বরিশালে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতার দুই লঞ্চের দায়িত্ব নিলেন ভগ্নিপতি বিএনপি নেতা
X
ভোলার আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আলী আজম মুকুলের হাতে ধরে দলীয় সম্মেলনে উপস্থিত ইবনাত লঞ্চের মালিক আওয়ামীলীগ নেতা খায়রুজ্জামান ফয়সাল।
বরিশাল অভ্যন্তরীন নৌরুটে পলাতক আওয়ামীলীগ শ্যালকের দুটি লঞ্চের দায়িত্ব নিলেন ভগ্নিপতি বিএনপি নেতা। শুধু লঞ্চ চলাচলের দায়িত্বই নয়, লঞ্চ দুটিতে যাত্রী নিশ্চিত করতে অন্য কোন লঞ্চও ঘাটে ভিরতে দিচ্ছেননা ওই বিএনপি নেতার দলীয় কর্মীরা। বরিশাল-ভোলা রুটের এমভি ইবনাত-২ ও ৪ নামের লঞ্চ দুটির কারনে পশাপাশি সিডিউলে থাকা লঞ্চগুলো পড়ছে বিরাট ক্ষতির মুখে।
ভোলার ওই বিএনপি নেতা ইয়ারুল আলম লিটনের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন বরিশাল বিএনপির সিনিয়র নেতারা। যাদের লঞ্চ ব্যবসায় ধ্বস নামতে শুরু করেছে। ঘটনার প্রতিবাদে বড় ধরনের আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষনা দিয়েছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ-চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার বরিশাল জোনের সদস্যরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভোলার দৌলতখান উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক খায়রুজ্জামান ফয়সালের এমভি ইবনাত-২ ও ৪ নামের দুটি লঞ্চ ভোলার আলেকজেন্ডার থেকে দৌলতখান রুটে চলাচল করতো। ২৪ এর ৫ আগষ্টের পর আওয়ামীলীগের এই নেতা এলাকা ছাড়া হয়। ক্ষুব্দ জনতা লঞ্চ দুটিতে আগুন দেয়ার চেষ্টাও চালায়।
একপর্যায় তার শুভাকাংখিদের সহায়তায় লঞ্চ দুটি নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসে। ফলে তার ব্যবসায় চরম আকাড়ে ধ্বস নামে। তবে বেশীদিন সেই সমস্যায় কাটাতে হয়নি তাকে। তার দুটি লঞ্চের দায়িত্ব নেন তারই ভগ্নিপতি ভোলা বিএনপি নেতা ইয়ারুল আলম লিটন। তিনি লঞ্চ দুটিকে নিজের নামে ভাড়া দেখিয়ে বিআইডব্লিউটিএর উর্ধতন কয়েক কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে বরিশাল-ভোলা রুটে রুট পারমিট নেন।
তবে তাকে সুবিধা দিতে গিয়ে বড় ধরনের দূর্নীতির আশ্রয় নেন বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা। লঞ্চ দুটির ফিটনেস ছাড়াই তড়িঘড়ি করে দেয়া হয় রুট পারমিট। শুধু তাই নয় মালিক সমিতিকে উপেক্ষা করে দীর্ঘ বছরের নিয়ম ভেংগে পয়তাল্লিশ মিনিটের পরিবর্তে মাত্র বিশ মিনিটের ব্যবধানে ঘাট ছাড়ছে আওয়ামীলীগ নেতার লঞ্চ দুটি। এতে করে যাত্রী সংকোটে পড়ছে ওই নেতার লঞ্চের পরবর্তী সিডিউলে থাকা নৌযানটি। ঘটনার প্রতিবাদে বিআইডব্লিউটিএ’র প্রধান কার্যালয়ে দৌড়ঝাপ করেও কোন ফল না পেয়ে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন লঞ্চ মালিক সমিতি। ক্ষোভ ঝেড়েছেন সমিতিতে থাকা বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দ।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ-চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার বরিশাল জোনের সদস্যরা জানান, বরিশাল-ভোলা অভ্যন্তরীন নৌ রুটে প্রতিদিন ২০ টি করে ছোট লঞ্চ চলাচল করছে। পাশাপাশি বরিশাল ও ভোলার উভয় প্রান্ত থেকে প্রতিদিন অসংখ্য স্পীডবোড যাত্রী পরিবহন করছে। এতে করে পয়তাল্লিশ মিনিটের ব্যবধানে উভয় ঘাট থেকে লঞ্চ ছেড়ে গেলেও যাত্রী তেমন একটা পাচ্ছেনা নৌযানগুলো।
যাত্রীর এই সংকোটের মধ্যে বিআইডব্লিউটিএ সম্প্রতি এমভি ইবনাত-২ ও ৪ নামের দুটি লঞ্চকে এই রুটে চলাচলের জন্য পারমিট প্রদান করে। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে দুটি লঞ্চেরই মালিক ভোলার দৌলতখান উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক খায়রুজ্জামান ফয়সালের।
যেখানে জুলাই হত্যাকান্ডের নেতৃত্বদানকারী এ দলটির ভোলার অধিকাংশ নেতা জেলখানায় বা পলাতক রয়েছেন সেখানে এই নেতা এখনও বীরদর্পে তার ব্যবসা পরিচালনা করেই সুবিধা নিচ্ছেননা, তিনি বিএনপি নেতাদের মালিকানাধীন লঞ্চকে যাত্রীশুন্য করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। আর তার এই মিশনের সহায়ক হিসেবে বিআইডব্লিউটিএর একাধিক আওয়ামী দোসররা কাজ করছেন বলে অভিযোগ জানিয়েছেন লঞ্চ মালিক সমিতির খোদ বিএনপি নেতারা।
আওয়ামী দোসর ওই সকল সরকারি কর্মকর্তারা তাদের সহযোদ্ধা খায়রুজ্জামান ফয়সালকে রুট পারমিট দিতে গিয়ে নানা অসুদপায় অবলম্বন পর্যন্ত করেছেন বলে দাবী করেন ক্ষতিগ্রস্থ মালিকরা। সার্ভে রিপোর্ট ছাড়াই দেয়া হয় এমভি ইবনাত-২ ও এমভি ইবনাত-৪ নামে ওই দুটি লঞ্চের রুট পারমিট।
নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের দেয়া সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ী খায়রুজ্জামানের মালিকানাধীন এমভি ইবনাত-২ এর ফিটনেস সার্টিফিকেটের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ৭ এপ্রিল, আর এমভি ইবনাত-৪ এর ফিটনেস সার্টিফিকেটের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ২৩ মার্চ। নিয়ম অনুযায়ী রুট পারমিটের জন্য আবেদন করতে হলে ফিটনেস সার্ভে রিপোর্টের নবায়ন থাকতে হবে। কিন্তু আওয়ামীলীগ নেতা খায়রুজ্জামানের ক্ষেত্রে সেটি মানেননি বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা। প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারকের দপ্তর থেকে ৯৪৩০ ও ৯৪৩১ ক্রমিক নম্বরে দেয়া রশিদ অনুযায়ী দেখা যায় ইবনাত-২ ও ৪ লঞ্চ দুটি ২৬ জুলাই সার্ভে করা হয় এবং ২৭ জুলাই ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয়া হয়। অথচ এরও দশ দিন আগে ১৬ জুলাই লঞ্চ দুটির রুট পারমিট দেয় বিআইডব্লিউটিএ। একজন নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের নেতা কিভাবে এই অবৈধ সুবিধা পেলো এটা নিয়ে ফুসে উঠেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ-চলাচল (যাত্রী পরিবহণ) সংস্থার কেন্দ্রীয়সহ বরিশাল জোনের নেতৃবৃন্দ। আর আওয়ামীলীগ নেতার এই সকল কাজে সহায়তা করেছেন ভোলা বিএনপির সদস্য ইয়ারুল আলম লিটন।
তিনি সম্পর্কে আওয়ামীলীগ নেতা খায়রুজ্জামান ফয়সালের ভগ্নিপতি। একজন পলাতক আওয়ামীলীগ নেতার ব্যবসা কিভাবে বিএনপি পরিচালনা করে সে বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে লঞ্চ মালিক সমিতির সদস্যারা বলেন, লিটনের মত কিছু বিএনপির নেতা-কর্মীরা নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামীলীগকে এভাবেই ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করছে। যা রাজনৈতিকভাবে বিএনপিকে কঠোর পরিস্থিতির মুখোমুখি করবে বলে মনে করেন তারা। দলের প্রধান তারেক রহমানের এইসকল নেতাদের ব্যাপারে এখনই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিৎ বলে মনে খোদ বিএনপি নেতারাই।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ-চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি, বরিশাল কোতয়ালী বিএনপির সাবেক সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধা দলের বরিশালের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আক্কাস হোসেন বলেন, বিগত ১৭ বছরে আমরা রাজনৈতিক কারনে লঞ্চ ব্যবসা করতে গিয়ে সিডিউলসহ নানা ঝক্কি ঝামেলার সম্মুখিন হয়েছি। জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিষ্টরা পালিয়ে গেলেও ওই দলের নেতা-কর্মীদের সহায়তা করার জন্য সরকারি দপ্তরগুলোতে কিছু দোসর বসে আছেন। যাদের সহায়তায় এখনও আমরা জাতীয়তাবাদী আদর্শের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি।
তারাই কিনা আমাদের পথে বসাতে অন্য রুট থেকে আওয়ামীলীগ মালিকানাধীন লঞ্চ এনে ফিটনেসবিহীন অবস্থায় বরিশাল অভ্যন্তরীন রুটে চলার অনুমতি দিচ্ছেন। যেমনটা করা হয়েছে ভোলার আওয়ামীলীগ নেতা খায়রুজ্জামান ফয়সালের লঞ্চের ক্ষেত্রে। তিনি আরও বলেন, যেকোন রুটে নতুন লঞ্চ কিংবা সময়সূচি নির্ধারনের ক্ষেত্রে বিগত দিনগুলোতে বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা মালিক সমিতির সাথে আলোচনা করে নিতেন। অথচ এবারই প্রথম কোন আওয়ামীলীগ নেতাকে সুবিধা দিতে গিয়ে মালিক সমিতিকে উপেক্ষা করা হয়েছে। মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় এই নেতা বিআইডব্লিউটিকে তার এই অবৈধ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে দাবী জানিয়ে আন্দোলনের হুমকি দিয়েছেন।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ-চলাচল (যাত্রী পরিবহণ) সংস্থার বরিশাল জোনের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও কোতয়ালী বিএনপির সাবেক সেক্রেটারী আঃ রহিম জানান, বিআইডব্লিউটিএ সেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে লঞ্চ দুটিকে এ রুটে সংযোজন করেছে। তবে প্রধান আপত্তির জায়গা গিয়ে দ্বারিয়েছে দুটি লঞ্চই আওয়ামীলীগ নেতার মালিকানাধীন। আর এই নেতাকে সুবিধা দিতে অবৈধ পথও অবলম্বন করেছে বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা। আর এসব ব্যবস্থা করিয়ে দিয়েছেন ভোলা বিএনপির এক নেতা।
শুধু তাই নয় লঞ্চ দুটি ভোলা ঘাটে নোঙ্গর করলে আর কোন লঞ্চকে ওই সময় ঘাটে ভিড়তে দেয়া পর্যন্ত হচ্ছেনা। আর এসব কাজে দলীয় কর্মীদের ব্যবহার করছেন ওই নেতা। তিনি আরও জানান, লঞ্চ দুটির রুট পারমিট বাতিল না করলে সকল মালিক আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে। লঞ্চ মালিক সমিতির বিএনপিপন্থী সদস্যদের দাবী আওয়ামীলীগকে পুনর্বাসন করতে বিআইডব্লিউটিএর বেশ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী উঠে পড়ে লেগেছেন। বিআইডব্লিউটিএ’কে ওই সকল দোসরমুক্ত দেখতে চান তারা।
এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিএর নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপপরিচালক শেখ মোহাম্মদ সেলিম রেজা বলেন, উক্ত লঞ্চ দুটির রুট পারমিট সম্পর্কিত অফিসিয়াল কাগজপত্র না দেখে কিছু বলতে পারবোনা।
অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিএর বরিশাল অফিসের উপপরিচালক মোঃ সোলায়মান বলেন, বিষয়টি নিয়ে মালিক সমিতি আদালতের দারস্থ হয়েছেন। আদালত আমাদের একটি শোকজ নোটিশ দিয়েছেন। তাই তিনি এ ব্যাপারে কিছু বলতে রাজি হননি।
