মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাত থামাতে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হলেও বাস্তব পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন, অন্যদিকে সামরিক বিকল্পও খোলা রেখেছেন। এক প্রতিবেদনে এ সকল তথ্য জানিয়েছে কাতার ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরা।
সম্প্রতি ইসলামাবাদ-এ পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিশর-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে বসেন। বৈঠকে চার দেশের প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংলাপ শুরু করতে একটি সমন্বিত কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ই ইসলামাবাদের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছে এবং শিগগিরই সরাসরি আলোচনা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে চার দেশের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা আলোচনার রূপরেখা নির্ধারণ করবে।
বৈঠকে অংশ নেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান, মিশরের বদর আবদেলাত্তি এবং সৌদি আরবের প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ।
ট্রাম্পের দ্বৈত অবস্থান
বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা পরই এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “ইরানের সঙ্গে চুক্তি খুব শিগগিরই হতে পারে।” তবে একইসঙ্গে তিনি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখলের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।
তিনি আরও জানান, পাকিস্তানের মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনা চলছে এবং ৬ এপ্রিলের মধ্যে ইরান চুক্তিতে না এলে জ্বালানি খাতে হামলার হুঁশিয়ারিও পুনর্ব্যক্ত করেন।
কূটনৈতিক অগ্রগতি, কিন্তু ‘শুরুর ধাপ’
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামাবাদ বৈঠক মুসলিম বিশ্বের পক্ষ থেকে প্রথম সংগঠিত শান্তি উদ্যোগ। পাকিস্তান ও তুরস্ক—দুটি দেশই ইরানের প্রতিবেশী হওয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তাদের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
তবে সাবেক কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি এখনো “baby steps” বা প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্যোগ। কারণ, যুদ্ধ থামানোর মতো আস্থা এখনো তৈরি হয়নি।
এই উদ্যোগে সম্ভাব্য চারটি ধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে:
আস্থা তৈরির উদ্যোগ
যুদ্ধবিরতি আলোচনা
জটিল ইস্যুতে সরাসরি সংলাপ
চূড়ান্ত সমঝোতা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান দূরবর্তী
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় বাধা হলো দুই পক্ষের দাবি-দাওয়ার মৌলিক পার্থক্য।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে:
এক মাসের যুদ্ধবিরতি
উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর
পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করা
ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে নিয়ন্ত্রণ
আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন বন্ধ
অন্যদিকে ইরান দাবি করছে:
আগ্রাসন বন্ধ
ক্ষতিপূরণ
ভবিষ্যতে হামলা না করার নিশ্চয়তা
মিত্রদের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ
হরমুজ প্রণালি-এর ওপর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই মার্কিন প্রস্তাবকে “অবাস্তব ও অতিরিক্ত” বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং ইসলামাবাদের এই উদ্যোগ নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন।
চীন ও জাতিসংঘের সমর্থন
পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক উদ্যোগে সমর্থন জানিয়েছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
এছাড়া আন্তোনিও গুতেরেস-ও শান্তি প্রচেষ্টার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও সামরিক প্রস্তুতি থেমে নেই। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করেছে, যার মধ্যে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ USS Tripoli-সহ বড় বহর রয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলও ইরানে হামলা অব্যাহত রেখেছে। জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি দানন জানিয়েছেন, ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।
হরমুজ প্রণালি ও বৈশ্বিক অর্থনীতি
ইরান সম্প্রতি ২০টি পাকিস্তানি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে, যা আস্থা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে প্রণালিটি কার্যত বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব পড়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে, এটি ইতিহাসের অন্যতম বড় তেল সংকট। ইতোমধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১১৬ ডলার ছাড়িয়েছে।
বড় বাধা: আস্থাহীনতা ও ইসরায়েলের ভূমিকা
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইরানের গভীর অবিশ্বাস। তেহরান আশঙ্কা করছে, কূটনৈতিক আলোচনার আড়ালে সামরিক হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হতে পারে।
এছাড়া ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তান-নেতৃত্বাধীন এই উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পথ খুলে দিলেও তা এখনো অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
বিশ্লেষকদের মতে, অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে এবং তা বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
