অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি থেকে প্রতিদিনের রান্না করা খাবারে মিশতে পারে বিষাক্ত ধাতু সিসা। বিশেষ করে নতুন হাঁড়ি প্রথম কয়েকবার ব্যবহারের সময় খাবারে বেশি সিসা মিশতে পারে। এই বিষাক্ত ধাতু শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ও শেখার ক্ষমতায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে। এই ঝুঁকি কমাতে নিরাপদ রান্নার পাত্র তৈরি এবং ব্যবহারে সচেতনতা জরুরি। স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে এমন তথ্য পেয়েছেন আইসিডিডিআর,বি ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা।
তারমানে রান্নার পাত্র হিসেবে অ্যালুমিনিয়াম স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বা ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র থেকে রান্না করা খাবারে কতটা সিসা মিশতে পারে, তা পরীক্ষা করা হয়েছে। পাশাপাশি সিসা মিশে যাওয়ার পরিমাণের সঙ্গে খাবারের অম্লতার মাত্রা (অ্যাসিডিটি), পাত্র পরিষ্কার করার পদ্ধতি এবং রান্নার ধরন কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেটিও দেখা হয়েছে।
গবেষকেরা বাংলাদেশের পরিবার থেকে সংগ্রহ করা সাতটি ব্যবহৃত পাত্র এবং বাজার থেকে কেনা ২০টি নতুন পাত্র পরীক্ষা করেন। প্রথমে পাত্রগুলোর ধাতুতে সিসার উপস্থিতি ও পরিমাণ পরীক্ষা করা হয়। এরপর পাত্রগুলোতে ভাত ও খিচুড়ি রান্না করা হয়। সবশেষে পরীক্ষাগারে বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে পানি ও রান্না করা খাবারে সিসার পরিমাণ মাপা হয়।
গবেষণাটি নেচার-এর জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজিতে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যালুমিনিয়ামের নতুন হাঁড়িতে প্রথমবার রান্নার সময় প্রতি কেজি সাদা ভাতে সর্বোচ্চ ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া যায়। আর খিচুড়িতে পাওয়া গেছে সর্বোচ্চ ৪২০ মাইক্রোগ্রাম সিসা, যা গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।
আন্তর্জাতিক উদারাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এ তথ্য জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে এই গবেষণা চালিয়েছে তারা।

আইসিসিডিআর,বির এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ওয়াশের অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ড. জেসমিন সুলতানা বলেন, ‘ছোট শিশুদের খাবার তৈরির জন্য নিরাপদ রান্নার পাত্র ব্যবহার করা উচিত।’
তাহলে স্টিল, কাস্ট আয়রন, মাটির হাঁড়ি… কোনটা আসলে ভালো? আর সব পরিবারের পক্ষে কি এসব কেনা সম্ভব? আপনাদের বাসায় কোন পাতিলে রান্না হয়? আর সুযোগ থাকলে কোনটা বেছে নিতেন? সবচেয়ে নিরাপদ ও দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য সেরা কোনটি জেনে নিন-
• স্টেইনলেস স্টিল (Stainless Steel):
রান্নার জন্য এটি সবচেয়ে নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর এবং আধুনিক মাধ্যম। এটি খাবারের সাথে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া করে না, ফলে খাবারের স্বাদ বা পুষ্টিগুণ অটুট থাকে। এতে কোনো ক্ষতিকর উপাদান খাবারে মেশার ভয় নেই এবং এটি পরিষ্কার করাও খুব সহজ। তবে কেনার সময় ভারী বা 'Tri-Ply' (তিন স্তরবিশিষ্ট) স্টেইনলেস স্টিল কেনা উচিত, যাতে নিচে খাবার পুড়ে না যায়।
• লোহা বা কাস্ট আয়রন (Iron / Cast Iron):
এটি রান্নার জন্য অত্যন্ত চমৎকার এবং ঐতিহ্যবাহী বিকল্প। লোহার পাত্রে রান্না করলে খাবারে প্রাকৃতিকভাবে কিছুটা আয়রন বা লোহা মেশে, যা শরীরের রক্তশূন্যতা দূর করতে সাহায্য করে। এটি গরম হতে কিছুটা সময় নেয়, কিন্তু তাপ অনেক সময় ধরে ধরে রাখতে পারে। তবে টক বা অ্যাসিডিক খাবার (যেমন—টমেটো, লেবু বা তেঁতুলের টক) লোহার পাত্রে বেশিক্ষণ রান্না বা রাখা উচিত নয়, এতে খাবারের রঙ কালো ও স্বাদ ধাতব হয়ে যেতে পারে। এছাড়া এটি ধোয়ার পর তেল মাখিয়ে রাখতে হয়, না হলে মরচে পড়ে যায়।
সতর্কতার সাথে ব্যবহারের জন্য (ঐতিহ্যবাহী পাত্র)
• কাঁসা (Bell Metal / Bronze):
কাঁসা হলো তামা (Copper) এবং টিনের (Tin) একটি মিশ্র ধাতু। প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের দেশে কাঁসার থালা-বাসনে খাওয়ার চল আছে। কাঁসার পাত্রে খাবার খাওয়া বা শুকনো খাবার রাখা স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ভালো। তবে কাঁসার পাত্রে রান্না করা বা টক জাতীয় খাবার রাখা একদম উচিত নয়। টক বা অম্লীয় উপাদান কাঁসার সাথে বিক্রিয়া করে বিষাক্ত যৌগ তৈরি করতে পারে।
• পিতল (Brass):
পিতল হলো তামা (Copper) ও দস্তার (Zinc) মিশ্রণ। পিতলের পাত্রে রান্না করলে খাবারের পুষ্টিগুণ অনেকটা বজায় থাকে। তবে পিতলের পাত্রে রান্না করার আগে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে পাত্রের ভেতরের দিকে রাং বা টিনের প্রলেপ (যেটিকে 'কলই' বা 'Tin lining' বলা হয়) দেওয়া আছে কি না। প্রলেপ ছাড়া পিতলের পাত্রে টক বা ঝাল খাবার রান্না করলে তা বিষাক্ত হয়ে যেতে পারে। কলই করা পিতলের পাত্রে রান্না করা নিরাপদ।
যা একদমই বাদ দেওয়া উচিত
• দস্তা (Zinc): রান্নার পাত্র হিসেবে দস্তার পাত্র বা জিংক কোটেড (Galvanized) পাত্র সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া উচিত। দস্তা খুব দ্রুত খাবারের অ্যাসিড বা টকের সাথে বিক্রিয়া করে খাবারে মিশে যায়। শরীরে অতিরিক্ত দস্তা প্রবেশ করলে বমি বমি ভাব, পেটে ব্যথা এবং লিভার-কিডনির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
পরামর্শ :
দৈনন্দিন সব ধরণের রান্নার (ঝোল, ভাজি, টক) জন্য স্টেইনলেস স্টিল ব্যবহার করতে পারেন।
আর ভারী রান্না, মাংস কষানো বা ভাজাভাজির জন্য লোহার কড়াই ব্যবহার করতে পারেন। এই দুটি ধাতুর কম্বিনেশন আপনার রান্নাঘরকে সবচেয়ে নিরাপদ রাখবে।





