রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে ফ্রান্স-বাংলাদেশ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (এফবিজেএ)। একই সঙ্গে ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
সোমবার এফবিজেএর যোগাযোগ ও জনসংযোগ সেলের পক্ষে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়। বিবৃতিতে সংগঠনটির পক্ষে নিয়াজ মাহমুদ ও মোমিন আনসারি স্বাক্ষর করেন।

এফবিজেএর বিবৃতি অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত হামলায় অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চারজন ক্যাম্পাস সাংবাদিক রয়েছেন। তাঁরা হলেন—আগামীর সময়-এর জাহিদুল ইসলাম, দ্য ডেইলি স্টারের নুর আহসান মৃধুল, bdnews24.com-এর আরিফুজ্জামান কোরবান এবং সমকালের মাইনুল ইসলাম রাজু।
সংগঠনটির দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের বাইরে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রতিবেদন ও ভিডিও ফুটেজের বরাত দিয়ে এফবিজেএ বলেছে, পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগটি গুরুতরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
এফবিজেএ বলেছে, সাংবাদিকদের কাজ হলো ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং তা জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা। পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা কিংবা তাঁদের ওপর হামলার ঘটনা শুধু সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলে না; এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকারকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সংগঠনটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওসহ সংশ্লিষ্ট সব ধরনের আলামত সংরক্ষণেরও দাবি জানিয়েছে তারা।
পাশাপাশি হামলায় কারা জড়িত ছিল, ঘটনার সময় তাঁদের ভূমিকা কী ছিল এবং হামলার পেছনে কী কারণ ছিল—এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করার আহ্বান জানিয়েছে এফবিজেএ। তদন্তে দায়ীদের শনাক্ত করা গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিবৃতিতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল (জেসিডি) এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বের প্রতিও সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতার অভিযোগের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনায় যাঁরা দায়ী, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় বা সাংগঠনিক অবস্থান বিবেচনা না করে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে এফবিজেএ।
এফবিজেএর বিবৃতিতে অতীতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের যে অভিযোগ ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি যেন ছাত্রদলের ব্যানারে না ঘটে—সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নেতৃত্বের দায়িত্বের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সংগঠনটি বলেছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো সহিংসতা বা ভয়ভীতির সংস্কৃতির পরিবর্তে নতুন কোনো ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা কাম্য নয়। রাজনৈতিক পরিচয়, সাংগঠনিক সংশ্লিষ্টতা কিংবা ক্ষমতার প্রভাব যেন কোনো ব্যক্তিকে আইনি ও সাংগঠনিক জবাবদিহি থেকে রক্ষা করতে না পারে—এমন অবস্থানের কথা জানিয়েছে তারা।
এফবিজেএ আরও বলেছে, জনস্বার্থে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিককে হামলা, হুমকি, হয়রানি কিংবা প্রতিশোধের শিকার হতে হওয়া উচিত নয়। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহের পরিবেশ তৈরি করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠনগুলোর দায়িত্ব।
সংগঠনটির মতে, একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষা ও গবেষণার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি মুক্ত চিন্তা, মতপ্রকাশ এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহেরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সেখানে সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠা তাই কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঘটনার সত্যতা, দায়ীদের ভূমিকা এবং হামলার কারণ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
এফবিজেএ বলেছে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় তারা ভবিষ্যতেও সোচ্চার থাকবে। একই সঙ্গে হামলার ঘটনায় আহত সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের যথাযথ চিকিৎসা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
তবে হামলার ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। এফবিজেএর বিবৃতিতে উত্থাপিত অভিযোগগুলোরও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।