শুক্রবার , ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আন্তর্জাতিক
  4. খেলা
  5. খেলাধুলা
  6. জাতীয়
  7. তথ্য-প্রযুক্তি
  8. দেশজুড়ে
  9. প্রবাস
  10. প্রাকৃতিক দুর্যোগ
  11. বিনোদন
  12. মতামত
  13. রাজনীতি
  14. লাইফস্টাইল
  15. শিক্ষা

এক গাছেই যেন সবুজ পাহাড়


সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬ ৯:২৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

দূর থেকে দেখলে মনে হবে সবুজ কোনো ছোট্ট পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। কাছে যেতেই ভুল ভাঙে। পাহাড় নয়, এটি একটিমাত্র আমগাছ। তবে এমন গাছ যার বিস্তৃত ডালপালা, মাটিতে নেমে আসা কাণ্ড আর ঘন সবুজ পাতার আচ্ছাদন দেখে একে নিছক ‘আমগাছ’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা শাখা-প্রশাখা মিলিয়ে গাছটি যেন প্রকৃতির নিজ হাতে তৈরি এক সবুজ স্থাপত্য।

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার মহেশপুর ইউনিয়নের হিরণ্যকান্দি গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে এই অতিকায় আমগাছ। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘শতবর্ষী আমগাছ’ নামে পরিচিত। বয়সের সঠিক হিসাব নেই, নেই জন্মের কোনো লিখিত দলিল। কিন্তু কয়েক প্রজন্ম ধরে মানুষের স্মৃতিতে গাছটি একই রকম বিশাল। তাই বয়স নিয়ে যত মতভেদই থাক, শতবর্ষের নিচে নামাতে রাজি নন গ্রামের কেউই।

ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক ধরে গোপালগঞ্জের দিকে যেতে হিরণ্যকান্দি বাসস্ট্যান্ড। এখান থেকে পূর্ব দিকে ইট বিছানো সড়ক ধরে প্রায় ৩০০ গজ এগোলেই চোখের সামনে খুলে যাবে সবুজের এক বিশাল পরিসর। প্রথম দেখায় বোঝা কঠিন, এত বড় ছায়া আসলে একটি গাছের। কাছে গেলে দেখা যায়, একাধিক কাণ্ড মাটির দিকে নেমে এসেছে। কোথাও মোটা ডাল মাটিকে ছুঁয়ে আবার ওপরে উঠে গেছে। গাছের নয়টি প্রধান কাণ্ড যেন আলাদা আলাদা গাছের মতো দাঁড়িয়ে আছে। শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।

স্থানীয়দের হিসাবে, গাছটির বিস্তৃতি প্রায় ৫৪ থেকে ৫৭ শতাংশ জমিজুড়ে। বিশাল আকৃতির কারণে একটু দূর থেকে তাকালে তাই গাছটিকে আর গাছ বলে মনে হয় না; মনে হয় সবুজ একটি টিলা। গাছের নিচে দাঁড়ালে চারপাশের ব্যস্ততা যেন কিছুটা থেমে যায়। মাথার ওপর পাতার ঘন ছাউনি। ডালে ডালে পাখির আনাগোনা। কোথাও ছোট পাখির বাসা। গরমের দিনে এখানে দাঁড়ালে পাওয়া যায় প্রশান্তির ছায়া। প্রকৃতির এমন আয়োজনের সামনে দাঁড়িয়ে শহুরে জীবনের ব্যস্ততা কিছুক্ষণের জন্য হলেও দূরে সরে যায়।

গাছটির বয়স নিয়ে হিরণ্যকান্দির মানুষের মধ্যে নানা কথা প্রচলিত। কেউ বলেন, বয়স একশ বছরের বেশি। কারও মতে দেড়শ বছর। আবার কেউ কেউ মনে করেন, বয়স দুইশ বছরের কাছাকাছি। তবে গাছটির বয়স নিয়ে কোনো লিখিত দলিল না থাকায় নির্দিষ্ট করে কিছু বলা কঠিন। স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিই এখানে প্রধান অবলম্বন।

হিরণ্যকান্দির এক প্রবীণ নারী জানান, পাঁচ দশকেরও বেশি আগে বিয়ের পর এই গ্রামে এসে তিনি গাছটিকে যে অবস্থায় দেখেছেন, এখনো প্রায় সেই অবস্থাতেই দেখছেন। তার কাছে গাছটি শুধু একটি পুরোনো বৃক্ষ না, এটি গ্রামের দীর্ঘ জীবনের নীরব সাক্ষী।

বর্তমান মালিকপক্ষের সদস্য বাচ্চু শেখ ও তার ভাইদের পরিবারের ভাষ্য, দেশি প্রজাতির এই আমগাছটি তাদের পূর্বপুরুষদের কেউ রোপণ করেছিলেন। কে বা কখন রোপণ করেছিলেন, তার সঠিক তথ্য তাদেরও জানা নেই। তবে তাদের বাবা-দাদারাও গাছটিকে প্রায় একই বিশাল আকৃতিতে দেখে গেছেন।

আম নিয়ে লেখালেখি করা কৃষিবিদ মৃত্যুঞ্জয় রায়ের মতে, বাংলাদেশের আমগাছের সাধারণ আয়ুষ্কাল প্রায় ১০০ বছর। কোনো কোনো গাছ এর চেয়ে বেশি সময় বাঁচতে পারে। তবে কোনো গাছের বয়স ২০০ বছর কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলতে হলে বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা প্রয়োজন।

নামের সঙ্গে যখন আমগাছ, তখন ফলনের কথাও আসবে। হিরণ্যকান্দির এই গাছটি শুধু আকারে বড় নয়, আমের ফলনেও বিস্ময় জাগায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, বছরভেদে এই গাছ থেকে প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ মণ পর্যন্ত আম পাওয়া যায়। কাঁচা অবস্থায় আম টক, আর পেকে গেলে বেশ মিষ্টি। মৌসুমে গাছের ডালে ডালে যখন আম ঝুলতে থাকে, তখন দৃশ্যটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। গাছের আম স্থানীয়ভাবে বিক্রি করা হয়। আবার দূর থেকে গাছ দেখতে আসা দর্শনার্থীদের অনেকেই মৌসুমে এর আমের স্বাদ নেন। ফলে ফলন যেমন স্থানীয়দের কাছে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গাছটির সঙ্গে মানুষের আবেগও জড়িয়ে আছে।

একটি গাছ দেখতে মানুষ কেন এত দূর থেকে আসবেন

হিরণ্যকান্দিতে না গেলে বিষয়টি বোঝা কঠিন। স্থানীয়দের হিসাবে, প্রতিদিনই দেড় থেকে দুই শতাধিক মানুষ গাছটি দেখতে আসেন। ছুটির দিন কিংবা বিশেষ কোনো উৎসব হলে দর্শনার্থীর সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। পহেলা বৈশাখ, দুই ঈদ কিংবা অন্যান্য উৎসবের দিনে গাছটির আশপাশে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

পরিবার নিয়ে আসেন অনেকে। কেউ আসেন বন্ধুদের সঙ্গে। কেউ আবার গাছটির বিশালতা দেখতেই ক্যামেরা হাতে হাজির হন। কেউ কেউ পিকনিকের আয়োজনও করেন।

স্থানীয় শিক্ষার্থী সোহান খান বলে, প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই গাছ দেখতে আসে। আমাদের গ্রামে এমন একটি গাছ আছে এটা ভাবতেই ভালো লাগে।

স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিনের কাছে এই গাছ গ্রামের গর্ব। তার মতে, বছরে একবার এখানে মেলাও বসে। গাছটিকে ঘিরে মানুষের এই আগ্রহ ভবিষ্যতে আরও বড় পর্যটন সম্ভাবনার কথা জানান দেয়।

গোপালগঞ্জ জেলা শহর থেকে হিরণ্যকান্দির দূরত্ব আনুমানিক ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার। ভাটিয়াপাড়া গোলচত্বর থেকে সড়কপথে আরও কাছাকাছি। আর ভাঙ্গা গোলচত্বর থেকে হিরণ্যকান্দির দূরত্ব আনুমানিক ৪৫ থেকে ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে—রুট ও সড়কের নির্দিষ্ট পয়েন্ট অনুযায়ী দূরত্ব কিছুটা কমবেশি হতে পারে।

রাজধানী ঢাকা থেকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক ধরে ভাঙ্গা ও ভাটিয়াপাড়া হয়ে হিরণ্যকান্দি যাওয়া যায়। ঢাকার অবস্থান ও নির্ধারিত রুটভেদে মোট সড়ক দূরত্ব আনুমানিক ১৪০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার।

যেভাবে যাবেন-

ঢাকা থেকে বাসে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক ধরে ভাঙ্গা ও ভাটিয়াপাড়া হয়ে হিরণ্যকান্দি বাসস্ট্যান্ডে নামা যায়। বাসস্ট্যান্ড থেকে পূর্ব দিকে প্রায় ৩০০ গজ ইট বিছানো সড়ক ধরে এগোলেই দেখা মিলবে অতিকায় আমগাছটির। গোপালগঞ্জ শহর থেকেও বাস, ইজিবাইক বা অটোরিকশায় কাশিয়ানী ও ভাটিয়াপাড়া হয়ে হিরণ্যকান্দি যাওয়া যায়। ভাটিয়াপাড়া থেকে স্থানীয় যানবাহনেও হিরণ্যকান্দি পৌঁছানো সম্ভব। তবে যারা প্রথমবার যাবেন, তাদের জন্য সবচেয়ে সহজ পথ হলো ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের হিরণ্যকান্দি বাসস্ট্যান্ডে নেমে স্থানীয়দের কাছে শতবর্ষী আমগাছ’ জানতে চাওয়া। গাছটির অবস্থান স্থানীয়দের কাছে সুপরিচিত।

প্রকৃতির তৈরি এই আকর্ষণকে ঘিরে স্থানীয়দের স্বপ্নও বড়। তারা চান, গাছটিকে সংরক্ষণ করে এর চারপাশে পরিকল্পিতভাবে একটি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হোক।

দর্শনার্থীদের জন্য বসার জায়গা, বিশ্রামাগার, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও ছোট পরিসরের বিনোদন সুবিধা থাকলে এখানে আরও বেশি মানুষ আসবেন বলে মনে করেন স্থানীয়রা। বর্তমানে গাছটির পাশে পর্যটকদের জন্য তেমন কোনো অবকাঠামো নেই। স্থানীয়দের ভাষ্য, গাছটির কাছে যাওয়ার প্রায় আধা কিলোমিটার রাস্তা দুই বছর আগে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পাকা করা হয়েছে। মহাসড়কের পাশে দর্শনার্থীদের পথনির্দেশ দিতে সাইনবোর্ডও স্থাপন করা হয়েছে। তবে গাছটির বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ, নিয়মিত পরিচর্যা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এখনো বড় কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

মহেশপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী আবুল কালাম আজাদ বলেন, এই আমগাছ এলাকার ঐতিহ্য। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ গাছটি দেখতে আসেন। সরকারিভাবে গাছটি সংরক্ষণের পাশাপাশি এখানে একটি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হলে এলাকাবাসী উপকৃত হবে।

জেলা বন কার্যালয়ের রেঞ্জ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, গাছটি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে বন বিভাগ যাতে উদ্যোগ নিতে পারে, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।

শতবর্ষী হোক বা তারও বেশি বয়সের হিরণ্যকান্দির আমগাছটি যে একটি বিরল প্রাকৃতিক ঐতিহ্য, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। কালের প্রবাহে কত গাছ হারিয়ে গেছে। কত পুরোনো বৃক্ষ মানুষের প্রয়োজনের কাছে হার মেনেছে। সেই বাস্তবতায় একটি অতিকায় পুরোনো গাছ টিকে থাকা নিজেই বিস্ময়ের।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।

📰 ঢাকা ইনফো২৪

দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, প্রবাসীদের তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট

আরও পড়ুন
`);w.document.close();setTimeout(function () { w.focus(); w.print(); }, 500);});});