বৃহস্পতিবার , ২৭ আগস্ট ২০২৬
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আন্তর্জাতিক
  4. খেলা
  5. খেলাধুলা
  6. জাতীয়
  7. তথ্য-প্রযুক্তি
  8. দেশজুড়ে
  9. প্রবাস
  10. প্রাকৃতিক দুর্যোগ
  11. বিনোদন
  12. মতামত
  13. রাজনীতি
  14. লাইফস্টাইল
  15. শিক্ষা

যদি আর বাঁশি না বাজে 

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
আগস্ট ২৭, ২০২৬ ২:০৯ অপরাহ্ণ
Link Copied!

কিছু কণ্ঠ থেমে যায়, অথচ তাদের উচ্চারণ থামে না। কিছু মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নেন, অথচ তাঁদের উপস্থিতি থেকে যায় মানুষের চিন্তায়, চেতনায়, স্বপ্নে এবং সংগ্রামে। কাজী নজরুল ইসলাম তেমনই এক অবিনশ্বর নাম। তিনি আজ নীরব, তাঁর হাতে আর কলম নেই, কণ্ঠে নেই নতুন কোনো গান; কিন্তু তাঁর কবিতার প্রতিটি শব্দ, তাঁর গানের প্রতিটি সুর, তাঁর বিদ্রোহের প্রতিটি উচ্চারণ আজও আমাদের ভেতরে আলোড়ন তোলে। তাই প্রশ্ন জাগে—যদি আর বাঁশি না বাজে, তবে কি সত্যিই থেমে যাবে নজরুলের সুর?

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব ছিল এক বিস্ময়কর ঘটনা। তিনি এসেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন ভারতবর্ষ পরাধীন, মানুষের জীবনে দারিদ্র্য ও বঞ্চনা, সমাজে বৈষম্য, আর রাজনীতিতে শোষণ ও নিপীড়নের ছায়া। সেই সময়ের সাহিত্যে নজরুল যেন ঝড়ের মতো প্রবেশ করলেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল প্রতিবাদের আগুন, চোখে ছিল মুক্তির স্বপ্ন এবং হৃদয়ে ছিল মানুষের জন্য গভীর ভালোবাসা। তিনি প্রচলিত ভয়কে ভয় পাননি, অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেননি। তাঁর কলম হয়ে উঠেছিল শৃঙ্খল ভাঙার হাতিয়ার।

১৮৯৯ সালের ২৪ মে বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির জীবন শুরু হয়েছিল দারিদ্র্য ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ছোটবেলায় তিনি কখনো মক্তবে পড়িয়েছেন, কখনো লেটোর দলে কাজ করেছেন, আবার জীবনের প্রয়োজনে নানা পেশায় যুক্ত হয়েছেন। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীতে যোগদান তাঁর জীবনে নতুন অভিজ্ঞতার দরজা খুলে দেয়। কিন্তু তাঁর অন্তরের শিল্পী ও কবিকে কোনো পেশাই আটকে রাখতে পারেনি। মানুষের জীবন, সমাজের বৈষম্য, যুদ্ধ, প্রেম, ধর্ম, রাজনীতি ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা—সবকিছু তাঁর সৃষ্টির উপাদান হয়ে উঠেছিল।

নজরুলের সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল বিস্ফোরণগুলোর একটি তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। এই কবিতায় তিনি যেন এক নতুন মানুষের জন্ম ঘোষণা করলেন। “বল বীর—চির-উন্নত মম শির!”—এই উচ্চারণ শুধু একটি কবিতার পঙ্‌ক্তি নয়; এটি ছিল পরাধীন মানুষের আত্মমর্যাদার ঘোষণা। নজরুলের বিদ্রোহ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে, পরাধীনতার বিরুদ্ধে। তাঁর বিদ্রোহের কেন্দ্রে ছিল মানুষ এবং মানুষের মুক্তি।

কিন্তু নজরুলকে শুধু বিদ্রোহের কবি হিসেবে দেখলে তাঁর বিশাল সৃষ্টিসত্তাকে ছোট করে দেখা হয়। তাঁর ভেতরে যেমন ছিল বজ্রের মতো কঠিন প্রতিবাদ, তেমনি ছিল শিশিরের মতো কোমল প্রেম। তিনি যেমন লিখেছেন যুদ্ধ ও বিপ্লবের কবিতা, তেমনি লিখেছেন প্রেমের গান, প্রকৃতির গান, ভক্তিগীতি, ইসলামী গান, শ্যামাসংগীত ও গজল। তাঁর সৃষ্টির মধ্যে হিন্দু-মুসলমান সংস্কৃতির অসাধারণ সমন্বয় দেখা যায়। তিনি কোনো বিভেদের কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন মিলনের কবি।

নজরুলের কাছে ধর্ম ছিল মানুষের আত্মিক অনুভূতির বিষয়, মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির অস্ত্র নয়। তিনি মসজিদের আজান শুনেছেন, আবার শ্যামার আরাধনায়ও মগ্ন হয়েছেন। তাঁর কবিতা ও গানে ইসলামি ঐতিহ্য যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে হিন্দু পুরাণ ও শাক্ত ভাবনা। এই অসাম্প্রদায়িক মানসিকতাই তাঁকে বাংলা সাহিত্যে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে। তিনি বুঝেছিলেন, মানুষের রক্তের রং এক, মানুষের কান্নার ভাষা এক এবং মানুষের স্বপ্নেরও কোনো ধর্মীয় সীমারেখা নেই।

নারীমুক্তির ক্ষেত্রেও নজরুল ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। নারীকে তিনি কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন সংগ্রামের সহযোদ্ধা হিসেবে। তাঁর সাহিত্য নারীর মর্যাদা ও স্বাধীনতার কথা বলে। সমাজের প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোকে প্রশ্ন করার সাহস তিনি দেখিয়েছিলেন এমন এক সময়ে, যখন নারীর স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলাই ছিল দুঃসাহসিক ব্যাপার।

নজরুলের গান বাংলা সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। তাঁর সৃষ্টির পরিমাণ যেমন বিপুল, তেমনি বৈচিত্র্যও বিস্ময়কর। প্রেম, বিরহ, ভক্তি, দেশপ্রেম, বিদ্রোহ, মানবতা—জীবনের প্রায় প্রতিটি অনুভূতির জন্য তিনি রেখে গেছেন গান। তাঁর সুরে কখনো ঝড়ের গর্জন, কখনো প্রেমিকের আকুলতা, কখনো ভক্তের প্রার্থনা, আবার কখনো স্বাধীনতার উন্মত্ত আহ্বান। তাঁর সংগীত বাংলা গানের ভুবনকে এমন এক বৈচিত্র্য দিয়েছে, যার প্রভাব আজও অমলিন।

কিন্তু জীবনের এক পর্যায়ে এসে হঠাৎ থেমে গেল সেই সৃষ্টিশীল কণ্ঠ। ১৯৪২ সালে কঠিন অসুস্থতা নজরুলের বাক্‌শক্তি ও সৃষ্টিশক্তিকে স্তব্ধ করে দেয়। যে মানুষটি শব্দ দিয়ে ঝড় তুলেছিলেন, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে শব্দহীন হয়ে পড়লেন। যে কবি অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে কথা বলেছিলেন, তাঁর নিজের কণ্ঠেই নেমে এল গভীর নীরবতা। এই নীরবতা ছিল বাংলা সাহিত্যের জন্য এক অপূরণীয় বেদনা।

তখন থেকেই যেন আমাদের মনে প্রশ্ন জন্ম নেয়—যদি আর বাঁশি না বাজে?

যে বাঁশি একদিন শোষিত মানুষের হৃদয়ে সাহস জাগিয়েছিল, যে বাঁশি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানবতার গান গেয়েছিল, যে বাঁশি প্রেম ও সাম্যের কথা বলেছিল—সেই বাঁশি যদি সত্যিই থেমে যায়, তবে কে গাইবে সেই গান?

কিন্তু নজরুলের ক্ষেত্রে নীরবতা কখনো পরাজয় নয়। তাঁর কণ্ঠ থেমে গেলেও তাঁর সৃষ্টি থামেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কবিতা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়েছে। পৃথিবীর কোথাও যখন মানুষ নিপীড়িত হয়, কোথাও যখন ধর্মের নামে বিভাজন তৈরি হয়, কোথাও যখন দুর্বল মানুষ শক্তিশালীর কাছে পরাজিত হয়, তখন নজরুলের কবিতা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। তিনি যেন দূর থেকে বলে ওঠেন—মাথা নত করো না, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াও।

আজকের পৃথিবী অনেক বদলেছে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, যোগাযোগকে করেছে দ্রুত। কিন্তু মানুষের ভেতরের সংকট কি কমেছে? বৈষম্য, হিংসা, যুদ্ধ, ধর্মীয় উগ্রতা, জাতিগত বিদ্বেষ, অর্থনৈতিক শোষণ—এসব এখনো পৃথিবীর বাস্তবতা। এমন সময়ে নজরুলকে কেবল স্মরণ করলেই হবে না; তাঁকে উপলব্ধি করতে হবে। তাঁর কবিতার শব্দকে জীবনের আচরণে রূপ দিতে হবে। তাঁর সাম্যের স্বপ্নকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাঁর মানবতার দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে।

নজরুল আমাদের শিখিয়েছেন, মানুষের স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়; মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা, বিবেকের স্বাধীনতা এবং মর্যাদার স্বাধীনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শিখিয়েছেন, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে শান্তিতে থাকা যায় না। তিনি শিখিয়েছেন, ভালোবাসা দুর্বলতা নয়, বরং মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি দেখিয়েছেন, একজন কবিও সমাজ পরিবর্তনের শক্তি হয়ে উঠতে পারেন।

আজ যখন আমরা নজরুলকে জাতীয় কবি হিসেবে শ্রদ্ধা করি, তখন শুধু তাঁর জন্মদিনে ফুল দিয়ে বা তাঁর কবিতা আবৃত্তি করে আমাদের দায়িত্ব শেষ হয় না। তাঁর প্রকৃত প্রতি শ্রদ্ধা হবে তখনই, যখন আমরা মানুষের পাশে দাঁড়াব, অন্যায়ের প্রতিবাদ করব, ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ভুলে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখব এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখব।

নজরুলের জীবন আমাদের কাছে তাই এক গভীর শিক্ষা। তিনি দারিদ্র্যকে ভয় পাননি, প্রতিকূলতাকে ভয় পাননি, কারাবরণকে ভয় পাননি, ক্ষমতার রোষকে ভয় পাননি। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের মুক্তিতে। তাঁর কণ্ঠে যে বিদ্রোহ ছিল, তার গভীরে ছিল ভালোবাসা। তাঁর রণহুঙ্কারের অন্তরালে ছিল মানুষের প্রতি অসীম মমতা। তাঁর ঝড়ের মতো কবিতার ভেতরেও ছিল একটি সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক পৃথিবীর স্বপ্ন।

আজ কবি নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন আছে। কণ্ঠ নেই, কিন্তু তাঁর গান আছে। হাতের বাঁশি নেই, কিন্তু তাঁর সুর আছে। চোখের সামনে তাঁর চলমান উপস্থিতি নেই, কিন্তু তাঁর সাহিত্য আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর কবিতা পড়বে, তাঁর গান গাইবে, তাঁর বিদ্রোহের কথা বলবে এবং তাঁর মানবতার দর্শন থেকে শক্তি নেবে।

তাই ‘যদি আর বাঁশি না বাজে’—এই আক্ষেপের শেষ উত্তর হয়তো আক্ষেপ নয়, দায়িত্ব। নজরুলের বাঁশি যদি তাঁর হাতে আর না বাজে, তবে সেই বাঁশি আমাদের হাতে তুলে নিতে হবে। তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে হবে। তাঁর সাম্যের গান আমাদের সমাজে গাইতে হবে। তাঁর মানবতার আলো দিয়ে অন্ধকার দূর করতে হবে।

নজরুলের বাঁশি আসলে থামেনি। তা বাজছে প্রতিটি প্রতিবাদী কণ্ঠে, প্রতিটি মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়, প্রতিটি ভালোবাসার গানে, প্রতিটি সাম্যের স্বপ্নে। যতদিন পৃথিবীতে অন্যায় থাকবে, ততদিন নজরুলের বিদ্রোহ প্রয়োজন হবে। যতদিন মানুষে মানুষে বিভেদ থাকবে, ততদিন তাঁর সাম্যের বাণী প্রয়োজন হবে। যতদিন মানুষ ভালোবাসবে, স্বপ্ন দেখবে এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় এগিয়ে যাবে, ততদিন তাঁর বাঁশির সুরও বেজে চলবে।

হয়তো কবি আজ নীরব। হয়তো তাঁর ঠোঁটে আর নতুন কোনো গান জন্ম নেবে না। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আমাদের হাতে, তাঁর আদর্শ আমাদের সামনে, তাঁর স্বপ্ন আমাদের বিবেকের কাছে। তাই আজ আমাদেরই বলতে হবে—নজরুলের বাঁশি থামেনি, থামবে না। সেই বাঁশির সুর বহন করবে নতুন প্রজন্ম।

আর যদি কোনোদিন সত্যিই মনে হয়—নজরুলের বাঁশি আর বাজে না, তবে চারপাশের নীরবতা ভেঙে আমাদেরই গেয়ে উঠতে হবে তাঁর সাম্যের গান, তাঁর মানবতার গান, তাঁর মুক্তির গান।

কারন নজরুলের বাঁশি একটি বাদ্যযন্ত্রের নাম নয়; এটি মানুষের জেগে ওঠার প্রতীক।

লেখক: মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন

ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।

mahbubhossain786@yahoo.com

ঢাকা ইনফো২৪

ঢাকা ইনফো ২৪ একটি বহুমুখী তথ্য বাতায়ন যেখানে আপনি পাবেন ব্রেকিং নিউজ, লাইফস্টাইল গাইড এবং ক্যারিয়ার বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ সব আপডেট। আপনার প্রতিদিনের তথ্যের চাহিদা মেটাতে আমরা আছি আপনার পাশে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।

📰 ঢাকা ইনফো২৪

দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, প্রবাসীদের তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট

আরও পড়ুন
`);w.document.close();setTimeout(function () { w.focus(); w.print(); }, 500);});});