দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। কমেছে লোডশেডিং, পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে বেড়েছে গ্যাস সরবরাহ। এতে বিদ্যুৎ, শিল্প ও অন্যান্য খাতে সরবরাহ পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি) সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় দেশে লোডশেডিং ছিল ৭২ মেগাওয়াট। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৪৫২ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ ১৪ হাজার ৩৮০ মেগাওয়াট। দুপুর ২টায় লোডশেডিং দাঁড়ায় ১৭৪ মেগাওয়াটে। তখন চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ১৭ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ ১৪ হাজার ৯২৬ মেগাওয়াট।
এর আগের দিন শনিবার ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৫৬৮ মেগাওয়াট। তবে এর প্রায় ১০ দিন আগে দিনের বিভিন্ন সময়ে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত উঠেছিল।
একই সময়ে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহও বেড়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, রোববার দুপুর ২টায় মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৬১৯ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এর মধ্যে এলএনজি থেকে এসেছে ১ হাজার ১৬ মিলিয়ন ঘনফুট। এর আগে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্নের কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ২০০ এমএমসিএফডিতে নেমে এসেছিল।
এতে শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে গ্যাসের সংকট দেখা দেয়। গত ১৫ সেপ্টেম্বরও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ২ হাজার ৬০৬ এমএমসিএফডিতে উন্নীত হওয়ার কথা জানিয়েছিল পেট্রোবাংলা।
রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক হয়েছে এবং সঠিকভাবে জ্বালানি দেশে আসছে। তিনি জানান, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে তেল ও গ্যাস সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে। এ ছাড়া একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও সরবরাহে বিলম্ব তৈরি করে।
মন্ত্রী বলেন, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে কিছুটা সময় লেগেছে। এখন জ্বালানি আমদানি করা সম্ভব হয়েছে এবং সরবরাহের সময়সূচিও নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন করে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে আগামী দিনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে জোর
বর্তমান সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সরকারের ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে ৩০টির কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে বলে সংসদে জানিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী।
এ ছাড়া নতুন গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক জরিপের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের পরিকল্পনায় ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের কথাও বলা হয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৫০ কূপের কর্মসূচির পাশাপাশি শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত গ্যাস নিশ্চিত করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
গ্যাসের ব্যবহার কমাতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে শিল্প খাতে অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করায় সরকারের ওপর আর্থিক চাপও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং এলএনজি সরবরাহের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে জ্বালানি খাতে ব্যয় বাড়ছে। ফলে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।