আজ রোববার সকালে ইউটিউবে গানটা আবার চালিয়ে দেখছিলাম। সাদা–কালো পর্দা। চেনা সুর—‘আমি মিস ক্যালকাটা ১৯৭৬’। চোখে বড় সানগ্লাস, পরনে আধুনিক পোশাক, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি আর মুখভরা হাসি। পর্দার সেই তরুণী অপর্ণা সেন। পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়েছে, অথচ ‘মিস ক্যালকাটা’ পরিচয়টি আজও তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
অনেকে হয়তো জানি, কোনো সুন্দরী প্রতিযোগিতা থেকে নয়, বাংলা সিনেমার একটি গান থেকেই এই পরিচিতি। তবে অপর্ণার জীবন শুধু জনপ্রিয় নায়িকার গল্প নয়। সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে অভিনয়ে আসা, প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ারের মধ্যেই পরিচালনায় নামা, প্রথম সিনেমার জন্য প্রযোজক খুঁজে না পাওয়া, তারপর জাতীয় পুরস্কার জয়-তাঁর জীবনে বাঁক কম নেই। নিজের সিনেমায় যেমন নারীর স্বাধীনতা, সম্পর্কের জটিলতা আর সামাজিক নানা প্রশ্ন তুলে ধরেছেন, তেমনি ব্যক্তিজীবনের সিদ্ধান্ত নিয়েও থেকেছেন আলোচনায়। অভিনয়, পরিচালনা থেকে সাংবাদিকতা ও সম্পাদনা—কত পরিচয় তাঁর!
আজ রোববার, ২৫ অক্টোবর, অপর্ণা সেনের ৮১তম জন্মদিন। ১৯৪৫ সালের এই দিনে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছয় দশকের বেশি সময়ের চলচ্চিত্রজীবনে পেয়েছেন জনপ্রিয়তা, সম্মাননা, কখনো বিতর্কও। কিন্তু এত পরিচয়ের আড়ালে মানুষ অপর্ণা সেনকে আমরা কতটা চিনি? জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক তাঁর জীবনের কিছু গল্প।
যেভাবে ‘মিস ক্যালকাটা’
১৯৭৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পায় দীনেন গুপ্ত পরিচালিত বাংলা কমেডি সিনেমা ‘বসন্ত বিলাপ’। ছবিতে অপর্ণা সেনের সঙ্গে অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রবি ঘোষ, অনুপ কুমার, চিন্ময় রায়সহ অনেকে। একদল তরুণ ও তরুণীর খুনসুটি, দ্বন্দ্ব আর প্রেমের গল্প নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এই ছবির গান ‘আমি মিস ক্যালকাটা ১৯৭৬’ নতুন মাত্রা যোগ করে অপর্ণার জনপ্রিয়তায়। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা, সুধীন দাশগুপ্তের সুরে গানটি গেয়েছিলেন আরতি মুখোপাধ্যায়। পর্দায় অপর্ণার সাজপোশাক, সিগার হাতে অভিনয়, নাচের ভঙ্গি আর আধুনিক নারীর আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপন দর্শকদের নজর কাড়ে।

মজার ব্যাপার, সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালে, কিন্তু গানে তিনি নিজেকে পরিচয় দেন ১৯৭৬ সালের ‘মিস ক্যালকাটা’ হিসেবে। এই তিন বছরের ব্যবধানও গানটির একটি মজার দিক। গানটি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে পরবর্তী সময়েও ‘মিস ক্যালকাটা’ পরিচয়টি অপর্ণার সঙ্গে থেকে যায়। দর্শকের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন আধুনিক, স্বাধীনচেতা বাঙালি তরুণীর প্রতীক।
যে সিনেমা দেখতে বারণ ছিল, সেই সিনেমার নায়িকা
অপর্ণার বেড়ে ওঠা কলকাতার এক শিল্পমনস্ক পরিবারে। বাবা চিদানন্দ দাশগুপ্ত ছিলেন চলচ্চিত্র সমালোচক ও নির্মাতা। মা সুপ্রিয়া দাশগুপ্ত ছিলেন পোশাক পরিকল্পনাকারী। মা–বাবার সূত্রে ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য, সংগীত ও বিশ্ব চলচ্চিত্রের সঙ্গে পরিচয় তাঁর। তবে বাড়িতে জনপ্রিয় বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমা দেখার ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া হতো না। ফলে উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের জনপ্রিয় সিনেমাগুলো ছোটবেলায় নিয়মিত দেখার সুযোগ পাননি তিনি। অথচ পরবর্তী সময়ে সেই বাণিজ্যিক বাংলা সিনেমারই জনপ্রিয় নায়িকা হয়ে ওঠেন অপর্ণা। দর্শকের ভালোবাসা পান রোমান্টিক, আধুনিক ও স্বাধীনচেতা নারীর চরিত্রে অভিনয় করে। ব্যক্তিগত বেড়ে ওঠা আর পেশাগত জীবনের এই বৈপরীত্য নিয়ে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন তিনি।
‘মানিক কাকা’র হাত ধরে শুরু
অপর্ণা সেনের চলচ্চিত্রে আসার গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সত্যজিৎ রায়ের নাম। তাঁর বাবা চিদানন্দ দাশগুপ্ত ছিলেন চলচ্চিত্র সমালোচক, লেখক ও নির্মাতা। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব। কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন দুজন। সেই সুবাদে ছোটবেলা থেকেই সত্যজিৎকে চিনতেন অপর্ণা। ডাকতেন ‘মানিক কাকা’ বলে। সেই মানিক কাকার ছবিতেই প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পান তিনি।
১৯৬১ সালে মুক্তি পায় সত্যজিৎ রায়ের ‘তিন কন্যা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তিনটি গল্প অবলম্বনে নির্মিত ছবিটির ‘সমাপ্তি’ পর্বে মৃণ্ময়ীর চরিত্রে অভিনয় করেন অপর্ণা। বয়স তখন মাত্র ১৫ বছর। তাঁর বিপরীতে ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। গল্পে মৃণ্ময়ী দুরন্ত, স্বাধীনচেতা এক কিশোরী। গাছে চড়া, দৌড়ঝাঁপ আর নিজের খেয়ালখুশিমতো চলতেই ভালোবাসে সে। বিয়ে কিংবা সংসারের প্রচলিত নিয়মকানুনে তার আগ্রহ নেই। এমন একটি চরিত্রে অপর্ণার স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় নজর কাড়ে। প্রথম ছবিতেই সৌমিত্রের মতো অভিনেতার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান তিনি। পরবর্তী সময়ে বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় জুটি হয়ে ওঠেন তাঁরা।

তবে প্রথম ছবির পরই নিয়মিত অভিনয়ে নামেননি অপর্ণা। প্রায় চার বছরের বিরতি দিয়ে ১৯৬৫ সালে অভিনয় করেন মৃণাল সেনের ‘আকাশ কুসুম’ এবং নিত্যানন্দ দত্তের ‘বাক্স বদল’ ছবিতে। ‘আকাশ কুসুম’-এ তাঁর চরিত্রের নাম মনিকা। মধ্যবিত্ত এক তরুণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সামাজিক অবস্থান নিয়ে মিথ্যা পরিচয় দেওয়া এবং সেই মিথ্যার জালে জড়িয়ে পড়ার গল্প ছবিটির বিষয়। মনিকার চরিত্রে অপর্ণার অভিনয় ছিল সংযত ও স্বাভাবিক। অন্যদিকে ‘বাক্স বদল’ ছিল রোমান্টিক কমেডি। সত্যজিৎ রায়ের লেখা চিত্রনাট্যে নির্মিত ছবিটিতে আবারও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে অভিনয় করেন তিনি।
ষাটের দশকের শেষ দিকে নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন অপর্ণা। ১৯৬৯ সালে মুক্তি পায় সলিল দত্ত পরিচালিত ‘অপরিচিত’। একই বছর আন্তর্জাতিক প্রযোজনার ইংরেজি ছবি ‘দ্য গুরু’তে অভিনয় করেন তিনি। জেমস আইভরি পরিচালিত ছবিটিতে অভিনয়ের সুবাদে বাংলা চলচ্চিত্রের বাইরেও কাজের অভিজ্ঞতা হয় তাঁর। পরে একই পরিচালকের ‘বোম্বে টকি’ এবং ‘হুলাবালু ওভার জর্জি অ্যান্ড বনিস পিকচার্স’-এও অভিনয় করেন।
সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও অব্যাহত ছিল। ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ছবিতে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করেন অপর্ণা। পরে ‘জন অরণ্য’ ছবিতেও তাঁকে দেখা যায়। ১৯৮০ সালে সত্যজিতের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘পিকু’তে অভিনয় করেন তিনি। এই ছবিতে মা ও সন্তানের সম্পর্ক, দাম্পত্যের টানাপোড়েন এবং শিশুর চোখে বড়দের জটিল জগৎ উঠে আসে। ‘পিকু’তে অপর্ণার অভিনয় তাঁর পরিণত শিল্পীসত্তার আরেকটি পরিচয় দেয়।
এরই মধ্যে বাংলা বাণিজ্যিক সিনেমার জনপ্রিয় নায়িকা হয়ে উঠেছেন অপর্ণা। ১৯৭১ সালে তপন সিনহার ‘এখনই’ ছবিতে অভিনয় করেন। সমসাময়িক তরুণ প্রজন্মের জীবন, তাদের ভাবনা ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে নির্মিত ছবিটি ছিল সেই সময়ের উল্লেখযোগ্য কাজ। একই বছর মুক্তি পায় ‘এখানে পিঞ্জর’ ও ‘জয়জয়ন্তী’। পরের বছর ‘মেমসাহেব’-এ আবারও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে অভিনয় করেন তিনি। নিমাই ভট্টাচার্যের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিটি দর্শকের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।
এরপর আসে ‘বসন্ত বিলাপ’। ১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া দীনেন গুপ্ত পরিচালিত এই কমেডি ছবিতে অনুরাধা চরিত্রে অভিনয় করেন অপর্ণা। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর অভিনয় ও হাস্যরসাত্মক দৃশ্যগুলো দর্শকদের মনে জায়গা করে নেয়। এই ছবির ‘আমি মিস ক্যালকাটা ১৯৭৬’ গানটি তাঁর জনপ্রিয়তায় যোগ করে নতুন মাত্রা।
সত্তরের দশকজুড়ে একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করেছেন অপর্ণা। ‘সোনার খাঁচা’, ‘আলোর ঠিকানা’, ‘যদুবংশ’, ‘সাগিনা’, ‘কাজললতা’, ‘রাগ অনুরাগ’ ও ‘অজস্র ধন্যবাদ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে। বাংলা ছবির পাশাপাশি হিন্দি সিনেমাতেও অভিনয় করেন। ১৯৭৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ইমান ধরম’ ছবিতে অমিতাভ বচ্চন, শশী কাপুর ও সঞ্জীব কুমারের মতো তারকাদের সঙ্গে পর্দা ভাগ করেন তিনি।
শুধু নায়িকা হিসেবে জনপ্রিয়তাই নয়, চরিত্রের বৈচিত্র্যও ছিল অপর্ণার অভিনয়জীবনের বড় বৈশিষ্ট্য। কখনো রোমান্টিক নায়িকা, কখনো স্বাধীনচেতা আধুনিক তরুণী, আবার কখনো জটিল মনস্তত্ত্বের নারী—নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।

পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও অভিনয় ছাড়েননি অপর্ণা। গৌতম ঘোষের ‘এক দিন আচানক’, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘মহাপৃথিবী’, প্রভাত রায়ের ‘শ্বেত পাথরের থালা’এবং ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘উনিশে এপ্রিল’-এ অভিনয় করে আবারও নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন। বিশেষ করে ‘উনিশে এপ্রিল’ ছবিতে বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী সরোজিনীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। মায়ের পেশাগত সাফল্য আর মেয়ের মানসিক দূরত্বকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিটিতে অপর্ণার বিপরীতে মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন দেবশ্রী রায়।
পরবর্তী সময়ে ‘তিতলি’, ‘অন্তহীন’, ‘চতুষ্কোণ’ও ‘বসু পরিবার’-এর মতো ছবিতেও অভিনয় করেছেন তিনি। ফলে শুধু ষাট কিংবা সত্তরের দশকের জনপ্রিয় নায়িকা হিসেবেই আটকে থাকেননি অপর্ণা। বয়সের সঙ্গে বদলেছে চরিত্র, অভিনয়ের ধরনও। একদিকে নিজের পরিচালিত সিনেমায় স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র ভাষা তৈরি করেছেন, অন্যদিকে অন্য নির্মাতাদের ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ধরে রেখেছেন পর্দার সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক।
কেউ টাকা দিতে চাননি
অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও একসময় অভিনয়জীবন নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েন অপর্ণা। অনেক ছবির গল্প ও চরিত্রের সঙ্গে নিজের ভাবনার মিল খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তখনই নিজে চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা ভাবতে শুরু করেন। লেখেন ‘৩৬ চৌরঙ্গি লেন’-এর চিত্রনাট্য। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় অর্থায়ন নিয়ে। ইংরেজি ভাষায় নির্মিত একটি ভারতীয় সিনেমার জন্য অর্থ বিনিয়োগ করতে প্রযোজকদের আগ্রহ ছিল কম। পরিচিত অনেকে তাঁকে চিত্রনাট্যটি সরিয়ে রাখার পরামর্শ দেন।
সেই সময় আবারও তাঁর পাশে দাঁড়ান সত্যজিৎ রায়। এক সাক্ষাৎকারে অপর্ণা স্মরণ করেছেন, চিত্রনাট্যটি সত্যজিৎ রায়কে পড়তে দিয়েছিলেন তিনি। সত্যজিৎ গল্পটি পছন্দ করেন। শুধু তা-ই নয়, ইংরেজি ভাষায় সিনেমাটি নির্মাণের ব্যাপারেও তাঁকে উৎসাহ দেন। পরামর্শ দেন অভিনেতা ও প্রযোজক শশী কাপুরের সঙ্গে যোগাযোগ করার। অপর্ণা মুম্বাইয়ে গিয়ে শশী কাপুর, তাঁর স্ত্রী জেনিফার কেন্ডাল ও চিত্রগ্রাহক গোবিন্দ নিহালানির সামনে চিত্রনাট্য পড়ে শোনান। গল্প শুনেই বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত প্রযোজনায় সম্মত হন শশী কাপুর। অপর্ণার স্মৃতিতে সেই মুহূর্ত আজও উজ্জ্বল। চুক্তিপত্র হাতে কলকাতায় ফেরার সময় তিনি বারবার সেটি দেখছিলেন। বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, সত্যিই নিজের প্রথম সিনেমা পরিচালনা করতে যাচ্ছেন।

এক নিঃসঙ্গ শিক্ষিকার গল্পে জাতীয় পুরস্কার
১৯৮১ সালে মুক্তি পায় অপর্ণা সেনের প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘৩৬ চৌরঙ্গি লেন’। কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন জেনিফার কেন্ডাল। ছবির গল্প কলকাতায় একা বসবাসকারী বয়স্ক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান শিক্ষিকা ভায়োলেট স্টোনহ্যামকে নিয়ে। একাকিত্ব, ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা এবং মানুষের সম্পর্কের স্বার্থপরতা উঠে আসে ছবিতে। এই গল্পের পেছনে ছিল অপর্ণার ছোটবেলার অভিজ্ঞতা। স্কুলে পড়ার সময় তিনি কয়েকজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান শিক্ষিকাকে দেখেছেন, যাঁদের আত্মীয়স্বজনের অনেকেই ভারত ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তাঁদের নিঃসঙ্গ জীবন অপর্ণাকে ভাবাত। বিশেষ করে স্টোনহ্যাম নামের এক শিক্ষিকার কথা তাঁর মনে গেঁথে ছিল। সেই শিক্ষিকার নাম থেকেই ছবির প্রধান চরিত্রের নাম রাখেন ভায়োলেট স্টোনহ্যাম।
‘৩৬ চৌরঙ্গি লেন’ সমালোচকদের প্রশংসা পায়। প্রথম সিনেমার জন্যই সেরা পরিচালকের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান অপর্ণা। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও স্বীকৃতি পায় ছবিটি। জনপ্রিয় নায়িকা থেকে পরিচালক-অপর্ণার জীবনে শুরু হয় নতুন অধ্যায়।

‘পরমা’ নিয়ে কেন এত বিতর্ক
অপর্ণা সেনের নির্মিত সিনেমায় নারীর আত্মপরিচয়, স্বাধীনতা, সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বারবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ১৯৮৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘পরমা’ ছবিটি তার অন্যতম উদাহরণ। ছবিতে রাখি গুলজার অভিনয় করেন এক বিবাহিত নারীর চরিত্রে। সংসার, সন্তান ও পারিবারিক দায়িত্বের বাইরে নিজের পরিচয় খুঁজতে চান তিনি। এক তরুণ আলোকচিত্রীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার পর তাঁর জীবনে তৈরি হয় সংকট।
মুক্তির পর ছবিটি নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়। অনেক দর্শক পরমার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু অপর্ণার দৃষ্টিতে বিষয়টি ছিল নারীর নিজের জীবন ও শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতার প্রশ্ন। পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে অপর্ণা বলেছিলেন, দর্শকদের অনেকে পরমাকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানো নারী হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু তিনি চরিত্রটিকে দেখেছেন নিজের যৌনজীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া একজন মানুষ হিসেবে। সেই সময়ের বাংলা সিনেমায় এমন চরিত্র উপস্থাপন ছিল সাহসী পদক্ষেপ। ‘পরমা’র পর ‘সতী’, ‘যুগান্ত’, ‘পারমিতার এক দিন’, ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’, ‘১৫ পার্ক অ্যাভিনিউ’ এবং ‘দ্য জাপানিজ ওয়াইফ’-এর মতো সিনেমায় সমাজ, সম্পর্ক, নিঃসঙ্গতা ও মানুষের মনস্তত্ত্বকে ভিন্নভাবে তুলে ধরেছেন অপর্ণা।
মেয়ে তাঁর সিনেমার নায়িকা
অপর্ণা সেনের মেয়ে কঙ্কনা সেনশর্মাও অভিনেত্রী ও পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মা-মেয়ের সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিজীবনে নয়, চলচ্চিত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঋতুপর্ণ ঘোষ পরিচালিত ‘তিতলি’ ছবিতে একসঙ্গে অভিনয় করেন অপর্ণা ও কঙ্কনা। আবার অপর্ণার পরিচালনায় ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’ ছবিতে অভিনয় করেন কঙ্কনা। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার পটভূমিতে নির্মিত ছবিটিতে কঙ্কনার অভিনয় ব্যাপক প্রশংসিত হয়। সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পান তিনি। একই ছবির জন্য সেরা পরিচালকের জাতীয় পুরস্কার পান অপর্ণা। পরবর্তী সময়ে ‘১৫ পার্ক অ্যাভিনিউ’, ‘ইতি মৃণালিনী’ ও ‘গয়নার বাক্স’-এর মতো ছবিতেও একসঙ্গে কাজ করেছেন তাঁরা।
সম্পর্ক নিয়ে নিজের ভাবনা
পর্দায় স্বাধীনচেতা নারীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন, নিজের সিনেমাতেও তুলে ধরেছেন নারীর আত্মপরিচয় ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন। ব্যক্তিজীবনেও প্রচলিত সামাজিক ধারণার বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অপর্ণা সেন। জীবনে তিনবার বিয়ে করেছেন তিনি। প্রথম স্বামী ছিলেন বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাতা সঞ্জয় সেন। তাদের ছাড়াছাড়ি হয়। দ্বিতীয় বিয়ে করেন লেখক ও বিজ্ঞানবিষয়ক সাংবাদিক মুকুল শর্মাকে। এই সম্পর্কও স্থায়ী হয়নি। পরে লেখক ও অধ্যাপক কল্যাণ রায়কে বিয়ে করেন অপর্ণা। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা একসঙ্গে রয়েছেন। তবে কাজের প্রয়োজনে কখনো ভিন্ন দেশেও থেকেছেন।
একাধিক বিয়ে নিয়ে সামাজিক সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে তাঁকে। এক সাক্ষাৎকারে অপর্ণা স্বীকার করেছেন, প্রচলিত নিয়মের বাইরে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তাঁকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে তাঁর বক্তব্য, তিনি কারও সংসার ভেঙে নিজের জীবন গড়েননি। সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানসিক মিলকে গুরুত্ব দেন তিনি। কল্যাণ রায়ের সঙ্গে দীর্ঘ দাম্পত্যের প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, দুজনের মূল্যবোধ, সাহিত্য ও শিল্পের প্রতি অনুরাগ এবং জীবনবোধের মিলই তাঁদের সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি।
অপর্ণার দুই মেয়ে-কমলিনী ও কঙ্কনা। বড় মেয়ে কমলিনী প্রচারের আড়ালে নিজের জীবন গড়েছেন। ছোট মেয়ে কঙ্কনা সেনশর্মা ভারতের প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রী ও পরিচালক। দুই মেয়েকে বড় করার ক্ষেত্রেও স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন অপর্ণা। সন্তানদের কখনো নিজের মতো হতে বলেননি; বরং নিজের ভুলগুলো থেকেও শিক্ষা নিতে বলেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি আক্ষেপ করেছিলেন, জীবনের আবেগময় দিকগুলোকে কিছুটা কম প্রাধান্য দিলে হয়তো আরও বেশি সিনেমা নির্মাণ করতে পারতেন। তবে ব্যক্তিজীবনের নানা উত্থান-পতনের মধ্যেও দুই মেয়ের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অটুট রয়েছে।

সাংবাদিকতা ও সম্পাদনায়
অভিনেত্রী ও পরিচালক পরিচয়ের বাইরেও অপর্ণা সেনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় সম্পাদক ও সাংবাদিক হিসেবে । ১৯৮৬ সালে আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠী নারীদের জন্য পাক্ষিক পত্রিকা ‘সানন্দা’ প্রকাশের উদ্যোগ নিলে সম্পাদনার দায়িত্ব পান তিনি । মজার বিষয়, এর আগে কোনো পত্রিকা সম্পাদনার অভিজ্ঞতা ছিল না তাঁর। শুরুতে দায়িত্ব নিতে দ্বিধায় ছিলেন। কিন্তু তাঁকে বোঝানো হয়েছিল, প্রথম সিনেমা পরিচালনার আগেও তো তাঁর পরিচালনার অভিজ্ঞতা ছিল না। শেষ পর্যন্ত রাজি হন অপর্ণা। ১৯৮৬ সালের ৩১ জুলাই প্রকাশিত হয় ‘সানন্দা’র প্রথম সংখ্যা । প্রায় ১৯ বছর পত্রিকাটির সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০৫ সালে দায়িত্ব ছাড়েন।
অপর্ণার সম্পাদনায় ‘সানন্দা’ শুধু সাজপোশাক, রূপচর্চা কিংবা রান্নার পত্রিকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি । সেখানে গুরুত্ব পেয়েছে নারী অধিকার, পরিবেশ, স্বাস্থ্য, সাহিত্য ও সামাজিক নানা প্রশ্ন। গৃহিণীদের কাজের আর্থিক স্বীকৃতি থাকা উচিত কি না, নারীর আইনগত অধিকার কিংবা নর্মদা নদীকে ঘিরে আন্দোলনের মতো বিষয়ও উঠে এসেছে পত্রিকাটিতে। নিয়মিত সম্পাদকীয় লিখতেন অপর্ণা। লেখার পাশাপাশি প্রতিটি সংখ্যার বিষয়বস্তু ও ছবির পাতা নিয়েও কাজ করতেন। এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, চলচ্চিত্রকে সরাসরি মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যম করতে চাননি তিনি। সামাজিক সচেতনতা তৈরির জন্য ‘সানন্দা’কে উপযুক্ত জায়গা মনে হয়েছিল তাঁর । সম্পাদনার কাজ তাঁকে আর্থিক স্বাধীনতাও দিয়েছিল, ফলে সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে আপস করতে হয়নি।
‘সানন্দা’ ছাড়ার পর ২০০৫ সালে কলকাতার একটি বাংলা টেলিভিশন চ্যানেলে ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসেবে যুক্ত হন অপর্ণা । পরে ‘পরমা’ নামে আরেকটি পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেন। চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি নারীর অধিকার, সামাজিক বৈষম্য ও সমসাময়িক নানা বিষয়ে প্রকাশ্যে মত দিয়েছেন তিনি। তাঁর কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। তবে নিজের মতপ্রকাশে বরাবরই স্পষ্টভাষী ছিলেন অপর্ণা। চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে ভারত সরকারের পদ্মশ্রী সম্মাননা পান তিনি। ‘৩৬ চৌরঙ্গি লেন’ ও ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’-এর জন্য সেরা পরিচালকের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বিভিন্ন স্বীকৃতি পেয়েছেন দেশে-বিদেশে । এভাবেই অভিনয়, চলচ্চিত্র নির্মাণ, লেখালেখি ও সম্পাদনা—চার ক্ষেত্রেই নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন অপর্ণা সেন ।
৮১ বছরেও থামেনি
পরিচালনায় চার দশকের বেশি সময় কাটানোর পরও নতুন গল্প নিয়ে ভাবেন অপর্ণা সেন। তাঁর নির্মিত সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ ছবিগুলোর একটি ‘দ্য রেপিস্ট’। যৌন সহিংসতা, অপরাধ, শাস্তি ও নৈতিকতার জটিল প্রশ্ন নিয়ে নির্মিত ছবিটিতে অভিনয় করেছেন কঙ্কনা সেনশর্মা। অপর্ণার জীবন ও চলচ্চিত্রযাত্রা নিয়ে নির্মাতা সুমন ঘোষ তৈরি করেছেন তথ্যচিত্র ‘পরমা: আ জার্নি উইথ অপর্ণা সেন’। ২০২৪ সালে রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এটি।
একসময় যে তরুণী ‘বসন্ত বিলাপ’-এ নিজেকে ‘মিস ক্যালকাটা’ বলে পরিচয় দিয়েছিলেন, সেই অপর্ণা আজ বাংলা চলচ্চিত্রের দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ। এক প্রজন্ম তাঁকে চেনে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে জনপ্রিয় নায়িকা হিসেবে। আরেক প্রজন্মের কাছে তিনি ‘৩৬ চৌরঙ্গি লেন’, ‘পরমা’ কিংবা ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’-এর পরিচালক।
৮১তম জন্মদিনে তাঁর জীবনের দিকে ফিরে তাকালে তাই শুধু জনপ্রিয় অভিনেত্রীর গল্প পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় এমন এক নারীর গল্প, যিনি প্রতিষ্ঠিত অবস্থান ছেড়ে নতুন পথ বেছে নিয়েছিলেন। পাঁচ দশক আগে পর্দায় তাঁর পরিচয় ছিল ‘মিস ক্যালকাটা’। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই পরিচয়ের সীমানা অনেক দূর ছাড়িয়ে গেছেন অপর্ণা সেন।
সূত্র: প্রথম আলো · বিনোদন





