ডিফেন্ডারের ওপরই বর্তাত। অবশ্য কোচ নিজে সবসময়ই এর পুরো কৃতিত্ব দিয়ে এসেছেন রক্ষণভাগের সম্মিলিত বোঝাপড়াকে। আগামীকাল ব্রাজিল ও নরওয়ের এই হাইভোল্টেজ মহাদ্বৈরথেও আনচেলত্তির সেই পুরোনো ফুটবল দর্শন আবারো দেখা যেতে পারে।