ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের পর এবার প্রবাসী নাগরিকদের জন্য নতুন “প্রবাসী কার্ড” চালু করতে যাচ্ছে সরকার। ঘোষণার অনুযায়ী, আগামী দুই মাসের মধ্যে প্রবাসীদের হাতে এই কার্ড পৌঁছাবে।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, বৈধভাবে রেমিট্যান্স প্রেরণকে উৎসাহিত করতে সরকার এই কার্ড চালু করতে যাচ্ছে।
প্রবাসী নাগরিকদের মধ্যে নতুন কার্ড চালু হলে কি ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর আগে প্রবাসীদের জন্য বিএমইটি কার্ড চালু করা হয়েছিল, যা বৈধভাবে বিদেশে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের জন্য। এই কার্ডধারীর তথ্য সরকারি ডাটাবেসে থাকে, তাই বিপদের সময়ে সহজে শনাক্ত করে সহায়তা দেওয়া যায়।
নতুন প্রবাসী কার্ডে বিএমইটি কার্ডের সব তথ্য থাকবে, তবে এতে অতিরিক্ত সুবিধা এবং ব্যাংকিং সুবিধাও যুক্ত হবে। প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, নতুন কার্ডে ব্যাংকিং সেবা ছাড়াও আরও কিছু বাড়তি সুবিধা থাকবে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগে দেওয়া বিএমইটি কার্ড প্রবাসীদের খুব কাজে আসেনি। তাই নতুন প্রবাসী কার্ড চালু হলে এটি যেন সত্যিকারের উপকারে আসে, সেদিকেও সরকারের নজর দিতে হবে।
সরকারের কাছে প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা অন্তত দেড় কোটি। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আরও অনেক প্রবাসী থাকলেও তাদের সঠিক পরিসংখ্যান নেই।
এর আগে বিএনপি সরকারের নেতৃত্বে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন নতুন কার্ড চালু হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার প্রবাসীদের জন্য “প্রবাসী কার্ড” চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণকে উৎসাহ দেওয়া যায়।
এই কার্ডটি প্রবাসীদের জন্য একটি ডিজিটাল পরিচয়পত্র ও সেবা কার্ড হিসেবে কাজ করবে, যার মাধ্যমে তারা দেশের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক সুবিধা পাবেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর বলেন, “প্রবাসী নাগরিকরা এই কার্ড পাসপোর্টের বিকল্প হিসেবেও ব্যবহার করতে পারবে, যে কোনো সময় যে কেউ তার সম্পর্কে জানতে চাইলে একটা কিউআর কোড থাকবে, যেটি স্ক্যান করলে প্রবাসী নাগরিকদের বিস্তারিত দেখা যাবে এবং এই কার্ড মোবাইলের মাধ্যমেও ব্যবহার করা যাবে, কার্ডধারীকে সাথেও রাখতে হবে না”।
নির্বাচনের আগে বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছিল, ‘প্রবাসী কার্ড’ দেওয়া হবে, যাতে তথ্য, দক্ষতা ও চাকরির শর্ত সংরক্ষণ থাকবে। এবং এতে ব্যাংক পেমেন্ট গেটওয়েতে যুক্ত থাকবে, সহজ রেমিট্যান্স প্রেরণের সুবিধাও যুক্ত থাকবে।
যে সুবিধা থাকবে
বিএনপির ইশতেহার অনুযায়ী, এই প্রবাসী কার্ডের মাধ্যমে রেমিট্যান্সে বাড়তি প্রণোদনা পাওয়া যাবে এবং দেশে ফেরত প্রবাসীদের সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করা হবে।
প্রবাসী নাগরিকেরা বলছেন, তাদের অনেকেই এখনো জানেন না এই কার্ডটি পেলে তারা কি সুবিধা পাবেন বা তাদের জন্য এই কার্ড কতখানি জরুরি।
মালয়েশিয়া প্রবাসী শাহরিয়ার তারেক বলেন, “বিএমইটি কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা কিছু সুবিধা পেয়ে থাকেন। তারপরও অনেক প্রবাসীই বিমানবন্দর কিংবা বাংলাদেশে নাগরিক সুবিধা গ্রহণ করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হন। তাদের কাছেও এটি একটি বড় প্রশ্ন যে এই কার্ড আসলে তাকে কতখানি সুরক্ষা দিবে”।
জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানান, এই কার্ডের বড় একটা দিক হচ্ছে অর্থনৈতিক।
এর ব্যাখ্যায় তিনি জানান, যার কাছে এই প্রবাসী কার্ডে যে ব্যাংকিং সিস্টেম যুক্ত থাকবে, তাতে ডুয়েল কারেন্সি কার্ডের সিস্টেমে ব্যবহার করা যাবে। সেক্ষেত্রে তিনি যে দেশে থাকেন, সেই দেশের মুদ্রায় তিনি খরচ করতে পারবেন এবং একই সাথে তিনি বাংলাদেশি টাকায়ও খরচ করতে পারবেন।
নুর বলেন, “কোনো প্রবাসী যদি চান, তিনি তার কার্ড দিয়ে অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে ওই দেশ থেকে তার পরিবারকে কিছু কিনে দিতে চাইলে, সেটাও এই প্রবাসী কার্ডের মাধ্যমে করতে পারবেন”।
প্রবাসী কার্ডটি চালুর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “অনেক সময় দেশের বাইরে যারা থাকে, তারা যে টাকা পাঠায় সেটি অনেক সময় তাদের নিকট আত্নীয় বা পরিবারের লোকেরা খরচ করে ফেলে। এই কার্ডটা চালু হলে পরিবার একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা খরচ করতে পারবে। আনলিমিটেড টাকা খরচ করতে পারবে না”।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, বিভাগীয় শহর থেকে জেলা শহর পর্যন্ত প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী সিটি গড়ে তোলা হবে।
এক্ষেত্রে যাদের কাছে এই প্রবাসী কার্ড থাকবে তারা প্রবাসী সিটিতে আবাসন বা প্লট ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ সুবিধা পাবে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “এর বাইরেও বর্তমানে বিএমইটি বীমা, আর্থিক ক্ষতিপূরণসহ যে সব সুযোগ সুবিধা রয়েছে, সেগুলোও বহাল থাকবে প্রবাসী কার্ডে”।
তিনি জানান, আমরা চেষ্টা করবো যে নাগরিকদের হাতে এই কার্ড থাকবে, তিনি যখন বিমানবন্দরে যাবেন, তখন যেন তিনি এই কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে তার সম্মানটুকু পান কিংবা তিনি যেন হয়রানির স্বীকার না হন- সেই বিষয়গুলোও যুক্ত থাকবে এই কার্ডে।
কারা কিভাবে পাবেন, কতটা জরুরি?
এই কার্ড নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে কিছু ধোঁয়াশাও রয়েছে। তার প্রথমটি হলো অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পড়াশোনা করতে গিয়ে পরে আবার কর্মসংস্থানে জড়িয়ে পড়েছেন। তাদের বেশিরভাগের নেই এই বিএমইটি কার্ড।
সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ইশতিয়াক আসিফ বলেন, “প্রবাসীরা যে পাসপোর্টে যে দেশে আছেন, সেই দেশের ভিসা আছে। তাহলে কেন আলাদা করে সুযোগ সুবিধা পেতে প্রবাসী কার্ড নিতে হবে। তারা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে, এটাই কি যথেষ্ট নয় রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে”?
এর জবাবে মন্ত্রণালয় বলছে, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে সব প্রবাসীরা রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ প্রবাসীর তথ্য সরকারের কাছে আছে। সরকার যখন এই কার্ডটিতে বিশেষ সুবিধা দিবে তখন হয়তো অনেকেই এই কার্ডটি গ্রহণ করতে আগ্রহী হবে।
প্রতিমন্ত্রী নূর জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে যাদের বিএমইটি কার্ড আছে, তাদেরকেই দেওয়া হবে প্রবাসী কার্ড। এক্ষেত্রে সেই কার্ডধারীদের নতুন করে প্রবাসী কার্ড নিতে রেজিস্ট্রেশন করানোর চিন্তা ভাবনা রয়েছে সরকারের।
এক্ষেত্রে কোনো ফি দিতে হবে? জবাবে প্রতিমন্ত্রী নূর বলেন, “আগে বিএমইটি কার্ড করতে একটি ফি লাগতো। যাদের বিএমইটি কার্ড আছে তাদের ফি নাও লাগতে পারে। নতুন যারা যুক্ত হবে তারা ফি দেওয়ার মাধ্যমে নিবন্ধিত হয়ে এই কার্ড পেতে পারেন। সেক্ষেত্রে নতুনদের রেজিস্ট্রেশন ফি’র প্রয়োজন হতে পারে”।
তিনি জানান, এক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে প্রবাসীদের হাতে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়া হতে পারে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, “আগে যে বিএমইটি কার্ড দেওয়া হয়েছিল, সেটা আসলে কোনো কাজে আসেনি। সেই কার্ডেও অনেক কিছু ছিল। ভাবা হয়েছিল ওটা দিয়েই সে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারবে, দেখতে পারবে, এগুলো কিছুই সেভাবে হয়নি”।
যে কারণে নতুন করে প্রবাসী কার্ড চালু করার আগে সেটি কতখানি কার্যকর করা যাবে, সেটি নিয়েও ভাবার পরামর্শ দিচ্ছেন এই বিশেষজ্ঞ।
প্রবাসী কার্ডের জন্য সাধারণত যা লাগতে পারে:
সরকার এখনও চূড়ান্ত নির্দেশিকা প্রকাশ করেনি, তবে সাধারণ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিম্নলিখিত নথিপত্র প্রয়োজন হতে পারে:
পাসপোর্টের কপি: বৈধ বাংলাদেশি পাসপোর্টের তথ্য।
এনআইডি কার্ড: জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি।
রেমিট্যান্সের প্রমাণ: গত কয়েক মাসের বৈধ ব্যাংক রশিদ বা স্টেটমেন্ট।
বিএমইটি স্মার্ট কার্ড: জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো থেকে পাওয়া রেজিস্ট্রেশন কার্ড।
ছবি: পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।
কুশল/সাএ