গুপ্তহত্যা ও অভ্যুত্থানের আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নিরাপত্তা আরও জোরদার করেছে ক্রেমলিন। সিএনএনের হাতে আসা একটি ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর ধারাবাহিক হামলার ঝুঁকির কারণে পুতিনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের বাড়িতেও নজরদারি ব্যবস্থা বসানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কাজ করা রাঁধুনি, দেহরক্ষী ও ফটোগ্রাফারদের গণপরিবহন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসা ব্যক্তিদের দুই দফা নিরাপত্তা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। পাশাপাশি তার ঘনিষ্ঠদের ইন্টারনেট সংযোগবিহীন ফোন ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনটি আরও জানায়, গত ডিসেম্বরে এক শীর্ষ জেনারেলের হত্যাকাণ্ডের পর এসব ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়। পুতিনের চলাচলের স্থান সীমিত করা হয়েছে এবং তিনি তার গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপনের স্থান ভালদাইতে যাওয়াও বন্ধ করেছেন।
২০২৫ সালে নিয়মিত সফর করলেও, এ বছর এখন পর্যন্ত তিনি কোনো সামরিক স্থাপনা পরিদর্শন করেননি। ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে তিনি দীর্ঘ সময় উন্নত বাঙ্কারে অবস্থান করছেন।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব এখন স্পষ্ট—রাশিয়ার প্রধান শহরগুলোতে মোবাইল ডেটা বিভ্রাট বেড়েছে, যা এমনকি পুতিনপন্থি ধনী শ্রেণির মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি করছে। অর্থাৎ, শহুরে অভিজাতরাও যুদ্ধের প্রভাব থেকে মুক্ত নন। প্রতিবেদনে মস্কোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির দিকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
অভ্যুত্থানের ঝুঁকি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চের শুরু থেকে, ‘ক্রেমলিন এবং স্বয়ং ভ্লাদিমির পুতিন সংবেদনশীল তথ্য ফাঁসের সম্ভাব্য ঝুঁকি, সেই সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে কোনো ষড়যন্ত্র বা অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে দেশটির রাজনৈতিক অভিজাতদের দ্বারা সম্ভাব্য গুপ্তহত্যার প্রচেষ্টায় ড্রোন ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বিগ্ন রয়েছে।’
কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্য দেওয়া হয়েছে পুতিনের সাবেক বিশ্বস্ত সহযোগী সের্গেই শোইগুকে নিয়ে। তিনি বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কোণঠাসা হয়ে পড়া এই সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সামরিক উচ্চ কমান্ডের মধ্যে যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। তাকে নিয়েও উদ্বিগ্ন ক্রেমলিন। তিনি অভ্যুত্থানের ঝুঁকির সঙ্গে জড়িত হতে পারেন বলেন মনে করা হচ্ছে। ৫ মার্চ শোইগুয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী রুসলান সালিকভকে গ্রেপ্তার করা হয়। একে ‘অভিজাতদের মধ্যেকার অলিখিত সুরক্ষা চুক্তির লঙ্ঘন’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
পুতিন ২০২৩ সালের জুনে হওয়া একটি অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। মস্কোর অভিজাত মহলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রায়শই ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার বিষয় হয়ে ওঠে, কিন্তু খুব কমই তা প্রকাশ্যে আসে। ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সমর্থন যখন কমছে, তখন ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে ক্রেমলিনে ক্রমবর্ধমান সংঘাত ও সন্দেহবাতিকের ইঙ্গিত দেওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
পুতিনকে ঘিরে বিস্তারিত কিছু নিরাপত্তাব্যবস্থার কথা আগেও প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাপক দেহ তল্লাশি, ক্রেমলিনের স্মার্টফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা এবং প্রেসিডেন্টের চলাফেরায় বিধিনিষেধ। পুতিনকে এখনো নিয়মিত জনসমক্ষে দেখা যাচ্ছে; এ সপ্তাহে তিনি চেচেন নেতা রমজান কাদিরভ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
ক্রেমলিনের বিরোধ
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের শেষ দিকে ক্রেমলিনে পুতিনের সঙ্গে শীর্ষ কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। নতুন নিরাপত্তা পদক্ষেপ নেওয়ার এটাও একটা কারণ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈঠকের সময় চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফ ভ্যালেরি গেরাসিমভ ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের (এফএসবি) প্রধান আলেকজান্ডার বর্টনিকভের সমালোচনা করেন তার কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ায়।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ‘এই উত্তেজনাপূর্ণ বৈঠক শেষে ভ্লাদিমির পুতিন সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান, একটি বিকল্প কার্যপদ্ধতির প্রস্তাব করেন এবং অংশগ্রহণকারীদের এক সপ্তাহের মধ্যে এই সমস্যার সুনির্দিষ্ট সমাধান উপস্থাপনের নির্দেশ দেন।’
সেই দ্রুত সমাধানের অংশ হিসেবে পুতিন তার নিজস্ব ফেডারেল প্রোটেকশন সার্ভিসের (এফএসও) পরিধি আরো সম্প্রসারণ করেন।
সূত্র: সিএনএন
কুশল/সাএ