
ছবি: প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল অধ্যুষিত মধ্যনগর উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা যেন মরণদশায় উপনীত হয়েছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। হাওরপাড়ের বিদ্যালয়গুলোতে যাওয়া-আসার একমাত্র ভরসা নৌকা। শিক্ষা খাতে সরকারের গুরুত্ব থাকলেও হাওরাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগব্যবস্থা এখনো অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে— “বর্ষায় নাও, হেমন্তে পাও।” হাওরাঞ্চলের বাস্তব চিত্র যেন এই প্রবাদকেই প্রতিফলিত করে। নেই কোনো সড়ক, নেই পর্যাপ্ত যানবাহনের ব্যবস্থা। বর্ষা মৌসুমে প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যেতে হলেও অনেক সময় ঝড়-বৃষ্টির কবলে পড়তে হয়।
হাওরবেষ্টিত মধ্যনগর উপজেলায় ৮৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৪০টি বিদ্যালয়ের সঙ্গে কোনো সড়ক যোগাযোগ নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে হয়। বর্ষাকালে প্রায় ৬ থেকে ৭ মাস এসব বিদ্যালয় পানিবন্দি অবস্থায় থাকে। এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত দুর্ভোগ পোহাতে হয়। পাঠদান ও পাঠগ্রহণ কার্যক্রমও বিঘ্নিত হয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের নিরাপদ ব্যবস্থা না থাকায় বৈরী আবহাওয়ার সময় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। অনেক অভিভাবকের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় সন্তানদের বিদ্যালয়ে আনা-নেওয়ার জন্য নৌকার ব্যবস্থা করাও সম্ভব হয় না। নৌকার অভাবে প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। ফলে অনেক বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার ৪০ শতাংশে নেমে আসে। নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে না পারায় অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তর থেকেই ঝরে পড়ে।
এছাড়া অনেক কোমলমতি শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খাল, নদী ও বিল পার হয়ে ছোট নৌকা, বাঁশের সাঁকো কিংবা কোমরসমান বা বুকসমান পানি ভেঙে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। হাওরাঞ্চলের অধিকাংশ বিদ্যালয়ের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ না থাকায় হেমন্তকালে শিক্ষার্থীরা হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে পারলেও বর্ষা মৌসুমে পুরো এলাকা পানিতে টইটম্বুর হয়ে থাকে। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের।
এ সময় বিদ্যালয়ে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা নৌকা। কিন্তু প্রায়ই ঝড়-বৃষ্টির কবলে পড়ে নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। অতীতেও নৌকাডুবিতে শিক্ষার্থীদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
হাওরাঞ্চলের শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে সংশ্লিষ্টদের স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তারা প্রতিটি বিদ্যালয়ের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপন, নিরাপদ নৌকার ব্যবস্থা এবং নৌকার মাঝি নিয়োগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, “বর্ষাকালে শিক্ষার্থীদের নৌকায় যাতায়াত করতে হয়। তবে এসব বিদ্যালয়ের জন্য সরকারিভাবে নৌকা বা মাঝি সরবরাহের কোনো ব্যবস্থা নেই। ইতোমধ্যে নৌকায় পারাপার করতে হয় এমন বিদ্যালয়গুলোর তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।”