আর্জেন্টিনার কোচ স্কালোনি ট্যাকটিক্যাল মাস্টারক্লাস

X
লিওনেল স্কালোনি।/
লিওনেল স্কালোনি মূলত রক্ষণাত্মক কোচ, আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে পারেন না, কৌশলে নতুনত্ব নেই-২০২৬ বিশ্বকাপজুড়ে আর্জেন্টাইন মাস্টারমাইন্ডকে নিয়ে সমালোচকদের এমন নানা কথা শুনতে হয়েছে। অনেকেরই মত ছিল, তার খেলার ধরনণ ম্যাড়মেড়ে এবং একই গৎবাঁধা ফরমেশন ও চেনা কৌশলেই তিনি চলছেন।
গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দে ও মিশরের বিপক্ষে এবং নকআউটে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয়ের পরও সুইজারল্যান্ড ম্যাচের আগে গুঞ্জন উঠেছিল—এবার হয়তো থামতে হচ্ছে স্কালোনি ও তাঁর দলকে। কোয়ার্টার ফাইনালের আগে সমালোচকদের যুক্তি ছিল, আধুনিক ফুটবলের গতি ও হাই-ইনটেনসিটি বা হাই-প্রেসিংয়ের সঙ্গে আর্জেন্টিনার ফুটবল ঠিক খাপ খায় না। এমনকি ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তিও সুর মিলিয়ে বলেছিলেন, আর্জেন্টিনা হাই-ইনটেনসিটির ফুটবল খেলতে পারে না। বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে পার পেলেও ইংল্যান্ডের কৌশলের কাছে ঠিকই আটকে যাবে আলবিসেলেস্তেরা।
অথচ মাঠে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। অস্ট্রিয়ার ‘গেগেনপ্রেসিং’ রুখে দিয়ে অনিন্দ্যসুন্দর ল্যাটিন ট্যাঙ্গো উপহার দিয়েছে আর্জেন্টিনা। লাউতারো মার্টিনেজ কিংবা জুলিয়ান আলভারেজদের পা থেকে দেখা গেছে দুর্দান্ত ফুটবল। আর শুরু থেকেই চেনা ছন্দে থাকা লিওনেল মেসি নিজে গোল করছেন, নয়তো গোলে অবদান রাখছেন। এর নেপথ্যে কাজ করেছে স্কালোনির নিখুঁত ছক। আর্জেন্টাইন মাস্টারমাইন্ড তার দলের প্রধান অস্ত্রকে কেন্দ্র করেই মূল পরিকল্পনা সাজিয়েছেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাতে বদলও এনেছেন।
স্কালোনি মূলত টুর্নামেন্টের বেইজ কোচ। পরিস্থিতি বুঝে ম্যাচ বাই ম্যাচ পরিকল্পনা করতে পছন্দ করেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে থমাস টুখেলের ৫-৩-২ ফরমেশনের দুই পাশের ফাঁকা জায়গা (স্পেস) দারুণভাবে ব্যবহার করেছে তিনি। এই ম্যাচে রদ্রিগো দি পলকে বসিয়ে জুলিয়ানো সিমিওনেকে শুরুর একাদশে রাখার সিদ্ধান্তটি ছিল তার মাস্টারস্ট্রোক। এর ফলে নিকো গনজালেস ও দি পল পরে বেঞ্চ থেকে মাঠে নেমে ম্যাচে দারুণ প্রভাব ফেলতে পেরেছেন।
সবচেয়ে বড় কথা, স্কালোনি রক্ষণাত্মক মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে কাল মাঠে নেমেছিলেন জয়ের তাড়না নিয়ে। বড় ম্যাচে আরও একবার তিনি প্রমাণ করলেন, ট্যাকটিকস আর ইন-গেম ম্যানেজমেন্টে কেন তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা। আর্জেন্টিনার ‘লো-ব্লক’ বা নিচে নেমে রক্ষণ সামলানোর যে সমালোচনা হচ্ছিল, কালকের ম্যাচে স্কালোনি সেটিও ভুল প্রমাণ করেছেন।
বিশ্বকাপের শুরু থেকে আর্জেন্টিনা মূলত মিডফিল্ড ও ডিফেন্সের মাঝে একটি বলয় তৈরি করে খেলছিল। লক্ষ্য ছিল মাঝমাঠে ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষকে ব্যস্ত রাখা এবং সেখান থেকে কোনো কৌশলী ক্রসে ফাঁকায় থাকা মেসিকে খুঁজে নেওয়া। বিশ্বকাপের প্রথম কয়েকটি ম্যাচে এই কৌশল সফলও হয়েছিল।
তবে মিশর, অস্ট্রিয়া ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে প্রতিপক্ষ মাঝমাঠে আর্জেন্টিনাকে কড়া মার্কিংয়ে রাখলে কিছুটা বিপত্তি বাঁধে। তখনই আর্জেন্টিনা তাদের ‘প্ল্যান-বি’ কার্যকর করে। যেখানে মেসি ডান প্রান্তে (রাইট উইং) এবং আলভারেজ বাঁ প্রান্তে (লেফট উইং) সরে গিয়ে মাঝখানে জায়গা তৈরি করে নেন। স্কালোনির এই বিকল্প কৌশলও দারুণ সফল হয়।
চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো দলের স্ট্যামিনা ও শেষ মুহূর্তের আক্রমণ। ম্যাচের ৭৫ মিনিট পার হওয়ার পর চলতি টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত ১১টি গোল করেছে আলবিসেলেস্তেরা। অর্থাৎ, ম্যাচের শুরুতে নিয়ন্ত্রণ নিজেদের শক্তি ধরে রেখে শেষভাগে এসে গতি ও কার্যকারিতা বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করছে তারা। আর এটিও যে স্কালোনির সুদূরপ্রসারী কৌশলেরই অংশ, তা বলাই বাহুল্য।
খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো যেন অভ্যাসে পরিণত করেছে এই আর্জেন্টিনা দল। পরিস্থিতি যত প্রতিকূলই হোক না কেন, জয়ের ঠিকানা ঠিকই খুঁজে নেয় তারা। বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালেও দলের এমন হার না মানা পারফরম্যান্স দেখে মুগ্ধ কোচ লিওনেল স্কালোনি। আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বললেন, “ফাইনালও জিতব।”
আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে বুধবার, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে পিছিয়ে পড়েছিল আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ৮৪ মিনিট পর্যন্ত স্কোরলাইন ছিল ১-০। সমর্থকদের মাঝে হয়তো শিরোপা ধরে রাখার অভিযান শেষের শঙ্কা তখন জেঁকে বসেছিল।
তবে মাঠের ১১ আর্জেন্টাইনের মধ্যে নয়। এই বিশ্বকাপেই আগের কয়েক রাউন্ডেও তাই করে দেখিয়েছে তারা। শেষ ষোলোয় মিশরের বিপক্ষে দুই গোলের ঘাটতি পুষিয়ে, ১৩ মিনিটে তিন গোল করে জয়ের উল্লাসে মেতেছিল দলটি। আর এবার, ৮৫তম মিনিটে এন্সো ফের্নান্দেসের দুর্দান্ত গোলে সমতায় ফেরার পর, যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে ব্যবধান গড়ে দেন লাউতারো মার্তিনেস।
ছেলেদের এমন বিজয়ী মানসিকতা দেখে বিশ্বকাপ জয়ী কোচ নিজেও বিস্মিত, মুগ্ধ। ম্যাচ শেষের প্রতিক্রিয়ায় ঠিকমতো কথাই বলতে পারছিলেন না তিনি,‘ আমি বাকরুদ্ধ। এই জয় আমাদের দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। সেই দিন আমি বলেছিলাম, এই ছেলেরা সবসময় আমাকে বিস্মিত করে।’
পরে সংবাদ সম্মেলনেও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন স্কালোনি। একটু আগে তার দল মাঠে যা করে দেখিয়েছে, তা যেন তার চোখ থেকে সরছিলই না। আমার কণ্ঠ ভেঙে আসছে, কারণ আজ এখানে (তাদের পারফরম্যান্সে) অনেক কিছুর দেখা মিলল: দলীয় প্রচেষ্টা, ভ্রাতৃত্ব, কখনও হাল না ছাড়ার মানসিকতা, শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়া। এরপর, আমরা ফাইনাল জিতব। তবে, এই দলকে এর চেয়ে বেশি আর কী করতে হবে? তারা আমাকে আবেগপ্রবণ করে ফেলেছে। আমার বেশি কিছু বলার নেই; সব কৃতিত্ব কেবলই তাদের।”
চার আসরের মধ্যে তৃতীয়বার ফাইনালে উঠল আর্জেন্টিনা। আগামী রোববার নিউ জার্সিতে শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্যে তারা খেলবে প্রথম সেমি-ফাইনালে ফ্রান্সকে উড়িয়ে দেওয়া স্পেনের বিপক্ষে।