সিরাজগঞ্জের চলনবিল অধ্যুষিত তাড়াশ উপজেলার বারুহাসে ছড়িয়ে আছে ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য আর নানা কিংবদন্তি। গ্রামের কোথাও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো তিন গম্বুজবিশিষ্ট চৌধুরীবাড়ি জামে মসজিদ। আবার কোথাও কালের ক্ষয় আর অবহেলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে কয়েকশ বছরের পুরোনো শাহ ইমাম (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত ইমামবাড়ি। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে গুরুত্বপূর্ণ এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন হারাতে বসেছে তাদের আদি বৈশিষ্ট্য।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারি উদ্যোগে প্রাচীন স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করা হলে বারুহাসের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি চলনবিল অঞ্চলে ঐতিহাসিক পর্যটনের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
দেড়শ বছর ধরে টিকে আছে তিন গম্বুজের মসজিদ
বারুহাস গ্রামের পশ্চিমপাড়ার চৌধুরীপাড়ায় অবস্থিত দেল মাহমুদ চৌধুরী জামে মসজিদটি স্থানীয়ভাবে চৌধুরীবাড়ি জামে মসজিদ নামে পরিচিত। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৮৭৫ সালে দেল মাহমুদ চৌধুরী মসজিদটি নির্মাণ করেন। প্রায় দেড়শ বছর ধরে এটি এলাকার মানুষের ধর্মীয় চর্চার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
মসজিদটির নির্মাণশৈলীতে মোগল স্থাপত্যের প্রভাব লক্ষ করা যায়। চুন-সুরকির গাঁথুনি, পুরু দেয়াল, তিনটি বড় গম্বুজ এবং পোড়ামাটির অলংকরণ এর প্রাচীনত্ব ও সৌন্দর্যের পরিচয় বহন করে। ছাদের ওপরের তিনটি গম্বুজের পাশাপাশি আটটি পিলারের ওপর রয়েছে তিনটি বড় ও পাঁচটি ছোট মিনার। কাঠের তৈরি তিনটি দরজাও স্থাপনাটির পুরোনো নির্মাণশৈলীর সাক্ষ্য দেয়।
প্রায় চার শতক জায়গার ওপর নির্মিত মসজিদটির ভেতরের অংশ তুলনামূলক ছোট। প্রতি সারিতে প্রায় ২০ জন করে তিন সারিতে ৬০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। বাইরে খোলা বারান্দায় রয়েছে আরও দুই সারিতে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা। ভেতরের দেয়ালে থাকা বিভিন্ন ধরনের অলংকরণ ও কারুকাজ দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
মসজিদের দক্ষিণ পাশে রয়েছে চৌধুরী পরিবারের পুরোনো বাড়ি ও পারিবারিক কবরস্থান। কাছাকাছি ভদ্রাবতী নদী ও খালের অবস্থান পুরো এলাকাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। নিয়মিত নামাজ আদায়ের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে অনেকে প্রাচীন এই স্থাপনা দেখতে আসেন।
বারুহাস গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, তাদের পূর্বপুরুষ দেল মাহমুদ চৌধুরী ১৮৭৫ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেন। পূর্বপুরুষদের ধারাবাহিকতায় তারাও এখানে নামাজ আদায় করছেন। সরকারি উদ্যোগে মসজিদটির সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও নিজেদের ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে।
মসজিদের ইমাম ও খতিব হাফেজ মাওলানা মো. খবির উদ্দিন জানান, তিনি ৩১ বছর ধরে এখানে ইমামতির দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে মসজিদ মুসল্লিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। এত পুরোনো একটি মসজিদে দীর্ঘদিন ইমামতির দায়িত্ব পালন করতে পেরে তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন।
ধ্বংসের মুখে শাহ ইমাম (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত ইমামবাড়ি
বারুহাসের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন শাহ ইমাম (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত ইমামবাড়ি। স্থানীয় ইতিহাস ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে এই স্থাপনা এবং এর আশপাশের এলাকা ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তবে এসব ঘটনার সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ ও স্থাপনাটির নির্মাণকাল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সীমিত।
স্থানীয়দের প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ইয়েমেন থেকে আগত সুফি-সাধক হযরত শাহ ইমাম (রহ.) বারুহাসে বসতি স্থাপন করে ইসলাম প্রচার করেন। পরবর্তী সময়ে সম্রাট জাহাঙ্গীর বাংলা সফরে এসে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। শাহ ইমামের ইবাদত ও বসবাসের সুবিধার্থে সম্রাট কয়েকটি পাকা ঘর নির্মাণ এবং একটি পুকুর খননের ব্যবস্থা করেন বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়। ইসলাম প্রচারের জন্য তাকে করমুক্ত জমি দেওয়ার কথাও প্রচলিত রয়েছে।
এসব স্থাপনাকে কেন্দ্র করেই বারুহাস ইমামবাড়ির পরিচিতি গড়ে ওঠে। একসময় এখানে মসজিদসহ একাধিক স্থাপনা ছিল বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে অধিকাংশ স্থাপনা বিলুপ্ত হয়েছে। যেগুলো এখনো টিকে আছে, সেগুলোর দেয়ালের আস্তর খসে পড়ছে। ইট-সুরকির গাঁথুনিতে জন্মেছে লতাপাতা ও গাছগাছালি। নষ্ট হয়ে গেছে স্থাপত্যের অনেক কারুকাজ।
ইমামবাড়ির আশপাশে রয়েছে পুরোনো সমাধি ও একটি বড় পুকুর। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুকুর ও সংশ্লিষ্ট জমির কিছু অংশ বেদখল হয়ে গেছে। তবে জমির মালিকানা, সীমানা ও দখলের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণে সরকারি জরিপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, ইমামবাড়ির অধিকাংশ স্থাপনা আর অবশিষ্ট নেই। সমাধির সামনে প্রায় সাড়ে আট বিঘা আয়তনের একটি পুকুর রয়েছে, যার কিছু অংশ দখল হয়ে যাওয়ার অভিযোগ আছে। সরকারি উদ্যোগে জমির প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় জমি উদ্ধার এবং স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করা গেলে এলাকার ঐতিহাসিক স্মৃতি রক্ষা পাবে।
ইমামবাড়ির জন্য নির্দিষ্ট কোনো দেখভালকারী নেই বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। আশপাশের বাসিন্দা মো. কাবুল সরকার ও রেজা (ফারুক) মেম্বারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকাবাসী স্থাপনাটির স্মৃতি ও অবশিষ্ট নিদর্শন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন।
বারুহাসের নাম ঘিরেও রয়েছে কিংবদন্তি
বারুহাসের পরিচয় শুধু প্রাচীন মসজিদ ও ইমামবাড়িতে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামটির নামকরণ নিয়েও প্রচলিত রয়েছে নানা জনশ্রুতি। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, নায়েব শেখ বাহারউদ্দিন ‘বারু শেখ’ নামে পরিচিত ছিলেন। তার নাম থেকেই বারুহাস নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
এলাকায় পুরোনো জমিদারবাড়ি, মসজিদ, ইমামবাড়ি ও বেহুলার কূপের মতো ঐতিহাসিক স্থানের কথাও প্রচলিত রয়েছে। এসব নিদর্শনকে ঘিরে প্রতিবছর আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী বারুহাস মেলা স্থানীয় সংস্কৃতি ও জনজীবনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
সংরক্ষণে উদ্যোগের আশ্বাস প্রশাসনের
স্থানীয়দের মতে, বারুহাসের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো রক্ষায় প্রথমে ইমামবাড়ির অবশিষ্ট স্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট জমির প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এরপর জরিপের মাধ্যমে জমির সীমানা চিহ্নিত করে দখলসংক্রান্ত অভিযোগ যাচাই, স্থাপনাগুলোর ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব নিরূপণ এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে।
একই সঙ্গে চৌধুরীবাড়ি জামে মসজিদের মূল স্থাপত্য অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, যথাযথ পরিকল্পনা ও সংরক্ষণের মাধ্যমে এসব স্থাপনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি চলনবিল অঞ্চলের ইতিহাসভিত্তিক পর্যটন বিকাশের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো অতীত ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ধারক। এগুলো শুধু ইট-পাথরের নির্মাণ নয়, বরং পূর্বপুরুষদের শিল্পবোধ, স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। দীর্ঘদিন ধরে এসব স্থাপনা অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে। তাই এগুলো সংরক্ষণ করা সবার দায়িত্ব।
বারুহাসের প্রাচীন মসজিদ ও ইমামবাড়ি কেবল স্থানীয় ধর্মীয় ইতিহাসের অংশ নয়, এগুলো চলনবিল অঞ্চলের অতীত জীবন, স্থাপত্য ও লোকঐতিহ্যেরও সাক্ষ্য। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসা এসব নিদর্শন সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.