খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার সোনামিয়া টিলায় এক সময় ৮১২টি বাঙালি পরিবারকে ৫ একর করে জমি দিয়ে পুনর্বাসন করেছিল সরকার। চার দশক ধরে দলিল থাকলেও সেই জমি তাদের দখলে নেই। উল্টো এসব বাস্তুচ্যুত পরিবার বছরের পর বছর ধরে বাবুছড়াসহ বিভিন্ন গুচ্ছগ্রামে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
এরই মধ্যে ২০১৮ সালে জারি হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজ্ঞাপনও ৮ বছর ধরে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
১৯৮০-৮২ সালে পুনর্বাসন নীতির আওতায় সমতল অঞ্চল থেকে আনা ভূমিহীন বাঙালি পরিবারগুলোকে দীঘিনালার বাবুছড়া ইউনিয়নের প্রায় ৪০৬০ একর সরকারি খাস জমিতে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৮৬ সালের নভেম্বরে সশস্ত্র গেরিলা বাহিনী (শান্তিবাহিনী)-এর সহিংসতা ও হামলার প্রেক্ষাপটে সোনামিয়া টিলার বাসিন্দাদের সরিয়ে বাবুছড়া পুলিশ ফাঁড়ি সংলগ্ন গুচ্ছগ্রামে স্থানান্তর করা হয়। অস্থায়ী এই ব্যবস্থা সময়ের সঙ্গে স্থায়ী হয়ে গেলেও তাদের নিজ জমিতে ফেরার কোনো কার্যকর উদ্যোগ আর বাস্তবায়িত হয়নি।
২০১৮ সালের ১ নভেম্বর জারি করা ২৯.০০.০০০০.২২৩.০১৩.২০১৭.৩৫১ নম্বর স্মারকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব রীভা চাকমার স্বাক্ষরে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়— সোনামিয়া টিলাসহ বাঙালিদের বেদখল হয়ে যাওয়া ভূমি উদ্ধারে পূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনি সহায়তা দিতে হবে এবং পার্বত্য অঞ্চল থেকে তাদের সম্ভাব্য স্থানান্তর ঠেকাতে আস্থা ফিরিয়ে আনার কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রশাসন, এনজিও ও নিরাপত্তা বাহিনীকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ ৮ বছরেও এসব নির্দেশনার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়নি।
এদিকে ২০০৫ সালে সোনামিয়া টিলার নাম পরিবর্তন করে ‘সাধনা টিলা’ রাখা হয় এবং পরবর্তীতে সেখানে বাঙালিদের সৃজিত জমিতে বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ‘সাধনা টিলা বনবিহার’ নির্মাণ করা হয়। পরে ২০১৮-২০২০ সালে ধাপে ধাপে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বনবিহারে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সাবেক জেলা পরিষদের সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট আশুতোষ চাকমার নেতৃত্বে সরকারি টাকায় এ কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে— সরকারি বরাদ্দকৃত জমিতে কীভাবে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ হলো, যখন মূল মালিকরা এখনও বাস্তুচ্যুত?
তবে এখনো সেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘সোনামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। যা এলাকাটির ঐতিহাসিক পরিচয়ের সাক্ষ্য বহন করে। সোনামিয়া টিলার ইতিহাস পুরোপুরি মুছে যায়নি। বর্তমানে সোনামিয়া টিলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসতি ও ধর্মীয় স্থাপনা গড়ে উঠলেও প্রকৃত মালিক দাবী করা গুচ্ছগ্রামের পরিবারগুলো অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছে।
বাবুছড়ার গুচ্ছগ্রাম ঘুরে দেখা যায়, ছোট ছোট ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করছে পরিবারগুলো। বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নিরাপত্তা সংকট তাদের নিত্যসঙ্গী। অনেকেই জানান, নিরাপত্তার কারণে স্বাভাবিক চলাচলও সম্ভব হয় না।
খাগড়াছড়ি জেলায় বর্তমানে ৮১টি গুচ্ছগ্রামে প্রায় ২৬ হাজারের বেশি পরিবার বসবাস করছে, যার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। অধিকাংশই নিম্নআয়ের মানুষ, যারা দিনমজুরি বা ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও রয়েছে চরম সংকট। চার দশক পেরিয়ে গেলেও ৮১২টি পরিবারের নিজ ভূমিতে ফেরার প্রশ্নটি আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের এই সংকট এখন জাতীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারণী অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবি রাখে।
সোনামিয়া টিলা গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা পারভেজ বলেন, “আদালত ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আমরা জমির মালিক হয়েও সেখানে যেতে পারি না, অথচ আমরা এখনো খাজনা দিয়ে যাচ্ছি। বছরের পর বছর কষ্টে দিন কাটছে।”
দীঘিনালা উপজেলা ভূমি রক্ষা কমিটির সভাপতি আবদুল মালেক হাওলাদার বলেন, “২০১৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। কিন্তু আজও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। আমরা আমাদের বসতভিটায় ফিরতে চাই। দলিল দস্তাবেজ দেখে আমাদের জায়গা ফেরত চাই।”
অন্যদিকে স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা বলছেন, “বিষয়টি সংবেদনশীল এবং যেকোনো সিদ্ধান্তে সব পক্ষের স্বার্থ বিবেচনা করা প্রয়োজন। একে অপরকে ছাড় দিলে বিষয়টির সমাধান সম্ভব।”
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, “এ বিষয়ে সরকারের প্রথম এবং সর্বশেষ নির্দেশনা কি ছিল আমরা সেটার খোঁজ নিচ্ছি। সরকারের নির্দেশনা থাকলে— স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ উদ্যোগে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
কুশল/সাএ