যুক্তরাষ্ট্রে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমনের মরদেহ দেশে ফেরার পর একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসছে। নিখোঁজ হওয়া থেকে শুরু করে দেহ উদ্ধার এবং ঘনিষ্ঠজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে গভীর উদ্বেগ ও আলোড়ন।
সোমবার (৪ মে) সকাল ৮টা ৪৭ মিনিটে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে লিমনের কফিনবন্দি মরদেহ রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। এ সময় সেখানে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, লিমনের বাবা-মা এবং স্বজনরা। প্রিয়জনের নিথর দেহ দেখে তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
শোকে ভেঙে পড়া বাবা জহুরুল হক বলেন, সন্তানকে এভাবে হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। অনেক যত্নে দুই ছেলেকে বড় করেছেন, কখনো কষ্ট দেননি—এমন মর্মান্তিক পরিণতি তিনি কল্পনাও করেননি।
আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ জামালপুরের মাদারগঞ্জে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে নেওয়া হয়। এর আগে গাজীপুরের মাওনায় পারিবারিক বাসায় একটি জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পরে মাদারগঞ্জ উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়নের লালডোবা গ্রামে মাগরিবের পর দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, এখনো হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। লিমনের মামার ভাষ্য, পরিবারের সঙ্গে বা রুমমেটের সঙ্গে কোনো সমস্যা ছিল—এমন কিছু লিমন আগে কখনো জানাননি। তিনি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করেন।
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, লিমন নিখোঁজ হওয়ার পর কয়েক দিনের অনুসন্ধানে ফ্লোরিডার ট্যাম্পা এলাকার হাওয়ার্ড ফ্র্যাংকল্যান্ড ব্রিজ সংলগ্ন স্থান থেকে তার দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে।
এ ঘটনায় লিমনের সাবেক রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়েহ (২৬) কে গ্রেপ্তার করেছে হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সাম্প্রতিক বিরোধের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে এবং ঘটনার উদ্দেশ্য উদঘাটনে সব ধরনের প্রমাণ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
নিখোঁজ হওয়ার পর লিমনের মোবাইল ফোনের অবস্থান, চলাচলের তথ্য এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করা হয়। পরে তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে, যা তদন্তকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করছে।
এদিকে দেহাবশেষ উদ্ধারের বিষয়ে হিলসবোরো কাউন্টির শেরিফ চ্যাড ক্রনিস্টার জানান, মাছ ধরার সময় এক জেলের ছিপ ঝোপে আটকে গেলে সেটি ছাড়াতে গিয়ে তিনি তীব্র দুর্গন্ধ পান। পরে একটি কালো প্লাস্টিকের ব্যাগ খুলে মানবদেহের অংশ দেখতে পেয়ে তিনি দ্রুত পুলিশকে খবর দেন।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহটি পচে যাওয়ায় শনাক্ত করতে কিছুটা সময় লাগে। নিখোঁজ হওয়ার সময় বৃষ্টির পরনের পোশাকের সঙ্গে মিল পাওয়ার পর ডিএনএ ও দাঁতের রেকর্ডের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় এটি বৃষ্টির মরদেহ।
তদন্তে জানা যায়, অভিযুক্ত হিশাম পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায় এবং মরদেহ গুমের চেষ্টা করে। সে নিজের ফোন থেকে তথ্য মুছে ফেললেও ফরেনসিক বিশ্লেষণে সেগুলো উদ্ধার করা হয়। পরে দেখা যায়, সে বিভিন্নভাবে অপরাধ করার পদ্ধতি সম্পর্কে অনলাইনে খোঁজ করেছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, বৃষ্টির মরদেহ গাড়িতে করে উপকূলে এনে ঝোপের মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছিল। অভিযুক্ত হিশাম বর্তমানে কারাগারে রয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় থেকে বলা হয়, আবুঘরবেহকে জিজ্ঞাসাবাদের পর গত ২৪ এপ্রিল ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকায় আবর্জনা ফেলার কালো রঙের কয়েকটি ব্যাগের মধ্যে জামিলের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, লিমনের মরদেহে কোনো কাপড় ছিল না এবং মরদেহে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। এ ঘটনায় আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ মাত্রার (ফার্স্ট ডিগ্রি) হত্যার দুটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তাঁর কাছ থেকে একটি অস্ত্র উদ্ধারের কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। আবুঘরবেহ লিমনের রুমমেট ছিলেন।
লিমনের মরদেহ খুঁজে পাওয়ার দুই দিন পর গত ২৬ এপ্রিল ম্যানগ্রোভ এলাকায় কয়েকজন মাছশিকারি কায়াক চালানোর সময় একটি কালো রঙের পলিথিন দেখতে পান। হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজে যেখানে জামিলের মরদেহ খুঁজে পাওয়া গেছে, এলাকাটি এর কাছেই। খবর দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পলিথিনের ভেতর মরদেহের খণ্ডিত অংশ দেখতে পায়। তবে খণ্ডিত অংশগুলো এমন অবস্থায় ছিল যে পুলিশ সেগুলো শনাক্ত করতে পারছিল না। ৩০ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে এসে হিসলবরো কাউন্টি শেরিফ নিশ্চিত করেন, উদ্ধার হওয়া খণ্ডিত অংশ বৃষ্টির।
আদালতের নথি অনুযায়ী, লিমনের মরদেহে কোনো কাপড় ছিল না এবং মরদেহে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। এ ঘটনায় আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ মাত্রার (ফার্স্ট ডিগ্রি) হত্যার দুটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তাঁর কাছ থেকে একটি অস্ত্র উদ্ধারের কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। আবুঘরবেহ লিমনের রুমমেট ছিলেন।
জামিল আহমেদ লিমন (২৭) যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতিমালা বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। তিনি ১৬ এপ্রিল নিখোঁজ হন। পরে এপ্রিলের শেষ দিকে তার দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়।
লিমনের শিক্ষাজীবনও ছিল উজ্জ্বল। তিনি গাজীপুরের মাওনা মডেল হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং বীরশ্রেষ্ঠ আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে ২০২৪ সালে পিএইচডি করতে যুক্তরাষ্ট্রে যান।
এদিকে লিমনের মৃত্যুতে দেশের বিভিন্ন মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্বজন ও সচেতন মহল।
কুশল/সাএ