দেশের কৃষি খাতে স্বচ্ছতা ও আধুনিকায়ন জোরদার করতে সরকার ‘কৃষক কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। প্রি-পাইলটিং কার্যক্রমের প্রথম ধাপে ২১ হাজার ১৪ জন কৃষক এই কার্ডের আওতায় আসছেন।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা কর্মসূচির অধীনে দেশের আট বিভাগের ১১টি উপজেলার ১১টি ব্লকে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। এ জন্য মোট ৮ কোটি ৩৪ লাখ ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
আগামী ১ বৈশাখ এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এই উদ্যোগে প্রতিটি কৃষক পরিবার একটি করে কৃষক কার্ড পাবে। তবে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। নীতিমালা অনুযায়ী, তারা জনপ্রতি ২,৫০০ টাকা করে অনুদান পাবেন।
এই অর্থ কৃষি উপকরণ—যেমন সার, বীজ, কীটনাশক—কেনার পাশাপাশি মৎস্য চাষ ও গবাদিপশুর খাদ্য সংগ্রহেও ব্যবহার করা যাবে। শুধু ফসল উৎপাদনকারী কৃষকই নয়, মৎস্যচাষি ও প্রাণিসম্পদ খামারিরাও এই সুবিধার অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
যে সুবিধা পাবেন কৃষকরা
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কৃষক কার্ডের আওতায় একজন কৃষক প্রাথমিকভাবে ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে—ন্যায্যমূল্যে বীজ, সার ও কীটনাশক সংগ্রহ, সরাসরি ভর্তুকি ও প্রণোদনা প্রাপ্তি, সাশ্রয়ী সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি বীমা, কৃষিপণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রির সুযোগ, প্রশিক্ষণ, আবহাওয়ার তথ্য এবং রোগবালাই দমন-সংক্রান্ত পরামর্শ।
সোনালী ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট, পস মেশিনে লেনদেন
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকদের জন্য একটি সমন্বিত আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে সরকারি সহায়তা সরাসরি প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছায় এবং নির্ধারিত খাতে তা ব্যয় নিশ্চিত করা যায়।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রি-পাইলটিং প্রকল্পের আওতায় ১১টি ব্লকে মোট ২১ হাজার ১৪ জন কৃষকের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। আগামী চার বছরে পর্যায়ক্রমে এক কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের হাতে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ তালিকায় ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব এলাকার কৃষকরা এই কার্ড পাচ্ছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—পঞ্চগড় সদর, বগুড়ার শিবগঞ্জ, টাঙ্গাইল সদর, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ, জামালপুরের ইসলামপুর, ঝিনাইদহের শৈলকুপা, পিরোজপুরের নেছারাবাদ, কক্সবাজারের টেকনাফ, কুমিল্লার আদর্শ সদর এবং মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলা।
কৃষি ভর্তুকি ও উপকরণ সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ২১ হাজার ১৪ জন কৃষকের চূড়ান্ত তালিকা করা হলেও প্রাথমিক বাজেট প্রণয়নের সময় ২৫ হাজার কৃষককে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী এ খাতে ৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।
এ ছাড়া অতিরিক্ত আরও ২ হাজার কৃষকের জন্য কার্ড প্রস্তুতের পরিকল্পনা রয়েছে। মোট ২৭ হাজার কার্ড মুদ্রণের জন্য ৯৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং তথ্য সংগ্রহকারীদের সম্মানি বাবদ ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব কামরুল হাসান জানান, প্রতিটি তালিকাভুক্ত কৃষকের জন্য সোনালী ব্যাংক-এ একটি অ্যাকাউন্ট খোলা হবে এবং তাদের একটি ডেবিট কার্ড দেওয়া হবে। কার্ডে থাকা সরকারি সহায়তার অর্থ—যেমন আড়াই হাজার টাকা—শুধু নির্ধারিত ডিলারের পস (POS) মেশিনের মাধ্যমে সার, বীজ ও কীটনাশক কেনার জন্য ব্যবহার করা যাবে। ফলে এ অর্থ অন্য খাতে ব্যয়ের সুযোগ থাকবে না এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।
একই সঙ্গে কার্ডটি সাধারণ ডেবিট কার্ড হিসেবেও ব্যবহারযোগ্য হবে। কৃষক নিজস্ব অর্থ জমা রাখলে তা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যয় করতে পারবেন। এতে গ্রামীণ এলাকায় ব্যাংকিং সেবার বিস্তার ঘটবে এবং সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়বে।
এই ব্যবস্থায় বড় কৃষকদেরও অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তারা আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও এই কার্ড ব্যবহার করতে পারবেন, যা কৃষির যান্ত্রিকীকরণকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে মন্ত্রণালয় আশা করছে।
কুশল/সাএ
