জীবনের সব কটা বসন্ত বসের প্রশংসা করতে করতে কেটে গেল। কোনটা সত্যিকারের প্রশংসা আর কোনটা মিথ্যা প্রশংসা, তার পার্থক্য হয়তো অন্য কেউ বুঝতে পারে। কিন্তু প্রশংসার এ ঝুলি আমার কাছে সমান।
বস হাঁ করলে বুঝে ফেলি, বসের কী দরকার!
এত গভীর মনোযোগ দিয়ে বসের ফোনকল শুনি, মিটিং-কনফারেন্স সামলাই। এসব করে শুধু একটি ফায়দা পাকাপোক্ত করেছি। সেটা হলো, চাকরি।
যখন নতুন শরীরে গরম রক্ত নিয়ে বিভিন্ন কোম্পানিতে ডিগবাজি খেতে খেতে কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না, তখন আমার কাছে অমাবস্যার চাঁদ হয়ে ধরা দিলেন আমাদের আনন্দদা।
তিনি বললেন, ‘চাকরি হচ্ছে ম্যানেজ করে চলার বিষয়। তুমি বাপু সৎ লোক। মুখের ওপর সত্য কথা বললে তোমার চাকরি থাকবে না। এ জন্যই তো তোমার এত বদলি! খাগড়াছড়ি, বান্দরবান—ওদিকে কি চাকরির সুবাদে যাওয়া হয়েছে?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’
আনন্দদা বললেন, ‘বস ইজ অলওয়েজ রাইট! বস যা বলবেন, সেটাই সঠিক; একেবারে নির্ভেজাল। তিনি যে পরিকল্পনা দেবেন, সেটাই সবচেয়ে সুন্দর পরিকল্পনা। এর চেয়ে ভালো পরিকল্পনা আর হয় না। বসের বক্তব্যের সময় জোরে জোরে হাততালি দিয়ে তাঁকে উৎসাহিত করতেই হবে। মাঝেমধ্যে চিৎকার করে বসের প্রশংসা করতে হবে। বলতে হবে, আমার বস অমুক বসের চেয়ে সেরা! আমার বসের হেয়ারস্টাইল ঝাক্কাস! আর বসের সুন্দরী বউটাও সেই!’
আমি বললাম, ‘এত প্রশংসা করে মানুষ কীভাবে চাকরি করে?’
আনন্দদা বললেন, আস্তে! এখন এসবই চলছে। বসের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো থাকলে চারদিক থেকে লাভ।’
আমি বললাম, ‘একটু খুলে বলো, আনন্দদা।’
আনন্দদা একটু মুখ ভেংচিয়ে বললেন, ‘তুমি তো কচি খোকা; কিছুই বোঝ না! যেমন ধরো, তোমার মাসিক টার্গেট, তোমার অ্যাসাইনমেন্ট, তোমার কমিশন, তোমার পারফরম্যান্স—সবকিছুই তোমার বসের ওপর নির্ভর করে। আমার বস আমাকে অন্যদের তুলনায় কম টার্গেট দেন। তাই আমি অনায়াসেই তা পূরণ করতে পারি; বুঝলে? বসেরও আবার প্রকারভেদ আছে। সেলস ও মার্কেটিংয়ে একটু বেশি তেল মাপতে হয়। আমার কথায় রাগ কোরো না।’
আনন্দদা একটু থেমে আবার বললেন, ‘আমার কথার বিরোধিতা করবে, এমন লোককে আমি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারব। একেবারে সত্য কথা বলছি! মাঝেমধ্যে বসকে টাকা ধার দেবে, চায়ের দাওয়াত দেবে, দুই–তিন মাস পরপর বুফেতে খাওয়াবে। পারফিউম ও সুগন্ধি উপহার দেবে। তাহলে দেখবে, তরতর করে পদোন্নতি হবে। বার্ষিক ইনক্রিমেন্টও হবে সবার চেয়ে বেশি। গত বছর আমার বস বেতন চার হাজার টাকা বাড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদের বাড়িয়েছেন আমার চেয়ে অনেক কম। এবার বুঝতে পেরেছ?’
আগে বসের মন বোঝার কৌশল আয়ত্ত করো। তা না হলে ঘোর বিপদে পড়বে। কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাবে না।
আনন্দদার কথা শুনে আমি থ মেরে রইলাম। কোনো কথা বলতে পারছি না। তাহলে কি আমার অতীতের আট–নয়টি চাকরি ছাড়ার পেছনে বসের কোনো হাত ছিল?
কিন্তু আমার পারফরম্যান্স তো ভালো। ট্রেড সম্পর্ক ভালো; বিক্রয় সম্পর্কও মজবুত। তাহলে কোন জায়গায় আমার দুর্বলতা? শারীরিক দুর্বলতা তো আমার নেই!
আমাকে বসের মতো হারবাল ওষুধ খেতে হয় না। তবু বসের গ্যাঁড়াকলে পড়ে আমার বারোটা বেজেছে বেশ কয়েকবার।
তাই এবার সতর্কতার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে হবে ঐশ্বরিক এক তেল মাপার কাজে!
বসের মন জয় করতে হবে। বস কিছু বললে তাঁর প্রশংসা করতে হবে। কোনো পরিকল্পনা করলে সাধুবাদ জানাতে হবে। কোনো বক্তৃতার অনুষ্ঠানে গেলে হাততালি দিতে দিতে হাত ব্যথা করে ফেলতে হবে। দিনে পাঁচ-ছয়বার ‘জি, বস! জি, বস!’ বলে চিৎকার করে গলা ফাটাতে হবে।
তা না হলে পদোন্নতি ও চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে।
বাৎসরিক ছুটি, ঘন ঘন ছুটি, বউকে নিয়ে পার্কে যাওয়ার ছুটি, অন্যের বউয়ের খোঁজখবর নেওয়ার ছুটি—সবকিছুই ম্যানেজ হয়ে যাবে!
আনন্দদা বললেন, ‘আগে বসের মন বোঝার কৌশল আয়ত্ত করো। তা না হলে ঘোর বিপদে পড়বে। কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাবে না।’
কথাটা বলেই আনন্দদা একটি গান ধরলেন, ‘আমার একটা নদী ছিল, জানল না তো কেউ….।’
আনন্দদার গলা বিচ্ছিরি হলেও দুই হাতে বেশ কামিয়েছেন। কারণে-অকারণে ছুটি নিয়েছেন নানা অজুহাতে। নির্ভয়ে বসে বসে বছরের বেশ কয়েকটি দিন কাটিয়েছেন। তারপরও তাঁর চাকরি পাকাপোক্ত!
তাই শেষ পর্যন্ত আমিও ভাবছি, কী আর করা! বস ইজ অলওয়েজ রাইট! মেনে শিথিল হাওয়া অতি উত্তম। তাই তো আনন্দদার বসের মন জয় করার কৌশল আয়ত্ত করছি।
সূত্র: প্রথম আলো





