কক্সবাজার সীমান্তঘেঁষা নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ বেতবুনিয়া পাড়ার বাসিন্দা খাইরুল আমিন। একসময় এলাকায় দর্জির কাজ করতেন। তবে সেই পরিচয় এখন অতীত। স্থানীয়দের কাছে তিনি এখন পরিচিত নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য। কেউ তাকে বলেন চোরাকারবারি, কেউ বলেন ইয়াবা কারবারি, আবার কারও কাছে তিনি চাঁদাবাজ ও প্রতারক হিসেবেও পরিচিত।
সম্প্রতি ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরকারি গবাদিপশুর হাট স্থাপনের আবেদনকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন তিনি।
অভিযোগ উঠেছে, একাধিক আদালতে মামলা চলমান এবং বসতিপূর্ণ একটি বিতর্কিত জমিতে পশুর হাট স্থাপনের নামে তিনি সংঘবদ্ধ প্রতারণার চেষ্টা করেছেন। সরকারি তদন্তে আবেদনপত্রের তথ্য অসত্য প্রমাণিত হওয়ার পরও একই আবেদনপত্রে দাগ, খতিয়ান ও হোল্ডিং নম্বর পরিবর্তন করে পুনরায় আবেদন করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
প্রতিবেদকের হাতে আসা তদন্ত প্রতিবেদন, আবেদনপত্র, লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয়দের বক্তব্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে একের পর এক গুরুতর তথ্য।
খাইরুল আমিন প্রথমে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বরাবর একটি আবেদন করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ২৬৭ নম্বর ঘুমধুম মৌজার হোল্ডিং নম্বর-৩০২-এর অন্তর্গত এক একর জমিতে ঈদুল আজহা উপলক্ষে অস্থায়ী গবাদিপশুর হাট স্থাপনের অনুমতি চান। আবেদনটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বাজার ফান্ড সংস্থা কর্তৃপক্ষ সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দেয়। গত ২৯ এপ্রিল স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তদন্ত পরিচালিত হয়।
সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, উল্লিখিত জমি আসলে মৃত আলী আহমদের নামে রেকর্ডভুক্ত। তার আটজন উত্তরাধিকারী রয়েছেন। জমির মালিকের নাতি মো. সাইফুল ইসলাম নোটারি পাবলিক চুক্তির মাধ্যমে পাঁচ বছরের জন্য জমিটি লিজ নিয়ে ভোগদখলে ছিলেন। পরে তাকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের অভিযোগও রয়েছে। জমির দখল নিয়ে হুমকি ও মারামারির ঘটনায় থানায় মামলাও হয়েছে।
তদন্তে আরও উঠে আসে, প্রস্তাবিত স্থানে বর্তমানে রেডিয়েন্ট বিজনেস কনসোর্টিয়াম লিমিটেডের রাবার বাগান রয়েছে। এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাগানের গাছগুলোর বয়স প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর। এ ছাড়া জমিটি নিয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, বান্দরবানে পিটিশন মামলা নং-১৪২/২০১৯, মিস সি আর-১৯/২০২০ এবং নাইক্ষ্যংছড়ির সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে স্যুট নং-১৪/২০২১ বিচারাধীন রয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, বিচারাধীন মামলা ও বিদ্যমান রাবার বাগানের কারণে সেখানে সরকারিভাবে পশুর হাট স্থাপন করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে একটি নাদাবিও দাখিল করা হয়েছে।
সরকারি তদন্তে আবেদনটি প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পরও থেমে থাকেননি খাইরুল আমিন। দলিলপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একই আবেদনপত্রে আগের দাগ নম্বর, খতিয়ান ও হোল্ডিং নম্বর ঘষামাজা করে নতুন তথ্য বসিয়ে আবারও আবেদন করা হয়েছে। দ্বিতীয় দফার আবেদনে জমির পরিমাণ দেখানো হয় মাত্র ২০ শতক। সেখানে হোল্ডিং নম্বর-২৬২৫, খতিয়ান নম্বর-১০৫ ও দাগ নম্বর-২৩২৮ উল্লেখ করা হয়।
স্থানীয় ভূমি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন করে প্রতারণা করে যে ২০ শতক জমি দেখানো হচ্ছে। সেই জমিতে কার্যকর গবাদিপশুর হাট পরিচালনা বাস্তবসম্মত নয়। পশু রাখার জায়গা, ক্রেতা-বিক্রেতার চলাচল কিংবা যানবাহন প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গাই সেখানে নেই।
ঘুমধুমের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এত ছোট জায়গায় গরুর বাজার সম্ভব না। তাহলে আসল উদ্দেশ্য কী, সেই প্রশ্ন তো থাকেই।’
জমি বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কার্যকর পশুর হাট পরিচালনার জন্য কয়েক একর জমি প্রয়োজন হয়। ফলে ২০ শতক জমিতে হাটের আবেদনকে সন্দেহজনক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইনজীবীদের ভাষ্য, সরকারি নথিতে ঘষামাজা বা তথ্য পরিবর্তন করে পুনরায় আবেদন করা ফৌজদারি অপরাধের শামিল। তবে বিষয়টি এখন পর্যন্ত কোনো পৃথক ফৌজদারি তদন্তের আওতায় আসেনি।
খাইরুল আমিনের আবেদন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা শুরু হয়েছে। ঘুমধুম ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মিজানুল বশর মিজান একটি ফেসবুক পোস্টে মন্তব্য করে লেখেন, ‘একই নথিতে এক ব্যক্তি কাটছাঁট করে কয়টা আবেদন করতে পারে জানার বড়োই আগ্রহ।’
তিনি আরও লেখেন, বান্দরবান জেলা পরিষদের কার্যাবলি ও নিয়মাবলি সম্পর্কে যার জানা আছে, তিনি যেন বিষয়টি পরিষ্কার করেন।
শুধু তাই নয়, গত ২৬ এপ্রিল ঘুমধুম ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। সেখানে খাইরুল আমিনকে ‘কুখ্যাত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ইয়াবা ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, ২০১৩ সালে টেকনাফ থানার একটি মাদক মামলায় ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন খাইরুল আমিন। মামলাটি টেকনাফ থানার মামলা নম্বর-৪০, তারিখ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩। বর্তমানে মামলাটি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় চোরাচালান, মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একাধিক মামলায় তার নাম রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন খাইরুল আমিন। একসময় দর্জির কাজ করা এই ব্যক্তি বর্তমানে নিজেকে যুবদল নেতা পরিচয় দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছেন। যদিও স্থানীয় যুবদলের একাধিক নেতাকর্মী জানিয়েছেন, দলের কোনো সাংগঠনিক পদে তার নাম নেই।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, পদ-পদবি না থাকলেও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি, প্রতারণা, জমি-সংক্রান্ত দালালি ও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। স্থানীয়দের দাবি, সরকারদলীয় ও প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে এলাকায় এক ধরনের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন খাইরুল। তার বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না বলেও অভিযোগ করেন অনেকে।
দক্ষিণ বেতবুনিয়া পাড়ার এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আগে মানুষ তাকে দর্জি হিসেবেই চিনত। এখন পুরোপুরি অন্যরকম হয়ে গেছে। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এলাকায় ভয়ভীতি সৃষ্টি করছে। কেউ প্রতিবাদ করলে নানা ধরনের হুমকি আসে।’
আরেক স্থানীয় বাসিন্দার ভাষ্য, ‘মামলা-মোকদ্দমা, বাজার ইজারা, জমি দখল-সব জায়গায় তার নাম আসে। মানুষ ভয়ে সরাসরি কিছু বলতে চান না।’
স্থানীয় সূত্রগুলো আরও জানায়, অতীতে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘ সময় কারাভোগও করেন খাইরুল আমিন।
সরেজমিনে প্রস্তাবিত গবাদিপশুর হাটের স্থান পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, আবেদনপত্রে উল্লেখ করা জমির বড় একটি অংশজুড়ে স্থানীয় কয়েকটি পরিবারের বসতবাড়ি রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে পুরোনো রাবার বাগান। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিরোধপূর্ণ এই জমিতে হাট স্থাপনের উদ্যোগ নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তপথে গরু, বিদেশি সিগারেট, মদ ও ইয়াবা পাচারের সঙ্গে তিনি জড়িত। অভিযোগে দাবি করা হয়, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন সময় প্রশাসনের কাছে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন। এমনকি বর্তমান সংসদ সদস্যের কাছ থেকে সুপারিশ নিয়েও পশুর হাটের আবেদন করেন।
এর মধ্যেই প্রতিবেদকের হাতে আসে খাইরুল আমিনের একটি কথিত হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রিনশট। সেখানে এক ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে তিনি লিখেছেন, ‘তোমাকে এতগুলা মামলা থেকে বাঁচালাম। টাকা পয়সা কোনো কিছু তো এখনো দিলা না। মাত্র এক লাখে কি এত সব সমাধান সম্ভব নাকি?’
স্থানীয়দের মতে, বার্তাটি মামলা ম্যানেজ, চাঁদাবাজি ও অর্থ আদায়ের ইঙ্গিত বহন করে।
ঘুমধুম বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘এলাকায় মামলা-মোকদ্দমা নিয়েও দালালির অভিযোগ আছে। অনেকেই ভয় পেয়ে মুখ খোলে না।’
খাইরুল আমিনের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এমং প্রু বলেন, ‘খাইরুল আমিনের আবেদনের ভিত্তিতে সরেজমিন তদন্তে গিয়ে দেখা যায়, যে জমিটি তিনি বাজারের জন্য উল্লেখ করেছেন সেটি বিরোধপূর্ণ এবং সেখানে বসতি রয়েছে। এছাড়া জমিটি নিয়ে আদালতে মামলাও চলমান। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জায়গাটি গবাদিপশুর হাটের জন্য উপযুক্ত নয়।’
অন্যদিকে বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরি বলেন, ‘আমি সুপারিশ করেছি। যদি তদন্তে উঠে আসে যে সেখানে বাজার করার পরিবেশ নেই, তাহলে বাজার হবে না।’
সালাউদ্দিন/সাএ