বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গ-এ বিজেপির বিজয়ের ফলে ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার গঠিত হওয়াকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন পঙ্কজ শরণ।
সম্প্রতি সুষমা স্বরাজ ভবন-এ সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। বর্তমানে তিনি নয়াদিল্লিভিত্তিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাটস্ট্র্যাট-এর কনভেনর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
পঙ্কজ শরণ বলেন, বহু বছর পর ভারতের কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গে একই রাজনৈতিক দলের সরকার ক্ষমতায় এসেছে। তার মতে, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় থাকায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন অমীমাংসিত বিষয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয় সহজ হতে পারে। তিনি মনে করেন, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় দুই দেশের সম্পর্কের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। নতুন চুক্তির আলোচনায় পানি প্রবাহের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তি বছর পরিবর্তনের প্রস্তাব আসতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিস্তা নদী প্রকল্প নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পঙ্কজ শরণ বলেন, বাংলাদেশ চাইলে চীন-এর সহযোগিতায় তিস্তা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণ করতে পারে। এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত এবং এ বিষয়ে ভারত কেবল উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারে, বাধা দিতে পারে না।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতিকে “দুর্ভাগ্যজনক” উল্লেখ করে তিনি বলেন, সীমান্তে অবৈধ অর্থনীতি, চোরাচালান ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দুই দেশের আরও উন্নত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। পাশাপাশি দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখাকেও তিনি সমস্যার সমাধানের প্রথম ধাপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সাবেক এই হাইকমিশনার বলেন, ‘আমাদের সেই পুরোনো অতীতে ফিরে যাওয়া চলবে না যেখানে দুই দেশের সীমান্ত বাহিনীর মধ্যে সন্দেহের সম্পর্ক ছিল। সেটি কোনো সমাধান আনবে না। বর্তমানে তাদের একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করার এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা রয়েছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় উন্নত প্রযুক্তি, যোগাযোগ এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে।’
উগ্রবাদ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পঙ্কজ শরণ বলেন, ‘উগ্রবাদী আদর্শ বা সন্ত্রাসী সংগঠন যাতে কোনো সুযোগ না পায়, সে জন্য দুই দেশকে মিলেমিশে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে, মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা ভারত ও বাংলাদেশের জন্য হুমকি।
গোয়েন্দা তৎপরতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা থাকে যাদের কাজ রাষ্ট্রকে রক্ষা করা। এমনকি যুদ্ধাবস্থা না থাকলে বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান ও সহযোগিতার একটি সংস্কৃতি থাকে। বাংলাদেশ ও ভারতের গোয়েন্দা কার্যক্রম নিয়ে অপপ্রচারটি ভারতবিরোধী গোষ্ঠীর; এমনকি সেটা পাকিস্তান, চীন বা যুক্তরাষ্ট্রেরও হতে পারে।’
বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে ভারত-এর সম্পর্ক নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পঙ্কজ শরণ। তিনি বলেন, নির্বাচনে জয়ের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-কে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ফোন করার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুভেচ্ছা বার্তা দেওয়া হয়েছিল, যা বিএনপিও আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশে নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদী-কে নিয়োগের সিদ্ধান্তকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন পঙ্কজ শরণ। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের পর এই প্রথম কোনো রাজনীতিককে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার করা হলো। তার ভাষায়, দীনেশ ত্রিবেদী ভারতে অত্যন্ত সম্মানিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি, যিনি রাজনীতির পাশাপাশি অর্থনীতি ও অন্যান্য বিষয়েও দক্ষ। কঠিন কূটনৈতিক সমস্যার সমাধানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-কে ফেরত আনার প্রশ্নে পঙ্কজ শরণ বলেন, কোনো রাজনৈতিক নেতার অন্য দেশে আশ্রয় নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তিনি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দীর্ঘ সময় লন্ডন-এ অবস্থান করেছিলেন।
তার মতে, শেখ হাসিনাকে ঘিরে বিষয়টিতে রাজনৈতিক ও আইনি—দুই ধরনের দিক রয়েছে এবং এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। শেষ পর্যন্ত দুই সরকার কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মতবিনিময় অনুষ্ঠানে ন্যাটস্ট্র্যাটের উপদেষ্টা শান্তনু মুখার্জিও বক্তব্য দেন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ নেপাল, ভুটান ও রাশিয়ায় ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি নয়াদিল্লিতে নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাটস্ট্র্যাটের কনভেনর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কুশল/সাএ