ছয় মাসের গর্ববতী নারী নিয়ে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার বেসরকারি হাসপাতাল সাউন্ড হেলথ (পুরতন ভবন) চিকিৎসক ডাঃ মিতালি কর্মকারের কাছে যান সালমা আক্তার নামের এক গর্ববতী নারী।চিকিৎসক বলেন, তার রক্তশূন্যতা রয়েছে দুই ব্যাগ রক্ত দিতে হবে।পরে ডাক্তারের পরামর্শে সেই হাসপাতালেই করানো হয় রক্তের গ্রুপ নির্ণয়। পরীক্ষার ফলাফল আসে “এবি পজেটিভ” ।
সেই অনুযায়ী রক্তদাতা সংগ্রহ করে পার্শ্ববর্তী আরেকটি হাসপাতালে আবারো রক্ত পরীক্ষা করতে গেলেই বাদে বিপত্তি। সেই হাসপাতালে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে দেখা যায় “এবি পজেটিভ” নয় বরং ” রক্তের গ্রুপ
“ও পজেটিভ”।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সকালে লোহাগাড়ার কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীদের ভুল রিপোর্টের বিষয়টি জানান ভুক্তভোগী সালমা আক্তার।
ছালাম আক্তার (৩৫), সাতকানিয়া উপজেলার গারাঙ্গীয়া , আলুর ঘাট এলাকার, বদিউর রহমান সিকদার প্রকাশ বদ সিকদার পাড়ার নজরুল ইসলামের স্ত্রী।
ভুক্তভোগী সালমা আক্তার জানান, আমি গর্ভবতী হবার পর থেকেই লোহাগাড়া উপজেলার বেসরকারি হাসপাতাল সাউন্ড হেল্থ হাসপাতালের গাইনি চিকিৎসক ডাঃ মিতালি কর্মকার থেকে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করে আসছি। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৭ মার্চ ডাক্তার আমার শরীরে রক্ত শুন্যতা রয়েছে এবং শরীরে রক্ত দিতে হবে বলে জানান, রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করার জন্য বলেন। সথে সাথে সাউন্ড হেল্থ হাসপাতালের ল্যাবে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করার জন্য রক্ত দিয়ে অপেক্ষা করি। পরক্ষণেই লোহাগাড়া সাউন্ড হেল্থ হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ল্যাব টেকনোলজিষ্ট জেহেরান হোসাইন স্বাক্ষরিত “এবি পজেটিভ” (AB/ positive) একটি রিপোর্ট দেন। এই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে লোহাগাড়া রক্তদান গ্রুপের একজন ব্লাড ডোনার সঙ্গে নিয়ে উপজেলার লোহাগাড়া সিটি হাসপাতাল লিঃ এ রক্ত দিতে গেলে সেখানে বাঁধে বিপত্তি। সাথে সাথেই লোহাগাড়া সিটি হাসপাতাল লিঃ এ রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করলে রিপোর্ট আসে “ও পজেটিভ” । এখানেই শেষ নয়, আরো নিশ্চিত হবার জন্য পার্শ্ববর্তী লোহাগাড়া মা শিশু হাসপাতালেও রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করি, সেখানেও “ও পজেটিভ” সনাক্ত হয়। ২ এপ্রিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে পুনরায় রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করলে “ও পজেটিভ” সনাক্ত হয়। তখন শতভাগ নিশ্চিত হলাম লোহাগাড়া সাউন্ড হেল্থ হাসপাতালের রিপোর্ট ভুল। এরকম নামিদামি হাসপাতালে ভুল করলে এর দায়ভার কে নেবে? আমি সচেতন না হলে আমার বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতো।ভুক্তভোগী সালমা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
লোহাগাড়া রক্তদান গ্রুপের মডারেটর মোঃ ইয়াছিন জানান, লোহাগাড়ায় অনেক অসহায় মানুষকে বিভিন্ন গ্রুপের রক্তের ব্যবস্থা করে দিয়েছি কিন্তু এধরনের ভুল অর দেখিনি। সালমার রিপোর্ট অনুযায়ী “এবি পজেটিভ” ডোনার দিয়েছি । পরে জানলাম সালমার রক্তের গ্রুপ “ও পজিটিভ”। এধরনের ভুল হলে রোগীর অনেক বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে লোহাগাড়া সাউন্ড হেল্থ হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ল্যাব টেকনোলজিষ্ট জেহেরান হোসাইন জানান, আমাদের ল্যাবে যে রি-এজেন্ট দিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা করা হতো হয়তো সেই রি-এজেন্টের কোন সমস্যা রয়েছে।মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও কেন ভুল রিপোর্ট আসলো সে বিষয়ে কতৃপক্ষ রি-এজেন্ট কোম্পানির সাথে কথা বলবে।
লোহাগাড়া সাউন্ড হেল্থ হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ল্যাব ডাইরেক্টর ডাঃ ইশতিয়াকুর রহমান জানান, গর্ভবতী এক নারীর রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ে ভুল রিপোর্ট আসছে সেটা আমি জেনেছি। আমাদের ল্যাবে ব্যবহৃত রি-এজেন্ট গুলো দিয়ে আপাতত পরিক্ষা করা বন্ধ করে দিয়েছি। তিনি আরো বলেন, আমরা এক মাসের জন্য একসাথে বিভিন্ন রোগ সনাক্তের টেস্টিং কিট ও রি-এজেন্ট নিয়ে থাকি, কিন্তু ১৭ তারিখে রিপোর্টে কেন ভুল আসলো সেটা তদন্ত করে দেখছি। রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ে ভুল রিপোর্ট কেন আসলো তা দুই/তিন দিনের মধ্যে জানতে পরবো। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রি-এজেন্ট কোম্পানিকে জানানোর কথা বললেও তিনি নিজেই জানেন না কোন কম্পানির রি-এজেন্টে দিয়ে পরিক্ষা করা হয়েছে। এমনকি কখন জানিয়েছেন সেটাও জানেন না তিনি। রি-এজেন্ট কোম্পানির সাথে কে বা কখন যোগাযোগ হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।
এদিকে ল্যাব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একেকজনের কথায় একেকরকম তথ্য উঠে আসে। কেউ বলেন এ সমস্যা ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে হচ্ছে আবার কেউ বলেন ২ দিন ধরে হচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোহাম্মদ ইকবাল জানান, কেউ লিখিত অভিযোগ করলে অভিযুক্ত হাসপাতালের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাউন্ড হেল্থ হাসপাতালে “এবি পজেটিভ”এবং অন্য তিন হাসপাতালে “ও পজেটিভ” রিপোর্ট এসেছে এখানে সাউন্ড হেল্থ হাসপাতালের রিপোর্টে ভুল হয়েছে এখানে কোন সন্দেহ নেই। তদন্ত করলে বিষয়টি বেরিয়ে আসবে।
কেন রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ে ভুল রিপোর্ট দিয়েছে তা খতিয়ে দেখা হবে। ল্যাব টেকনোলজিষ্টের কাগজ পত্র যাচাই বাছাই করে দেখা হবে। রি-এজেন্ট এর কোন সমস্যা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে। যদি ল্যাব কতৃপক্ষ দোষী হয়ে থাকে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডাঃ জাহাঙ্গীর আলমের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, এটি খুবই সংবেদনশীল বিষয়। এই ভুলের কারণে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। হাসপাতালটিকে আমরা শোকজ করব প্রথমে, এরপর ল্যাব টেকনলজিষ্ট যিনি ছিলেন উনি ডিগ্রীধারী কিনা সেটাও খতিয়ে দেখব এবং তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
