আমরা ঢাকা রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজে ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত একসঙ্গে পড়েছি। তখন আমরা কিশোর। পৃথিবীকে দেখার চোখ ছিল সরল, ভবিষ্যৎ ছিল সামনে, আর বন্ধুত্বের অর্থ ছিল একসঙ্গে থাকা, কথা বলা, হাসি-ঠাট্টা করা এবং একই সময়ের কিছু স্মৃতি নিজের মধ্যে জমিয়ে রাখা।
তখন কে জানত, সেই সময়ের একজন সহপাঠী একদিন বাংলাদেশের গণমাধ্যমে নিজের একটি আলাদা জায়গা তৈরি করবে এবং আমাদের জীবন দুজনকে দুই ভিন্ন দেশে নিয়ে যাবে?
২০১৮ সালে লন্ডনে তৌফিকের সঙ্গে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা একসঙ্গে কাটানোর স্মৃতিটি আজ বারবার মনে পড়ছে। এত বছর পর দুজন মানুষ যেন আবার নিজেদের কৈশোরের দিনগুলোর কাছে ফিরে গিয়েছিলাম।
দীর্ঘ সময় পাশাপাশি থাকা, গল্প করা, পুরোনো দিনের কথা মনে করা, জীবনের নানা বাঁক নিয়ে কথা বলা, এসবের মধ্যে দিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম, সময় অনেক কিছু বদলে দিতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের পুরোনো বন্ধুত্বের জায়গাটি সহজে বদলায় না।
সেই ৪৮ ঘণ্টা তখন হয়তো জীবনের আর দশটি দিনের মতোই মনে হয়েছিল। আজ বুঝতে পারছি, কিছু সময়ের মূল্য আমরা তখন বুঝতে পারিনি; সময় চলে যাওয়ার পর স্মৃতিই তার মূল্য আমাদের বুঝিয়ে দেয়।
এরপরও কয়েকবার লন্ডনে তৌফিকের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। কখনো সে সেখানে এসেছে, কখনো আমি লন্ডনে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেছি। বয়স বেড়েছে, জীবনের অভিজ্ঞতা বেড়েছে, আমাদের দায়িত্ব ও অবস্থান বদলেছে, কিন্তু পুরোনো বন্ধুত্বের সেই পরিচিত অনুভূতিটা কোথাও যেন রয়ে গিয়েছিল।
একবার সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে লন্ডনে চিকিৎসাধীন ছিল। সেই সময় আমি তার সঙ্গে ছিলাম। অসুস্থ একজন বন্ধুর পাশে থাকা, তার চিকিৎসার খবর নেওয়া, কথা বলা কিংবা কখনো শুধু নীরবে পাশে বসে থাকা, এসব মুহূর্তের কোনো হিসাব থাকে না। কিন্তু মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো পরে ফিরে তাকালে আরও গভীর হয়ে ওঠে। আজ তার চলে যাওয়ার সংবাদ শুনে সেই সময়টির কথাও মনে পড়ছে।
তার পেশাগত জীবন, সাংবাদিকতা ও অবদান নিয়ে অনেকেই লিখবে। কিন্তু আমার কাছে তৌফিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল অন্য জায়গায়। আমার স্মৃতিতে সে আজও সেই কিশোর, যে আমার সঙ্গে ঢাকা রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজে একই সময়ের জীবন পার করে বড় হয়েছিল।
এত বছর, এত দূরত্ব, এত পরিবর্তনের পরও সেই পুরোনো বন্ধুটিকে আমি কখনো পুরোপুরি হারিয়ে ফেলিনি। তাই আজ তার চলে যাওয়ার খবর শুধু একজন পরিচিত সাংবাদিকের মৃত্যু সংবাদ নয়, আমার নিজের জীবনের একটি টুকরো সময় হারিয়ে যাওয়ার মতো। মনে হচ্ছে, আমাদের কৈশোরের সেই দিনগুলোর আরেকটি দরজা আজ চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেল।
বন্ধুর মৃত্যু আমাদের নিজেদের জীবনকেও যেন আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। মনে হয়, আমরা যারা একই সময়ে বড় হয়েছি, তাদের একজন চলে গেলে শুধু একজন মানুষই চলে যায় না, তার সঙ্গে আমাদের জীবনের একটি সময়ও যেন একটু একটু করে দূরে সরে যায়।
প্রায় ৩৬ বছর পর ২০১৭ সালে যে বন্ধুত্বের দরজা আবার খুলেছিল, আজ সেই দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে রইল শুধু স্মৃতি। আর সেই স্মৃতির মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে ২০১৮ সালের লন্ডনের সেই প্রায় ৪৮ ঘণ্টা।
শেষবার কখন দেখা হয়েছিল, শেষবার কী কথা হয়েছিল, তখন কেউ জানত না সেটিই হয়তো শেষ দেখা। জীবন কখনো আমাদের আগাম বলে দেয় না কোন সাক্ষাৎ শেষ সাক্ষাৎ, কোন কথাটি শেষ কথা।
বাল্যবন্ধু, তোমার বিদায় বেদনার। তোমার পরিবারের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা। তোমাকে স্মরণ করছি একজন পরিচিত মুখ হিসেবে নয়, একজন পুরোনো বন্ধু হিসেবে।
লেখক : রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন