৮ই মে ফ্রান্সের জাতীয় ইতিহাসে এক গৌরবময় ও স্মরণীয় দিন। এই দিনটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির স্মরণে পালিত হয়। ১৯৪৫ সালের ৮ই মে নাৎসি জার্মানি মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং ইউরোপে দীর্ঘ ছয় বছরের ভয়াবহ যুদ্ধের অবসান ঘটে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ফ্রান্সে “ফেত দ্য লা ভিকতোয়ার” বা বিজয় দিবস উদযাপন করা হয়। দিনটি শুধু একটি ঐতিহাসিক বিজয়ের স্মৃতি বহন করে না, বরং শান্তি, স্বাধীনতা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়। প্রতি বছর এই দিনে ফ্রান্সে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয় এবং দেশজুড়ে নানা স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধগুলোর একটি। ১৯৩৯ সালে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইউরোপ, এশিয়া এবং বিশ্বের আরও অনেক অঞ্চল জড়িয়ে পড়ে। জার্মানির নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলারের আগ্রাসী নীতির কারণে বহু দেশ আক্রান্ত হয়। ফ্রান্সও ১৯৪০ সালে জার্মান বাহিনীর দখলে চলে যায়। সেই সময় ফরাসি জনগণকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বহু মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়, আবার অনেকে প্রতিরোধ আন্দোলনে যোগ দেন। ফরাসি প্রতিরোধ যোদ্ধারা গোপনে নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান এবং মিত্রবাহিনীকে সহযোগিতা করেন। অবশেষে ১৯৪৪ সালে ফ্রান্স মুক্ত হয় এবং ১৯৪৫ সালের ৮ই মে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
এই দিনটিকে ঘিরে ফ্রান্সে যে অনুষ্ঠানগুলো অনুষ্ঠিত হয়, সেগুলো মূলত শ্রদ্ধা ও স্মৃতিচারণের ওপর ভিত্তি করে। অন্যান্য দেশের মতো খুব বেশি উৎসবমুখর পরিবেশ না থাকলেও দিনটি অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে পালন করা হয়। ফ্রান্সের বিভিন্ন শহর ও গ্রামের যুদ্ধস্মৃতিস্তম্ভে ফুলের তোড়া অর্পণ করা হয়। বিশেষ করে যেসব স্মৃতিস্তম্ভে যুদ্ধে নিহত সৈনিকদের নাম খোদাই করা আছে, সেখানে মানুষ জড়ো হয়ে নীরবতা পালন করে এবং নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। অনেক ক্ষেত্রে এসব স্মৃতিস্তম্ভ গির্জার পাশে অবস্থিত থাকে, কারণ ফরাসি সমাজে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের সঙ্গে স্মরণানুষ্ঠানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
রাজধানী প্যারিসে এই দিবসটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়। ফরাসি রাষ্ট্রপতি প্যারিসের বিখ্যাত স্মৃতিসৌধে উপস্থিত হয়ে অজ্ঞাত সৈনিকের সমাধিতে ফুল অর্পণ করেন। সামরিক বাহিনীর সদস্যরা কুচকাওয়াজে অংশ নেন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। পুরো অনুষ্ঠান টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়, যাতে দেশের সব মানুষ এই জাতীয় স্মরণানুষ্ঠানের অংশ হতে পারে। যুদ্ধের প্রবীণ সৈনিকরাও অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তাঁদের উপস্থিতি নতুন প্রজন্মকে যুদ্ধের বাস্তবতা ও আত্মত্যাগের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়।
ফ্রান্সে ৮ই মে উদযাপন তুলনামূলকভাবে শান্ত ও সংযত হলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক গভীর। বিশেষ করে যখন নেদারল্যান্ডস বা অন্য কিছু ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তখন দেখা যায় যে সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি অনেক বড় আকারে উদযাপিত হয়। ফ্রান্সে বরং দিনটি স্মরণ ও শ্রদ্ধার মাধ্যমে পালিত হয়। দোকানপাট সাধারণত বন্ধ থাকে এবং সরকারি দপ্তরগুলো ছুটি পালন করে। অনেক পরিবার এই দিনটিকে ইতিহাস স্মরণের দিন হিসেবে দেখে এবং যুদ্ধের সময়কার কষ্ট ও আত্মত্যাগের কথা আলোচনা করে।
ফ্রান্সে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তুলনায় আরও গভীরভাবে মানুষের মনে গেঁথে আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সে বিপুলসংখ্যক সৈনিক নিহত হয়েছিল এবং দেশের বহু অঞ্চল ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তাই বিভিন্ন স্মৃতিস্তম্ভে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহতদের নামের সংখ্যা অনেক বেশি দেখা যায়। এই কারণেই ফরাসি জনগণের কাছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত ও বেদনা আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়। তবুও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি এবং ৮ই মে-এর বিজয় দিবস ফরাসিদের জন্য স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
এই দিবস নতুন প্রজন্মকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—যুদ্ধ কখনো মানবতার জন্য কল্যাণকর নয়। যুদ্ধ ধ্বংস, মৃত্যু ও কষ্ট বয়ে আনে। তাই শান্তি, ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিতেই ৮ই মে প্রতি বছর পালিত হয়। ফ্রান্সে এই দিনটি কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য শান্তির অঙ্গীকার হিসেবেও বিবেচিত হয়।
সবশেষে বলা যায়, “ফেত দ্য লা ভিকতোয়ার” ফ্রান্সের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শুধু বিজয়ের স্মারক নয়, বরং লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন। প্রতি বছর ৮ই মে ফরাসি জনগণ গভীর সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে এই দিবস পালন করে এবং বিশ্বশান্তির বার্তা নতুন করে স্মরণ করে।
লেখক:
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
mahbubhossain786@yahoo.com