চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড়ের তান্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে গাছপালা, ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়।
বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ে ও গাছ পড়ে তার ছিঁড়ে এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কালবৈশাখী ঝড়ের তান্ডবে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় অন্তত ২৫টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে পড়েছে। অন্তত ৬০ জায়গায় বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়েছে। ফলে উপজেলার ৪ লক্ষাধিক মানুষ ২০ ঘন্টারও অধিক সময় ধরে বিদ্যুৎবিহীন। পুরো উপজেলায় বিদ্যুৎ সচল হতে অন্তত ৩ থেকে ৪ দিন সময় লাগবে।
বুুধবার (২৫ মার্চ-২০২৬) রাত ৭টার পর কালবৈশাখী ঝড়ে এ ঘটনা ঘটে। আধাঘন্টা বয়ে যায় এ কালবৈশাখী ঝড়ের তান্ডব। সরেজমিনে ও বিভিন্ন এলাকার খবরে এ উপজেলার সকল এলাকায় কালবৈশাখী ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কালবৈশাখী ঝড়ের স্থায়িত্ব কম হলেও কোথাও কোথাও বাতাসের বেগে ঘরবাড়ি ও গাছ-গাছালির ক্ষতির পাশাপাশি উড়ে গেছে বিভিন্ন স্থাপনা। ঝোড়ো বাতাসে আম, লিচু, ভুট্টা, ধান, পাটসহ উঠতি ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ের কারণে সড়কের ওপর গাছ উপড়ে পড়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থায় মারাত্মক বিঘœ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ সড়কগুলোতে চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের।
মতলব উত্তরে কালবৈশাখীর তান্ডব মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে নির্মিত প্যান্ডেল কালবৈশাখী ঝড়ের তান্ডবে সম্পূর্ণ লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। হঠাৎ ঝড়ের আঘাতে মুহূর্তেই সবকিছু ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে, নষ্ট হয়ে যায় সাজসজ্জা ও প্রস্তÍুুতি। এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাঝেও স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস পালন করেছেন প্রশাসন।
উপজেলায় ৯০ হাজার আবাসিক, ২০ হাজার বাণিজ্যিক ও ৪শ’ শিল্প গ্রাহক রয়েছে। ১টি সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, অন্তত ১৪টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, উপজেলা প্রশাসন, থানা, ২টি নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ২৪ ঘন্টারও অধিক সময় বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছে। তবে উপজেলা পরিষদ মতলব উত্তর থানা ও ছেংগারচর বাজার এলাকায় বৃহস্পতিবার রাতে বিদুঃ সংযোগ দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
পুরো উপজেলায় বিদ্যুৎ সচল হতে আরও অন্তত ৩ থেকে ৪ দিন সময় লাগতে পারে। এমনটাই জানিয়েছেন উপজেলা বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বশীলরা। কালবৈশাখীর আঘাতে বড় বড় গাছ ভেঙে বিদ্যুতের খুঁটির ওপর পড়ে তার ছিঁড়ে যায়, ফলে পুরো গ্রাম বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের পক্ষে বিদ্যুতের খুঁটির ওপর পড়ে গাছ সড়িয়ে ছিঁড়ে যাওয়া তার জোড়া দিয়ে সহসা বিদ্যুৎ লাইন সচল করা সম্ভব না বলে সচেতন মহল মনে করছেন। তার জন্য এলাকা ভিত্তিক সকল মানুষের সহযোগিতা করতে হবে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মতলব উত্তর জোনাল অফিসের ডিজিএম এমডি ওয়াহিদুজ্জামান জানান, ঝড়ে বিভিন্ন স্থানে খুঁটি ও বৈদ্যুতিক তার ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট টিম কাজ করছে। এ ব্যাপার গ্রাহকদের সহযোগিতার জন্য অনুরোধ জানান।
সরেজমিনে উপজেলার ছেংগারচর পৌরসভাসহ ষাটনল, কালিপুর,একলাশপুর, কলাকান্দা, রাড়ীকান্দি, পাঁচানী, কালিপুর, ছটাকি, মোহনপুর, সুজাতপুর, গজরা, ষাটনল, হানিরপাড়সহ বেশ কয়েকটি এলাকায় খুঁটি উপডড়ে পড়ে থাকতে এবং গাছ ও গাছের ডালপালা ভেঙে বিদ্যুতের উপর পড়ে তার ছিঁডড়ে থাকতে দেখা গেছে। এর ফলে পুরো উপজেলার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভ্যাকসিন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট (এমটিইপিআই) ভাষান চন্দ্র কীর্তনীয়া জানান, আমাদের স্টোরে ১২০০ থেকে ১৫০০ শিশুদেরকে দেওয়ার মতো ভ্যাকসিন রয়েছে। জেনারেটর না থাকায় ২৪ ঘন্টার বেশি সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকলে ভ্যাকসিন সংরক্ষণ সম্ভব হবে না।
উপজেলার বেশ কয়েকজন আবাসিক গ্রাহক জানান, তাদের ফ্রিজে থাকা মাছ-মাংস ও অন্যান্য খাবার বিদ্যুৎবিহীন থাকলে নষ্ট হয়ে গেছে। কয়েকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক জানান, যাদের জেনারেটর নেই, ২৪ ঘন্টার বেশি সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকলে তাদের ফ্রিজে থাকা কেমিক্যাল নষ্ট হয়ে যাবে।
মালাইরকান্দি গ্রামের সোহেল রানা বলেন, ‘বাড়ির টিনের বেড়া ভেঙে রাস্তায় পড়ে আছে। গাছপালা ভেঙে বিদ্যুতের তার রাস্তায় পড়েছে। পাশের বাড়িতে গাছ পড়ে কয়েকটি পরিবারের বিদ্যুতের মিটারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
আধুরভিটি গ্রামের মিজানুর রহমান দর্জি বলেন, ‘কালবৈশাখীর তন্ডবে গাছ ভেঙে বিদ্যুতের খুঁটির ওপর পড়ে তার ছিঁড়ে গেছে। মুহুর্তের মধ্যে বড় বড় গাছ রাস্তায় পড়ে যায়। বিদ্যুৎ না থাকায় খুব কষ্টে আছি।’
ছেংগারচর পৌর ছাত্র দলের সভাপতি মোঃ শাকিল খান বলেন, রাতে কালবৈশাখী ঝড় থেমে যাওয়ার পর বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখেছি। গাছপালা, বাড়িঘর ও বিদ্যুৎ লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যায়নি।
উপজেলা কৃষি অফিসার ফয়সাল মোহাম্মদ আলী বলেন, ঝড়ে গাছপালার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বোরো ধানের ক্ষতি হবে না। বিভিন্ন ধরনের সবজির কিছুটা ক্ষতি হলেও ফসলের বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি। কি পরিমান ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভুট্টা চাষীদের।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, ঝড়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গাছপালা ও ঘরবাড়ির ক্ষতি হয়েছে। সড়ক থেকে দ্রুত গাছ অপসারণ এবং বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করছি ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সড়ক ও বিদ্যুৎ লাইনে ওপরে পড়ে থাকা গাছ সরানোর জন্য সকলকে আহবান জানাই। এদিকে শেষ খবর পর্যন্ত সন্ধ্যা পর্যন্ত এলাকায় বিদ্যুৎ বিহীন থাকায় এলাকার চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ চালুর আপ্রাণ চেষ্টা করেও সন্ধ্যা পর্যন্ত বিদ্যুৎ চালু সম্ভব হয়নি। তবে তারা মাঠে কাজ অব্যাহত রয়েছে।
