জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থনীতি, বিনিয়োগ, জলবায়ু, রোহিঙ্গা সংকট ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন। পাঁচ দিনের সফরের মধ্যে নিউইয়র্কে চার দিনের কর্মসূচিতে তিনি ৩০টি আনুষ্ঠানিক বৈঠক ও কার্যক্রমে অংশ নেন। এসব বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্ব পায়।
ওয়াল স্ট্রিটে বিনিয়োগের বার্তা
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ছিল ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক। জেপি মরগান চেজের আয়োজনে অনুষ্ঠিত প্রাতরাশ বৈঠকে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছে। এর ফলে বোয়িংয়ের সঙ্গে বিমানের মোট উড়োজাহাজের অর্ডার ২৫টিতে দাঁড়িয়েছে। নতুন চুক্তিতে পাঁচটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার ও ছয়টি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স উড়োজাহাজ রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করেন তারেক রহমান। একইভাবে গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও মার্ক সুজম্যানের সঙ্গে জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসেবা আধুনিকায়ন নিয়ে আলোচনা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠক
সফরে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এসব আলোচনায় বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষা, জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানো, জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ খাত ও বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয় উঠে আসে। তিন দেশই প্রধানমন্ত্রীকে নিজ নিজ দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গেও বৈঠক করেন তারেক রহমান। সেখানে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বহুমুখী করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
জাতিসংঘে ৩-আর কৌশল
২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলায় দেওয়া ভাষণে দেশের পুনর্গঠনে সরকারের ৩-আর কৌশল—‘রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’ বা পুনরুদ্ধার, পুনঃস্থাপন ও পুনর্নির্মাণ—তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন।
ভাষণে আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে সংলাপ, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অভিযোজন অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জোরালো অবস্থান
জাতিসংঘের অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকটও গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই সংকটের মূল সমাধান। এ বিষয়ে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সফরের বিভিন্ন বৈঠকেও রোহিঙ্গা সংকট, মানবিক সহায়তা, জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক শান্তির বিষয়গুলো আলোচনায় আসে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ও ওই অঞ্চলে অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর চার দিনের নিউইয়র্ক কর্মসূচিতে জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট আটটি অনুষ্ঠান, চারটি উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্ট এবং ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক ছিল।
সফর শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ছাড়েন তারেক রহমান। পরে ২৭ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন তিনি।