মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো এর কোনো স্পষ্ট সমাপ্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে পারছে না; বরং এটি ক্রমেই জটিল কৌশলগত লড়াইয়ে রূপ নিচ্ছে।
স্টিফেন কলিনসন তার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ইরানের তুলনায় অনেক বেশি হলেও বাস্তবে এই সংঘাত এখন “কৌশলগত চাপ” বা লিভারেজের যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। এখানে শক্তির চেয়ে কৌশলই বড় ভূমিকা রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের উন্নত সামরিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতা যুক্ত থাকলেও ইরান সরাসরি শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে Strait of Hormuz নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল পরিবহন হয়, ফলে এটি সীমিত করেই ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র চাইলে সামরিকভাবে এই পথ পুনরায় খুলে দিতে পারে। তবে এতে সরাসরি সংঘর্ষের ঝুঁকি রয়েছে। যদি মার্কিন নৌবাহিনীকে এই পথে প্রবেশ করতে হয় বা স্থলবাহিনী মোতায়েন করতে হয়, তাহলে প্রাণহানির আশঙ্কা বাড়বে, যা অভ্যন্তরীণভাবে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর।
এছাড়া খার্গ দ্বীপ দখল বা ইরানের তেল অবকাঠামোতে হামলার মতো কৌশল নিয়েও আলোচনা চলছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে। ইরানের পাল্টা হামলা, উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বিপর্যয়ের ঝুঁকি রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে।
কূটনৈতিক দিক থেকেও পরিস্থিতি খুব একটা ইতিবাচক নয়। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরান সীমিতভাবে কিছু তেলবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। তবে যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন শতাধিক ট্যাংকার চলাচল করত, সেখানে এই সংখ্যা খুবই কম। ফলে এটি বড় কোনো কূটনৈতিক সাফল্য নয়, বরং সীমিত অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান সামরিকভাবে দুর্বল হলেও সময়কে নিজের পক্ষে ব্যবহার করছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। অল্প কিছু হামলার মাধ্যমেই ইরান বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি তৈরি করতে পারছে, যা তাকে কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখছে।
সবশেষে বিশ্লেষকদের মত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েরই নিজস্ব কৌশলগত শক্তি রয়েছে। তবে এই শক্তিকে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই নির্ধারণ করবে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ। যদি দ্রুত কোনো কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তাহলে এই সংঘাত আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মানবিক পরিস্থিতির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: CNN বিশ্লেষণ প্রতিবেদন
