দেশে রক্তদানের উপযুক্ত মানুষের সংখ্যা বিপুল। রক্ত সঞ্চালন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে, প্রচলিত বয়সসীমা ও জনসংখ্যার কাঠামো বিবেচনায় প্রায় ১২ কোটি মানুষ রক্তদানের সক্ষম বয়সে রয়েছেন।
তাঁদের সামান্য একটি অংশও নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্ত দিলে দেশের রক্তের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব। অথচ অস্ত্রোপচার, দুর্ঘটনা, প্রসবজনিত রক্তক্ষরণ কিংবা থ্যালাসেমিয়ার মতো রোগে রক্তের প্রয়োজন হলেই দাতা খুঁজতে হিমশিম খেতে হয় রোগীর স্বজনদের।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশবিষয়ক তথ্যে দেশে বছরে আনুমানিক ৮ থেকে ১০ লাখ ইউনিট রক্তের প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সংগৃহীত রক্তের তুলনামূলক ছোট একটি অংশ আসে স্বেচ্ছায় ও বিনা পারিশ্রমিকে রক্তদানকারীদের কাছ থেকে। বাকি রক্তের বড় অংশের জন্য নির্ভর করতে হয় রোগীর স্বজন বা বিকল্প দাতাদের ওপর।
অর্থাৎ দেশের সংকট শুধু রক্তের পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রক্ত সংগ্রহ, পরীক্ষা, সংরক্ষণ, বণ্টন এবং নিয়মিত স্বেচ্ছা রক্তদাতা তৈরির দুর্বলতা। এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে রোগী ও তাঁদের পরিবারের ওপর।
রক্তদানের উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি, সুযোগের অভাব, স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে ভুল ধারণা, দাতাদের সঙ্গে অসহযোগিতামূলক আচরণ এবং রক্ত ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, নিরাপদ রক্ত নিশ্চিত করা এবং থ্যালাসেমিয়াসহ দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে এমন রোগীদের জন্য নিয়মিত রক্তের জোগান বজায় রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ।
এক দশকেও বাড়েনি স্বেচ্ছা রক্তদাতার অংশ
২০১৫ সালে দেশে প্রায় ৬ লাখ ইউনিট রক্ত সংগ্রহ করা হয়েছিল। সে সময় বার্ষিক চাহিদা ছিল ৮ লাখ ইউনিটের বেশি। সংগৃহীত রক্তের মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ এসেছিল স্বেচ্ছা দাতাদের কাছ থেকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে জাতীয় নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন কর্মসূচির তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশে মোট ৯ লাখ ৬০ হাজার ৯৮১ ইউনিট রক্ত সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে সরকারি খাতে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ৩৩৯ ইউনিট এবং বেসরকারি খাতে ২ লাখ ৫ হাজার ৬২৪ ইউনিট সংগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর সংগৃহীত রক্তের ৭৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ এসেছিল আত্মীয় বা বিকল্প দাতাদের কাছ থেকে। স্বেচ্ছা রক্তদাতাদের অবদান ছিল ২৪ দশমিক ২৬ শতাংশ।
অর্থাৎ রক্ত সংগ্রহের পরিমাণ বাড়লেও নিয়মিত স্বেচ্ছা রক্তদাতার ওপর নির্ভরতা প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। দেশে স্বেচ্ছা রক্তদাতা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার জন্য একক জাতীয় প্রতিষ্ঠানের অভাবও রয়েছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট, সন্ধানী, বাঁধন ও কোয়ান্টামসহ বিভিন্ন সংগঠন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সামগ্রিক ব্যবস্থাটি এখনো বিকেন্দ্রীভূত।
রিদম ব্লাড ব্যাংকের পরিচালক ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, দেশে রক্তদাতার অভাবের চেয়ে বড় সমস্যা হলো, সক্ষম মানুষের একটি বড় অংশ নিয়মিত রক্তদানের সঙ্গে যুক্ত নন। তাঁর মতে, মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ মানুষ নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্ত দিলে রক্তের সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব।
রক্তদান কি সত্যিই স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী?
রক্তদানের উপকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। তবে নিয়মিত রক্তদান করলেই হৃদ্রোগ, ক্যানসার বা অন্য কোনো রোগের ঝুঁকি নিশ্চিতভাবে কমে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে গবেষণার সীমাবদ্ধতা ও চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণ বিবেচনা করা জরুরি।
রক্তদানের আগে সাধারণত দাতার স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য, রক্তচাপ, পালস ও হিমোগ্লোবিনের মাত্রা যাচাই করা হয়। সংগৃহীত রক্তে এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি ও সি, সিফিলিসসহ নির্দিষ্ট সংক্রমণের পরীক্ষা করা হয়। তবে এসব পরীক্ষা মূলত রক্তগ্রহীতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য; এগুলোকে দাতার পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
ট্রান্সফিউশন মেডিসিন ও ইমিউনোহেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, মানবদেহের লোহিত রক্তকণিকার স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল প্রায় ১২০ দিন। রক্তদানের পর শরীর ধীরে ধীরে হারানো রক্তকণিকা তৈরি করে এবং রক্তের তরল অংশের ঘাটতি তুলনামূলক দ্রুত পূরণ হয়। তবে রক্তদানের উপযোগিতা নির্ভর করে দাতার বয়স, হিমোগ্লোবিন, শারীরিক অবস্থা এবং নির্ধারিত বিরতি মেনে চলার ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ ও যোগ্য ব্যক্তির নিয়ম মেনে রক্তদান সাধারণত নিরাপদ। তবে রক্তস্বল্পতা বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যসমস্যা থাকলে রক্ত দেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
এক ব্যাগ রক্তে উপকৃত হতে পারেন একাধিক রোগী
রক্তের চাহিদা ও সরবরাহের হিসাব করতে শুধু কত ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ হয়েছে, তা দেখলেই পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। কারণ, সংগৃহীত পূর্ণ রক্ত প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন উপাদানে ভাগ করা সম্ভব। রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী লোহিত রক্তকণিকা, প্লাটিলেট ও প্লাজমার মতো উপাদান আলাদাভাবে ব্যবহার করা যায়। এতে একটি রক্তদান থেকে একাধিক রোগীর উপকৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৫০টি কেন্দ্রে রক্তের বিভিন্ন উপাদান প্রস্তুত করা হয়। এসব কেন্দ্রে লোহিত রক্তকণিকা, প্লাটিলেটসমৃদ্ধ প্লাজমা, প্লাটিলেট, তাজা ও হিমায়িত প্লাজমা এবং ক্রায়োপ্রেসিপিটেটসহ বিভিন্ন উপাদান তৈরি করা হয়। সরকারি খাতের ১৪টি কেন্দ্রে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্লাটিলেট সংগ্রহের ব্যবস্থাও রয়েছে।
রোগীর অবস্থাভেদে রক্তের উপাদানের প্রয়োজন আলাদা হয়। দুর্ঘটনা বা অস্ত্রোপচারে লোহিত রক্তকণিকা প্রয়োজন হতে পারে। ডেঙ্গুসহ নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে প্লাটিলেট এবং রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা বা বিশেষ ধরনের রক্তক্ষরণে প্লাজমার প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বেশি রক্ত সংগ্রহ করাই যথেষ্ট নয়; সংগৃহীত রক্তের নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে উপাদান পৃথকীকরণ, সংরক্ষণ এবং বিতরণের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
রক্তদানে আগ্রহ আছে, বাধা সচেতনতা ও সুযোগের অভাব
রক্ত না দেওয়ার জন্য সাধারণত মানুষের অনীহা ও অসচেতনতাকে দায়ী করা হয়। তবে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এর পেছনে জ্ঞানের ঘাটতি, সুযোগের অভাব, সুইভীতি এবং রক্তদানে শারীরিক ক্ষতি হতে পারে—এমন ভুল ধারণাও কাজ করে।
জামালপুরে ৫১২ জন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের ৯২ শতাংশ কখনো রক্ত দেননি। তবে ৪২ শতাংশের বেশি নিয়মিত রক্তদাতা হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। রক্ত না দেওয়ার কারণ হিসেবে ৪০ শতাংশ জ্ঞানের ঘাটতি, ২০ শতাংশ সুযোগের অভাব, ২১ শতাংশ স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কা এবং ১৬ শতাংশ সুইভীতির কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া ৬১ শতাংশ কোনো রক্তদান কর্মসূচির কথা শুনেছেন বলে মনে করতে পারেননি।
২০২৪ সালে খুলনা শহরের ৬৯৭ জনের ওপর পরিচালিত গবেষণাতেও রক্তদানের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাবের পাশাপাশি নিয়মিত রক্তদানের চর্চা ও জ্ঞানের ঘাটতি উঠে আসে। গবেষকেরা সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানোর সুপারিশ করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল সেবা ব্যবস্থাপনা বিভাগের লাইন পরিচালক ডা. মো. জয়নাল আবেদীন টিটো বলেন, দেশে রক্তের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। এ চাহিদা পূরণে নিয়মিত ও স্বেচ্ছায় রক্তদানের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষ করে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে, যাতে রক্তের অভাবে কোনো জীবন ঝুঁকিতে না পড়ে।
দাতাদের আস্থা ফেরানোও জরুরি
রক্তদানে আগ্রহী মানুষকে নিয়মিত দাতায় পরিণত করতে রক্তদানকেন্দ্রের পরিবেশ ও সেবার মানও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে রক্তদাতাদের নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় প্রায় ৬৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী কেন্দ্রের কর্মীদের দুর্বল বা অসহযোগিতামূলক আচরণকে রক্তদানের পথে বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রায় ৫৫ শতাংশ দাতা ব্যক্তিগত তথ্য ও পরীক্ষার ফলের গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। অর্ধেকের বেশি দাতার মধ্যে আশঙ্কা ছিল, তাঁদের স্বেচ্ছায় দেওয়া রক্ত বিক্রি হয়ে যেতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের বাংলাদেশবিষয়ক মূল্যায়নেও স্বেচ্ছা রক্তদাতার স্বল্পতা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অবকাঠামো ও জনবলের সীমাবদ্ধতা, রক্ত সঞ্চালনকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার অসমতা এবং নিয়মিত তদারকি ও গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জাতীয় দিবসকেন্দ্রিক প্রচার বা বিচ্ছিন্ন রক্তদান কর্মসূচি দিয়ে নিয়মিত দাতার সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব নয়। সারা বছর দাতা সংগ্রহ, তাঁদের তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণ, নির্ধারিত সময় পর পুনরায় রক্তদানের আহ্বান এবং রক্তদানকেন্দ্রে সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দাতার ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং সংগৃহীত রক্তের ব্যবহার সম্পর্কে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।
রক্তের সংকটে বেশি ভুগছেন থ্যালাসেমিয়া রোগীরা
রক্ত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সবচেয়ে বড় চাপের মুখে পড়েন নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন হয়—এমন রোগীরা। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও প্রকট। তাঁদের জন্য রক্ত কোনো আকস্মিক চিকিৎসা-উপকরণ নয়; বরং নিয়মিত চিকিৎসার অপরিহার্য অংশ।
বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, তাদের হাসপাতালে প্রায় ৭ হাজার ৮০০ রোগী নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাঁদের অনেকের প্রতি মাসে এক থেকে দুই ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। ফাউন্ডেশনের হিসাবে, চিকিৎসাধীন রোগীদের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১২০ ব্যাগ রক্ত দরকার।
থ্যালাসেমিয়া রোগীদের অভিভাবকদের নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবার নিয়মিত রক্তদাতা সংগ্রহে সমস্যার কথা জানিয়েছে। একই গবেষণায় প্রায় ৮১ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তারা কোনো সংগঠিত রক্তদাতা সংগঠনের সহায়তা পায়নি।
বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দা মাসুমা রহমান বলেন, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের নিয়মিত রক্তের প্রয়োজন হয়। তাই তাঁদের জন্য নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন রক্তের সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। নিয়মিত স্বেচ্ছা রক্তদাতা তৈরি করা গেলে রোগী ও তাঁদের পরিবারের ওপর রক্ত সংগ্রহের চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
পর্যাপ্ত রক্তের পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে নিরাপত্তা
রক্তের সংকট বলতে শুধু পর্যাপ্ত রক্ত না থাকাকে বোঝায় না; সংগৃহীত রক্ত নিরাপদ কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি ও সি, সিফিলিসসহ বিভিন্ন সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সংগৃহীত সব রক্ত ব্যবহারের আগে নির্ধারিত সংক্রমণগুলোর জন্য মানসম্মত পরীক্ষা, রক্তের গ্রুপ ও সামঞ্জস্য যাচাই এবং পরীক্ষার ফলের গুণগত মান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়। পাশাপাশি প্রশিক্ষিত জনবল, যথাযথ নথিপত্র সংরক্ষণ, রক্তের সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখা এবং নিয়মিত মান যাচাইয়ের ব্যবস্থাও জরুরি।
কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৩ সালের মে পর্যন্ত সংগৃহীত ২৬৯ ব্যাগ রক্ত পরীক্ষা করা হয়েছিল। একই সময়ে কক্সবাজারের সাতটি উপজেলায় ২ হাজার ৩৭১টি রক্ত সঞ্চালনের মধ্যে ৫৮০টি থ্যালাসেমিয়া রোগীর চিকিৎসায়, ৫৩৮টি রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় এবং ৩৮৯টি প্রসূতিসংক্রান্ত চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু রক্ত পরীক্ষা করা হচ্ছে কি না, তা দিয়ে নিরাপদ রক্ত নিশ্চিত হয়েছে বলা যায় না। পরীক্ষার মান, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, কিটের গুণগত মান, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং ফলাফল সংরক্ষণের পুরো ব্যবস্থাই মানসম্মত হতে হবে।
রিদম ব্লাড ব্যাংকের পরিচালক ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, প্রতিটি রক্তকেন্দ্রে একই মানদণ্ডে রক্ত পরীক্ষা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। কোথাও ভালো মানের পরীক্ষা হলেও অন্য কোথাও দুর্বল পরীক্ষা হলে জাতীয় রক্তব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়ের রোগী নিরাপত্তা ও রক্তের নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মকর্তা ডা. মুরাদ সুলতান বলেন, সব রক্তকেন্দ্রে একই মানের পরীক্ষা হচ্ছে কি না, পরীক্ষার ফলের গুণগত মান কীভাবে যাচাই করা হচ্ছে, সংরক্ষণ ও পরিবহনে নির্ধারিত মান বজায় থাকছে কি না এবং রক্ত সঞ্চালনের পর বিরূপ প্রতিক্রিয়া শনাক্তের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—এসব বিষয়ও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রক্তের সংকট কাটাতে কী করা প্রয়োজন?
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, রক্তের সংকট মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। দেশের সব রক্তকেন্দ্র, হাসপাতাল ও স্বেচ্ছা রক্তদাতা সংগঠনকে অভিন্ন তথ্যব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে কোন এলাকায় কখন কোন রক্তের গ্রুপ ও উপাদানের চাহিদা রয়েছে, কত রক্ত মজুত আছে এবং কতজন সক্রিয় দাতা রয়েছেন—তা নিয়মিত হালনাগাদ রাখা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে রক্ত সংগ্রহ, পরীক্ষা, সংরক্ষণ এবং রক্তের উপাদান পৃথকীকরণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সারা বছর রক্তদান কর্মসূচি পরিচালনা করা প্রয়োজন।
অধ্যাপক ডা. সৈয়দা মাসুমা রহমানের মতে, স্বেচ্ছা রক্তদাতাদের জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পর পুনরায় রক্তদানের আহ্বান, দাতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং রক্তের ব্যবহার সম্পর্কে স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। পেশাদার দাতার ওপর নির্ভরতা কমাতে কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগও প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল সেবা ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক লাইন পরিচালক ডা. মো. জয়নাল আবেদীন (টিটো) বলেন, প্রতিটি রক্তকেন্দ্রে একই মানদণ্ডে রক্তবাহিত সংক্রমণের পরীক্ষা, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক সংরক্ষণ ও পরিবহন নিশ্চিত করতে হবে। রক্ত সংগ্রহ থেকে রোগীর শরীরে প্রয়োগ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের তথ্য সংরক্ষণ ও নিয়মিত প্রকাশ করাও জরুরি।
দেশে রক্তদানের সক্ষম মানুষের সংখ্যা বিপুল হলেও তাঁদের নিয়মিত স্বেচ্ছা রক্তদানে যুক্ত করতে না পারলে সংকট পুরোপুরি কাটানো কঠিন। তাই সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সহজলভ্য, নিরাপদ ও সমন্বিত রক্ত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপরই জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.