রবিবার , ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আন্তর্জাতিক
  4. খেলা
  5. খেলাধুলা
  6. জাতীয়
  7. তথ্য-প্রযুক্তি
  8. দেশজুড়ে
  9. প্রবাস
  10. প্রাকৃতিক দুর্যোগ
  11. বিনোদন
  12. মতামত
  13. রাজনীতি
  14. লাইফস্টাইল
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কৃষি ও খামার ভিত্তিক পর্যটনে অবারিত হচ্ছে নতুন দুয়ার


সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ ৩:৫৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

শহরের সকালটা শুরু হয় গাড়ির হর্নে। কাঁচের জানালার ওপাশে গাড়ির সারি। মাথার ওপর কংক্রিটের ছাদ। চারদিকে ব্যস্ত মানুষ। কেউ অফিসে ছুটছেন, কেউ স্কুলে সন্তানকে পৌঁছে দিচ্ছেন, কেউ আবার মুঠোফোনের পর্দায় আটকে থাকা জীবনের সঙ্গে লড়ছেন। এমন এক সকালে ঢাকার কোনো এক পরিবারের বাবা হঠাৎ সন্তানকে বললেন, ‘চলো, আজ তোমাকে একটা আসল গাছ দেখাই।’ শিশুটি অবাক।‘আসল গাছ মানে?’ বাবা হাসলেন।‘যে গাছ থেকে খাবার আসে।’

কয়েক ঘণ্টা পর তারা শহর পেরিয়ে পৌঁছাল গ্রামের একটি খামারে। সামনে ধানখেত। পাশে পুকুর। দূরে গরু বাঁধা। উঠানে মাটির চুলায় রান্না হচ্ছে ভাত। শিশুটি প্রথমবার নিজের হাতে ধান গাছ ছুঁয়ে দেখল। মাটিতে বসে শাক তুলল। পুকুরে মাছ দেখল। দুপুরে খেল সেই জমিতে উৎপাদিত চালের ভাত, খামারের সবজি আর পুকুরের মাছ। ফেরার সময় শিশুটি বুঝতে পারলো- তার খাবার আসলে সুপারশপের তাক থেকে জন্মায় না। ধান থেকে চাল হয়, মাটিতে সবজি ফলে, পুকুরে মাছ বড় হয়। আর সেই খাবারের পেছনে থাকে একজন কৃষকের ঘাম, অপেক্ষা আর মাটির সঙ্গে তার প্রতিদিনের লড়াই। গাড়ি যখন আবার শহরের পথে ফিরছে, শিশুটি জানালার পাশে বসে চুপচাপ বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর বাবাকে বলল, ‘আমরা আবার এখানে আসব?’

বাবা কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন। হয়তো এই ফিরে আসার ইচ্ছেটাই এখন বিশ্বজুড়ে একটি নতুন পর্যটনধারার জন্ম দিয়েছে। যেখানে মানুষ শুধু কোনো জায়গা দেখতে যায় না, যায় সেই জায়গার জীবনকে ছুঁতে। যেখানে হোটেলের বদলে রাত কাটানো যায় খামারবাড়িতে, রেস্টুরেন্টের বদলে খাওয়া যায় কৃষকের উঠানে, আর গাইডের বদলে গল্প শোনান সেই মানুষটি-যিনি প্রতিদিন মাটিতে বীজ পুঁতে আগামী দিনের খাবার তৈরি করেন। এটাই অ্যাগ্রো ট্যুরিজম বা কৃষি পর্যটন।

একসময় পর্যটন মানেই ছিল পাহাড়, সমুদ্র, বন কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনা। এখন সেই তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে ধানখেত, ফলের বাগান, ফুলের মাঠ, মাছের ঘের, গবাদিপশুর খামারও। কারণ আধুনিক মানুষ প্রকৃতি দেখার সঙ্গে সম্পর্কটাও চায়। আর এই জায়গাতেই গল্পটা বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থ পায়। কারণ অ্যাগ্রো ট্যুরিজমের জন্য বাংলাদেশকে নতুন করে সাজাতে হবে না। আমাদের অনেক কিছুই আগে থেকেই আছে- শুধু সেগুলোকে নতুন করে দেখার, সাজানোর এবং পর্যটনের অভিজ্ঞতায় পরিণত করার চেষ্টা করলেই হবে।

শহর যখন গ্রামে ফিরতে শুরু করল:

কৃষি পর্যটনের গল্প আসলে শহর ও গ্রামের পুরোনো সম্পর্কের নতুন সংস্করণ। বিশ শতকের শুরুতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শহুরে মানুষ ছুটির দিনে গ্রামে যেতে শুরু করেন। শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতি, স্থানীয় খাবার ও কৃষিজীবন দেখার আকর্ষণ তৈরি হয়। বিভিন্ন গবেষণায় এই সময়কে কৃষি পর্যটনের প্রাথমিক বিকাশের পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফ্রান্স, ইতালি, ইংল্যান্ড, জার্মানিসহ পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকেরা বাড়তি আয়ের জন্য থাকার জায়গা ও খাবারের ব্যবস্থা করতে শুরু করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই ধারণা আরও শক্তিশালী হয়। ইতালির গল্পটি এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির গ্রাম থেকে মানুষ শহরমুখী হচ্ছিল। কৃষিজমি ও পুরোনো খামারবাড়ি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সেই বাস্তবতা থেকে কৃষির পাশাপাশি পর্যটনকে যুক্ত করার ধারণা বিকশিত হয়। ইতালিতে কৃষি পর্যটনের ইতিহাস ১৯৬৫ সাল থেকে ধরা হয়। ১৯৭৩ সালে খামারে পর্যটকদের থাকার আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা স্বীকৃতি পায়। পরে এটি শুধু থাকার ব্যবস্থায় আটকে থাকেনি, পরিণত হয় স্থানীয় খাবার, কৃষিকাজ, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবন মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন পণ্যে।

আজ ইতালিতে ২০ হাজারের বেশি খামার কৃষি পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত। পাহাড়ি ও অপেক্ষাকৃত কঠিন কৃষি অঞ্চলেও এই ব্যবস্থা কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে এবং পুরোনো গ্রামীণ স্থাপনা সংরক্ষণে ভূমিকা রাখছে। অর্থাৎ, পর্যটন এখানে কৃষির বিকল্প হয়নি। বরং কৃষির পাশে দাঁড়িয়েছে। ইতালির সরকারি কৃষি পর্যটন প্ল্যাটফর্মে থাকা মডেলগুলোতে থাকার ব্যবস্থা, দেশি খাবার, হাঁটা, সাইক্লিং, ঘোড়ায় চড়া, মাছ ধরা, শিশুদের শিক্ষামূলক কার্যক্রম, স্থানীয় ইতিহাস ও জীববৈচিত্র্য-বিভিন্ন অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। আর এ কারণেই কৃষি পর্যটন সাধারণ গ্রামে বেড়াতে যাওয়া থেকে কিছুটা আলাদা।

যুক্তরাষ্ট্রে খামারও এখন পর্যটনের ব্যবসা:

ইউরোপ থেকে কৃষি পর্যটনের ধারণাটি ছড়িয়ে যায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। যুক্তরাষ্ট্রে এর ধরন কিছুটা ভিন্ন। কোথাও ফল তুলতে যেতে হয়। কোথাও ফার্মে রাত কাটানো যায়। কোথাও ঘোড়ায় চড়া, মাছ ধরা, শিকার, কৃষি প্রদর্শনী, ফার্ম ফেস্টিভ্যাল কিংবা শিশুদের জন্য পশুপাখি দেখার ব্যবস্থা থাকে। ২০২২ সালের মার্কিন কৃষি শুমারি অনুযায়ী, দেশটির খামারগুলো কৃষি পর্যটন ও বিনোদনমূলক সেবা থেকে প্রায় ১২৬ কোটি ডলার আয় করেছে। মজার বিষয় হলো, এই ব্যবসা কেবল বড় খামারের জন্য নয়। ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩ শতাংশ খামার কোনো না কোনো কৃষি পর্যটন কার্যক্রমে যুক্ত ছিল। অংশগ্রহণকারী খামারের বড় অংশই তুলনামূলক ছোট খামার। অর্থাৎ খামার ছোট হলেই পর্যটনের সুযোগ ছোট হবে, এমন নয়।

অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের গল্পটা অন্যরকম:

নিউজিল্যান্ডে ফার্ম হলিডের ইতিহাস আরও পুরোনো। ১৯৩০-এর দশকেই কিছু কৃষক অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে খামারে অর্থের বিনিময়ে অতিথি রাখতে শুরু করেছিলেন। পরে এটি সংগঠিত রূপ পায়। বর্তমানে ফার্ম স্টে, ফার্ম ট্যুর, ঘোড়ায় চড়া, পশুপালন দেখা, জৈব কৃষি এবং কৃষিকাজের অভিজ্ঞতা-গ্রামীণ পর্যটনের নানা অংশ।

আর অস্ট্রেলিয়া এখন কৃষি পর্যটনেরকে আঞ্চলিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে। ২০২৪ সালে দেশটিতে অ্যাগ্রো ট্যুরিজম-সম্পৃক্ত ভ্রমণ, রাতযাপন ও ব্যয়- তিনটিই বেড়েছে। শুধু তাই নয়, অস্ট্রেলিয়ার পর্যটন গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার বাইরে বিশ্বের ৮৪ শতাংশ ভ্রমণকারী ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ভ্রমণে কোন না কোন অ্যাগ্রো ট্যুরিজম অভিজ্ঞতায় আগ্রহী বলে জানিয়েছে।

এখানে একটা বড় পরিবর্তন বোঝা যায়। পর্যটক এখন শুধু পাহাড়, সমুদ্র কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে চায় না। সে জানতে চায়- খাবারটা কোথা থেকে এলো?

কৃষি পর্যটনের গ্রাহক যারা:

কৃষি পর্যটনের সবচেয়ে বড় গ্রাহকদের একটি অংশ হলো শহুরে পরিবার- বিশেষ করে সন্তানদের প্রকৃতি ও কৃষির সঙ্গে পরিচয় করাতে চান এমন বাবা-মা।

জলপাই থেকে তেল, দুধ থেকে চিজ কিংবা ধান থেকে ভাত-খাবারের পুরো যাত্রাটি তাদের কাছে আকর্ষণীয়। এ দলে আছেন শিক্ষার্থীরাও। স্কুলের বইয়ে কৃষি পড়ার বদলে তারা বাস্তবে দেখতে পারে ধান কীভাবে হয়, গরুর খামার কেমন, মৌমাছি কীভাবে মধু তৈরি করে, মাটির সঙ্গে কৃষকের সম্পর্ক কী। আছেন বিদেশি পর্যটক, যারা একটি দেশের প্রকৃত জীবন দেখতে চান। আর আছেন এমন মানুষ, যারা শহরের জীবন থেকে কয়েক দিনের জন্য বিরতি চান। তাদের কাছে পাঁচতারকা হোটেলের বিলাসিতার চেয়ে ভোরের পাখির ডাক বড় আকর্ষণ।

বাংলাদেশের গল্পটা যেমন:

বাংলাদেশে জাতীয় পর্যটন নীতিতেও গ্রামীণ, নদীভিত্তিক ও কৃষিভিত্তিক পর্যটনকে বৈচিত্র্যময় পর্যটন পণ্য হিসেবে উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। তবে কৃষি পর্যটনে সবচেয়ে বড় বাজার হয়তো বিদেশি নয়। এখানেই বাংলাদেশের একটি বিশেষ সুবিধা আছে। কৃষি পর্যটনের জন্য আমাদের প্রথমে বিদেশি পর্যটক আনতে হবে না।

ঢাকার মানুষই হতে পারেন প্রথম গ্রাহক। চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা কিংবা দেশের অন্য বড় শহরের মানুষও হতে পারেন গ্রাহক। একটি পরিবার শুক্রবার সকালে বাসে উঠল। ঢাকা থেকে দুই-তিন ঘণ্টার দূরত্বের একটি কৃষি খামারে গেল। সন্তানরা গাছ দেখল, কৃষকের সঙ্গে কথা বলল, মাছ ধরার অভিজ্ঞতা নিল, দুপুরে স্থানীয় খাবার খেল। সন্ধ্যায় ফিরে এল। এই মডেলটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের পর্যটনের বড় বাজার অভ্যন্তরীণ পর্যটক।

কৃষি পর্যটন বিকশিত হলে কৃষক তখন শুধু ধান বিক্রি করবেন না। ধান বিক্রি করে তিনি একটি আয় পাবেন কিন্তু সেই জমিকে যদি পর্যটনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে একই জমি থেকে আরও কয়েকটি আয়ের পথ তৈরি হতে পারে।

ধরা যাক, একটি গ্রামে ৫০টি পরিবার কৃষির সঙ্গে যুক্ত। একজন কৃষক অতিথিশালা করলেন। আরেকজন স্থানীয় খাবার সরবরাহ করলেন। কেউ নৌকা চালালেন, কেউ গাইড হলেন, কেউ বাঁশের তৈরি পণ্য বিক্রি করলেন, কেউ কৃষিপণ্য প্যাকেট করে পর্যটকদের দিলেন, কেউ পরিবহন দিলেন। যদি কোন পর্যটক একবার সেই গ্রামে আসেন তাহলে তার খরচ ছড়িয়ে পড়বে পুরো গ্রামের অর্থনীতিতে। এ কারণেই কৃষি পর্যটনকে শুধু পর্যটন নয়, গ্রামীণ অর্থনীতির বহুমুখীকরণের হাতিয়ার হিসেবেও দেখা হয়।

তবে ঝুঁকিও আছে। কৃষি পর্যটন মানেই জমিতে রেস্টুরেন্ট বা রিসোর্ট বানিয়ে বড় আয়ের স্বপ্ন দেখা নয়। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সেখানেই। কৃষিজমি কেটে রিসোর্ট বানিয়ে, চারদিকে কংক্রিট করে, কয়েকটি গাছ লাগিয়ে সেটিকে কৃষি পর্যটন বলা হলে কৃষি থাকবে না-থাকবে শুধু গ্রামের সাজসজ্জা।

সফল মডেলের মূল কথা হলো- কৃষি আগে, পর্যটন পরে। খামারটিকে সত্যিই কৃষির সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। কৃষককে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রাখতে হবে। স্থানীয় মানুষকে অংশীদার করতে হবে। পানি, বর্জ্য, শব্দ, পরিবেশ ও কৃষিজমির ওপর চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাহলে এগিয়ে যাবে সম্ভাবনাময় কৃষি পর্যটন।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।

📰 ঢাকা ইনফো২৪

দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, প্রবাসীদের তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট

আরও পড়ুন
`);w.document.close();setTimeout(function () { w.focus(); w.print(); }, 500);});});