একসময় লবণশিল্পের কারণে বাণিজ্যিক নদীবন্দর হিসেবে ‘দ্বিতীয় কলকাতা’ খ্যাতি পেয়েছিল শতবর্ষী শহর ঝালকাঠি। ব্রিটিশ আমল থেকে বাসন্ডা নদীর দুই তীরে গড়ে উঠেছিল একের পর এক লবণ কারখানা। কাঁচামাল পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যস্ততায় মুখর থাকত নদীপথ। সময়ের পরিবর্তনে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর লবণ কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে স্থানীয় শিল্প। বন্ধ হয়ে গেছে ১৭টি কারখানার মধ্যে ১০টি।
লবণশিল্পকে ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের ফলে ঝালকাঠি একসময় ‘দ্বিতীয় কলকাতা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। একই সঙ্গে লবণশিল্পের ঐতিহ্যের কারণে ঝালকাঠি বন্দরও বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করে।
তবে আশির দশক থেকে লবণ উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে থাকায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে ঝালকাঠির সনাতনী পদ্ধতির কারখানাগুলো। দীর্ঘ সময় ধরে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঝালকাঠির ১৭টি লবণ মিলের মধ্যে মিতালী সল্ট, নুর সল্ট ও সুরভি সল্টসহ ১০টি ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে শরীফ সল্ট, নিউ ঝালকাঠি সল্টসহ সাতটি মিল চালু রয়েছে।
যেভাবে তৈরি হয় ঝালকাঠির লবণ
ঝালকাঠির লবণ মিলগুলোতে এখনও মূলত সনাতনী পদ্ধতিতে লবণ প্রক্রিয়াজাত করা হয়। কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে আনা কাঁচা লবণ প্রথমে শোধন করা হয়। এরপর কয়েক ধাপে পানি মেশানো লবণের দানা প্রক্রিয়াজাত করে রাসিন মেশিনের মাধ্যমে শুকিয়ে ঝরঝরে করা হয়।
পরে বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী লবণ তৈরি করে তাতে পরিমাণমতো আয়োডিন মেশানো হয়। সবশেষে প্যাকেটজাত করে বাজারে সরবরাহ করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তির কারখানাগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা কঠিন হলেও ঝালকাঠির লবণ উৎপাদন আগের তুলনায় বেড়েছে। বর্তমানে এখানকার মিলগুলোতে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার লবণ উৎপাদন হয়।
কম দামে মিলছে স্থানীয় লবণ
বাজারের বড় কোম্পানিগুলোর প্যাকেটজাত লবণ খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হলেও ঝালকাঠির উৎপাদিত লবণের দাম ২০ থেকে ২২ টাকা বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় ঝালকাঠির লবণের চাহিদা রয়েছে আশপাশের বিভিন্ন এলাকায়। এমনকি রাজশাহী, পাবনা ও কুষ্টিয়া থেকেও পাইকাররা এসে এখানকার লবণ কিনে নিয়ে যান।
আধুনিকায়নের দাবি
ঝালকাঠি বিসিকের উপব্যবস্থাপক আল আমিন বলেন, লবণশিল্পের মান ধরে রাখতে বিসিক সার্বক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে আসছে। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা এবং আধুনিকায়নের জন্য বিসিক সবসময় পাশে রয়েছে।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি কাঠামো তৈরির বিষয়টিও মালিক সমিতি বিবেচনা করছে। পর্যাপ্ত মূলধন ও সরকারি সহযোগিতা পাওয়া গেলে, বিদেশ থেকে লবণ আমদানি বন্ধ করে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা হলে দেশের ঐতিহ্যবাহী লবণশিল্পকে আবারও ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব।
ব্যবসায়ীদের মতে, আধুনিকায়ন ও সরকারি সহায়তার মাধ্যমে ঝালকাঠির লবণশিল্পকে প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা গেলে শুধু পুরোনো ঐতিহ্যই পুনরুদ্ধার হবে না, এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানও টেকসই করা সম্ভব হবে।