এক প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া গ্যাস সংযোগ আরেক প্রতিষ্ঠানে। তাও এক-দুই বছর নয়, প্রায় ২৫ বছর ধরে। কিশোরগঞ্জের ভৈরবে রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজের ছাত্রীবাসের নামে অনুমোদিত মিটারযুক্ত গ্যাস সংযোগ থেকে পাশের হালিমা সাদিয়া মহিলা মাদ্রাসার রান্নাঘরে গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। একই সংযোগ থেকে কলেজের একটি ক্যান্টিনেও গ্যাস ব্যবহারের তথ্য মিলেছে।
দীর্ঘ সময় ধরে দুটি প্রতিষ্ঠানের গ্যাস ব্যবহারের বিষয়টি কীভাবে চলেছে, মাদ্রাসায় গ্যাস নেওয়ার অনুমোদন ছিল কি না এবং একই মিটার থেকে ক্যান্টিনে বাণিজ্যিক ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, এত বছর ধরে তিতাস গ্যাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নজরে বিষয়টি আসেনি কেন?
জানা গেছে, প্রায় ২৫ বছর আগে রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজের ছাত্রীবাসের গ্যাস সংযোগ থেকে পাশের হালিমা সাদিয়া মহিলা মাদ্রাসায় একটি লাইন নেওয়া হয়। বর্তমানে দুই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষই গ্যাস ব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে কলেজের সংযোগ থেকে মাদ্রাসায় গ্যাস সরবরাহের জন্য তিতাস গ্যাসের লিখিত অনুমোদন বা পৃথক কোনো সংযোগের তথ্য তারা দেখাতে পারেননি।
হালিমা সাদিয়া মহিলা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মো. মাহবুবুর রহমান ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, মাদ্রাসায় দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় এক হাজার আবাসিক। তিনি প্রায় ২৫ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত।
মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আরও জানান, কলেজের মিটারের বিপরীতে যে গ্যাস বিল আসে, তার অর্ধেক মাদ্রাসা পরিশোধ করে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় মাদ্রাসায় সিলিন্ডার গ্যাসও ব্যবহার করা হয়।
তবে গ্যাস সংযোগ নেওয়ার সময় তিতাসের কোনো লিখিত অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, কিংবা দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গ্যাস ব্যবহারের বিষয়ে কোনো চুক্তি বা নথি রয়েছে কি না এ বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো দলিল দেখাতে পারেননি।
বর্তমানে মাদ্রাসার দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছেন প্রতিষ্ঠাতা মরহুম হাজী মো. রফিকুল ইসলামের ছেলে মোহাম্মদ রাকিব শরফুদ্দিন।
অভিযোগ রয়েছে, কলেজের ছাত্রীবাসের নামে থাকা একই গ্যাস সংযোগ ব্যবহার করে কলেজ ক্যাম্পাসের একটি ক্যান্টিনেও রান্নার কাজ চলছে।
১৪ সেপ্টেম্বর, সোমবার দুপুরে সরেজমিনে রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজে গিয়ে দেখা যায়, ছাত্রীবাসের রান্নাঘরে চারটি বড় চুলা ব্যবহার করা হচ্ছে। রান্নাঘরের বাইরে আরও একটি সাধারণ চুলার সংযোগ রয়েছে। কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে থাকা একটি ক্যান্টিনে দুটি চুলাও ব্যবহার হতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কলেজের ইলেকট্রিশিয়ান মামুন মিয়া ক্যান্টিনটি পরিচালনা করছেন।
কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শহীদুল্লাহ বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ইলেকট্রিশিয়ান মামুন মিয়া ক্যান্টিনটি ভাড়া নিয়েছেন। গ্যাস বিলসহ প্রতি মাসে তিনি কলেজকে ১০ হাজার টাকা দেন। ক্যান্টিনের চুলাগুলোর গ্যাস ব্যবহারও কলেজের একই মিটারের আওতায় রয়েছে।
তবে ক্যান্টিনে গ্যাস ব্যবহারের জন্য আলাদা কোনো অনুমোদন বা বাণিজ্যিক সংযোগ রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শহীদুল্লাহ বলেন, তিনি প্রায় পৌনে চার বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে শরীফ উদ্দিন আহমেদ ২৬ বছরের বেশি সময় অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার দায়িত্ব গ্রহণের অনেক আগেই কলেজের গ্যাস সংযোগ থেকে মাদ্রাসায় লাইন নেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, মিটার অনুযায়ী দুই প্রতিষ্ঠানই গ্যাস বিল পরিশোধ করছে। ফলে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে না।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, একটি প্রতিষ্ঠানের নামে অনুমোদিত সংযোগ থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে শুধু মিটার থাকা ও বিল পরিশোধ করাই যথেষ্ট কি না এর উত্তর দিতে পারবেন সংশ্লিষ্ট গ্যাস কর্তৃপক্ষ।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে তিতাস গ্যাসের তদারকি নিয়ে। প্রায় ২৫ বছর ধরে একই সংযোগ থেকে পাশের একটি প্রতিষ্ঠানে গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ থাকলেও ভৈরব তিতাস অফিস এ বিষয়ে আগে অবগত ছিল না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ভৈরব অফিসের ইনচার্জ কাইসার আলম বলেন, প্রতিবেদকের মাধ্যমে বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছেন।
তিনি বলেন, সরেজমিন তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, কলেজের ছাত্রীবাসের নামে অনুমোদিত গ্যাস সংযোগ থেকে কীভাবে প্রায় ২৫ বছর ধরে পাশের মাদ্রাসায় গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে? এর জন্য তিতাসের লিখিত অনুমোদন ছিল কি না? থাকলে সেই অনুমোদনের নথি কোথায়? আর একই মিটার থেকে একটি ক্যান্টিনে রান্নার গ্যাস ব্যবহারের অনুমতিই বা কী?
তাদের দাবি, শুধু বর্তমান ব্যবহার নয়, গ্যাস সংযোগটি কবে, কার নামে এবং কোন উদ্দেশ্যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল এসব নথি যাচাই করে তদন্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে এই সংযোগ ব্যবহারের বিষয়টি তিতাসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নজর এড়িয়ে গেল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা উচিত।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের তদন্তেই এখন পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষা কলেজের সংযোগ থেকে মাদ্রাসায় গ্যাস সরবরাহের পেছনে কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল, নাকি দীর্ঘদিন ধরে নিয়মের বাইরে গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে।