সাত নভেম্বর: আধিপত্যবিরোধী স্বকীয় বাংলাদেশের অঙ্গীকার

সাত নভেম্বর: আধিপত্যবিরোধী স্বকীয় বাংলাদেশের অঙ্গীকার

✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ একটি গুরুত্বপূর্ণ, তাৎপর্যপূর্ণ ও বহুমাত্রিক দিন। এই দিনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সিপাহী-জনতার বিপ্লবের স্মৃতি আজও বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী, গণতন্ত্রকামী, আধিপত্যবিরোধী এবং স্বাধীন রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে বিশ্বাসী মানুষের রাজনৈতিক চিন্তায় বিশেষ স্থান দখল করে আছে। বিশেষ করে যারা একদলীয় কর্তৃত্ববাদ, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি প্রভাবের বিরোধিতা করেন, তাঁদের কাছে ৭ নভেম্বর কেবল অতীতের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি জাতীয় আত্মমর্যাদা, জনগণের অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বকীয়তা নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

একটি স্বাধীন দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জনগণ এবং সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সার্বভৌমত্ব। স্বাধীনতার অর্থ শুধু একটি ভূখণ্ড, জাতীয় পতাকা কিংবা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়। প্রকৃত স্বাধীনতার অর্থ হলো নিজের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিজে নির্ধারণ করার অধিকার। কোনো রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা বিদেশি শক্তি বাংলাদেশের জনগণের সেই অধিকার নিয়ন্ত্রণ করবে, এমন বাস্তবতা একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না। এই বিবেচনায় ৭ নভেম্বরের ইতিহাস আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে; বাংলাদেশ কি সত্যিকার অর্থে জনগণের ইচ্ছায় পরিচালিত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, নাকি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর প্রভাব জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে বারবার সংকুচিত করেছে?

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। সেই মুক্তিসংগ্রামের মূল প্রেরণা ছিল রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক মর্যাদা এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিজে নির্ধারণের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনায় নানা সংকট দেখা দেয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন, প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, খাদ্যসংকট এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে। একই সঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়।

১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু হয়। পরবর্তী সময়ে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো কার্যকর করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের যুক্তি তুলে ধরা হলেও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি এবং সমালোচকদের কাছে এই ব্যবস্থা রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত করার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। একটি স্বাধীন দেশে জনগণের রাজনৈতিক মতপ্রকাশের অধিকার সীমিত হলে স্বাধীনতার মূল চেতনাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে দেশপ্রেমিক মানুষের কাছে একটি বিষয় স্পষ্ট; স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় সব সময় সতর্ক থাকতে হবে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যদিয়ে বাকশালের পতনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন আসে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়। এই পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসে সৈনিকদের একটি অংশ বিদ্রোহ করে। এই বিদ্রোহের সঙ্গে জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা এবং কর্নেল আবু তাহেরের ভূমিকা যুক্ত ছিল। বিদ্রোহের ফলে খালেদ মোশাররফের ক্ষমতার অবসান ঘটে এবং বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান তৎকালীন সেনাপ্রধান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক মেজর জবজিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন।

সৈনিকদের একটি অংশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের স্মৃতি থেকে দিনটি সিপাহী-জনতার বিপ্লব হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারার একটি বড় অংশ এই ঘটনাকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ এবং পরবর্তী সময়ে বহুদলীয় রাজনীতির বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে বিবেচনা করে। তবে ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়নের স্বার্থে এটিও স্বীকার করতে হবে যে ৭ নভেম্বরের সব অংশগ্রহণকারীর রাজনৈতিক লক্ষ্য অভিন্ন ছিল না। আবু তাহেরের বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা এবং জিয়াউর রহমানকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারার মধ্যে পার্থক্য ছিল। তাই দিনটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য বুঝতে হলে একে সৈনিক বিদ্রোহ, সামরিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক রূপান্তরের সম্মিলিত প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে।

বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ভারতের সাথে সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এই ভূমিকার পিছনে ভারতের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ছিল বলে এক ধরনের মিত বিদ‍্যমান। একই সঙ্গে স্বাধীনতার পর দুই দেশের সম্পর্কে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, সীমান্তে প্রাণহানি, বাণিজ্যিক ভারসাম্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে বিভিন্ন মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক ও আধিপত্যবিরোধী জনগণের একটি বড় প্রত্যাশা হলো, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বের অর্থ নিজের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া নয়। বন্ধুত্বের ভিত্তি হবে সমমর্যাদা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা।

বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো চুক্তি, নীতি কিংবা সিদ্ধান্তের সমালোচনা করার অধিকার এ দেশের নাগরিকদের রয়েছে। অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, সীমান্তে মানুষের নিরাপত্তা, বাণিজ্যে ভারসাম্য, জ্বালানি সহযোগিতায় স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাংলাদেশের ন্যায্য দাবি। ভারতের জনগণের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের বন্ধুত্ব এবং ভারতীয় রাষ্ট্রের কোনো নীতি বা প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার সমালোচনা দুটি পৃথক বিষয়। প্রতিবেশী দেশের জনগণের প্রতি বিদ্বেষ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতা ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত বাংলাদেশের অবস্থান। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হওয়া প্রয়োজন; বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, আনুগত্য কারও কাছে নয়; জাতীয় স্বার্থে আপস নয়, আর পারস্পরিক সম্মান ছাড়া কোনো সম্পর্ক নয়।

একইভাবে দেশের অভ্যন্তরে একদলীয় কর্তৃত্ববাদ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরোধিতা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিক রাজনৈতিক অধিকার। যখন নির্বাচনী প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়, বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়, সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তখন জনগণের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালের একদলীয় ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের বিষয়। পরবর্তী বিভিন্ন শাসনামলেও নির্বাচন, বিরোধী দলের অধিকার, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাই একদলীয় দুঃশাসনের বিরোধিতা শুধু একটি রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতার বাইরে রাখার আকাঙ্ক্ষা নয়; এর প্রকৃত অর্থ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে ভবিষ্যতে কোনো দলই রাষ্ট্রকে নিজের একচ্ছত্র সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না।

এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী দর্শন এবং জামায়াতে ইসলামীর ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার কথাও গুরুত্বপূর্ণভাবে আলোচনায় আসে। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিকাশ ঘটে এবং ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠিত হয়। বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, বহুদলীয় গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং বাংলাদেশের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় পরিচয় বিশেষ গুরুত্ব পায়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক চিন্তায় ইসলামী আদর্শ, নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার ধারণা গুরুত্বপূর্ণ।

দুটি দলের মধ্যে রাজনৈতিক সহযোগিতার ইতিহাস থাকলেও তাদের আদর্শগত অবস্থান এক নয়। বিএনপির জাতীয়তাবাদী দর্শন এবং জামায়াতের ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

স্বকীয় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অর্থ শুধু বিদেশি প্রভাব প্রতিরোধ করা নয়; এর অর্থ জনগণের রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সাংস্কৃতিক পরিচয়, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা। বাংলাদেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের মানুষ এই রাষ্ট্রের সমান নাগরিক। তাদের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার ও সাংস্কৃতিক মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জাতীয়তাবাদ কিংবা ধর্মীয় মূল্যবোধ; যে দর্শনই রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্ব পাক না কেন, তা যেন নাগরিকের সমান অধিকার ও মানবিক মর্যাদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রশাসন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচনব্যবস্থা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে আইন ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও স্বকীয়তা অপরিহার্য। কৃষককে ন্যায্য মূল্য, শ্রমিককে মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ, তরুণদের কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তাদের ন্যায্য সুযোগ এবং সাধারণ মানুষকে দ্রব্যমূল্যের চাপ থেকে স্বস্তি দেওয়ার মতো বিষয়গুলো জাতীয় স্বাধীনতার বাস্তব অর্থের সঙ্গে যুক্ত। রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হয়েও যদি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাষ্ট্র অক্ষম হয়, দুর্নীতির কারণে জনগণের সম্পদ অপচয় হয় এবং নাগরিকেরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে স্বাধীনতার সম্ভাবনা পূর্ণতা পায় না।

দেশপ্রেমিক জনগণের প্রত্যাশা কোনো ব্যক্তির ক্ষমতার প্রতিষ্ঠা নয়, কোনো রাজনৈতিক দলের নিরঙ্কুশ আধিপত্যও নয়। তাঁদের প্রত্যাশা এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে জনগণের ভোটে সরকার গঠিত হবে, সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে, বিরোধী দল স্বাধীনভাবে রাজনীতি করতে পারবে এবং সংবাদমাধ্যম সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করবে। যে গণতন্ত্রের জন্য মানুষ সংগ্রাম করে, ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই গণতন্ত্র রক্ষা করাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

সাত নভেম্বর ১৯৭৫ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ। জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারার কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। একই সঙ্গে এটি সামরিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, সৈনিক বিদ্রোহ এবং স্বাধীনতাপরবর্তী রাষ্ট্রীয় সংকটের ইতিহাসেরও অংশ। এই দিনকে কেন্দ্র করে দেশপ্রেমিক ও আধিপত্যবিরোধী জনগণের আকাঙ্ক্ষা বিশ্লেষণ করতে গেলে দুটি মৌলিক দাবি সামনে আসে; বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে জাতীয় সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা এবং দেশের অভ্যন্তরে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। এই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে এ দেশের মানুষের রক্ত, ত্যাগ ও সংগ্রামের বিনিময়ে। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারও বাংলাদেশের জনগণের। ভারতসহ বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। দেশের অভ্যন্তরে কোনো দল যেন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে, সেই নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সাত নভেম্বরের ইতিহাসের প্রাসঙ্গিক শিক্ষা তাই কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অন্ধ বিদ্বেষ কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়। এর শিক্ষা হলো, বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ নেবে, রাষ্ট্রের মালিক থাকবে জনগণ, আর ক্ষমতার বৈধতা নির্ধারিত হবে গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও আইনের শাসনের মাধ্যমে।

আমাদের প্রত্যাশা; বাংলাদেশ হবে আধিপত্যমুক্ত, কর্তৃত্ববাদমুক্ত, গণতান্ত্রিক, স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র। যেখানে কোনো বিদেশি শক্তির প্রভাব নয়, কোনো দলের একচ্ছত্র আধিপত্য নয়; বরং জনগণের ইচ্ছা, জাতীয় স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদাই হবে সর্বোচ্চ বিবেচ্য। দল নয়, গোষ্ঠী নয়, সর্বাগ্রে বাংলাদেশ।

লেখক:
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
[email protected]

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন একজন ফ্রান্স প্রবাসী সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও সমাজ বিশ্লেষক। তিনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনযাত্রা, সামাজিক উন্নয়ন, সমসাময়িক রাজনীতি এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সংবাদ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।