রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী বাসডুবির ঘটনায় নিহত কালুখালী উপজেলার ৮ জনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। সকলের জানাজা শেষ হলেও স্বজনদের বুকফাটা আহাজারিতে এখনো ভারী হয়ে আছে পুরো এলাকা।
রতনদিয়া ইউনিয়নের মহেন্দ্রপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। চারদিকে শুধুই কান্না আর শোকের মাতম। একই পরিবারের একাধিক স্বজন হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন মোঃ আব্দুল আজিজ। তিনি বেঁচে ফিরলেও হারিয়েছেন তার ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী নাজমীর খাতুন জেসমিন (৩০), আদরের সন্তান আব্দুর রহমান অমীত (১১) এবং খালা শাশুড়ি নাসিমা বেগমকে। যে উঠোনে ঈদের আনন্দের প্রস্তুতি চলছিল, সেখানে এখন শুধুই নিস্তব্ধতা আর আহাজারি।
জানা গেছে, নাসিমা বেগমের মরদেহ দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ীর মথুয়ারাই গ্রামে পাঠানো হয় এবং সেখানে তার জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।
প্রতিবেশীরা জানান, “একসাথে এতগুলো লাশ—এ দৃশ্য কোনোভাবেই সহ্য করার মতো না।” মায়ের কান্না, স্বজনদের আহাজারি আর শিশুদের নিঃশব্দ তাকিয়ে থাকা—সব মিলিয়ে পুরো গ্রাম যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে।
বোয়ালিয়া ইউনিয়নেও একই বেদনাময় চিত্র। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা যাওয়ার পথে প্রাণ হারিয়েছেন স্বামী মোঃ জাহাঙ্গীর আলম (৪৫) ও স্ত্রী মুক্তা খানম (৩৮)। স্ত্রীর জানাজা সম্পন্ন হওয়ার পর স্বামীর মরদেহ উদ্ধারের খবর পৌঁছালে আবারো শোকে ভেঙে পড়ে পরিবার।
ভবানীপুর গ্রামের ছোট্ট ফাইজ শাহনূর (১১) ঈদের আনন্দে বাড়ি ফিরছিল—কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না। তার মরদেহ মানিকগঞ্জে নানা বাড়িতে পাঠানো হয়, সেখানে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
অন্যদিকে মদাপুর ইউনিয়নের তরুণ আশরাফুল ইসলাম (২৪) জীবিকার তাগিদে ঢাকায় ফিরছিলেন—কিন্তু ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে। তার মায়ের বুকফাটা কান্নায় আশপাশের সবাই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন।
এছাড়া উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের ঝাউগ্রামের মজনু খানের ছেলে উজ্জ্বল খান ঢাকায় ফলের ব্যবসা করতেন। ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে তিনিও এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান, যা এলাকায় আরও শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে।
উল্লেখ্য, বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেলে দৌলতদিয়া ঘাটের ৩ নম্বর পন্টুনে ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা উদ্ধার অভিযান শেষে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’র মাধ্যমে বাসটি তোলা হয়।
ঈদ পরবর্তীতে এমন মর্মান্তিক ঘটনায় কালুখালীজুড়ে এখন একটাই শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে— কান্না… শোক… আর বুকফাটা আহাজারি…
