শুক্রবার , ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আন্তর্জাতিক
  4. খেলা
  5. খেলাধুলা
  6. জাতীয়
  7. তথ্য-প্রযুক্তি
  8. দেশজুড়ে
  9. প্রবাস
  10. প্রাকৃতিক দুর্যোগ
  11. বিনোদন
  12. মতামত
  13. রাজনীতি
  14. লাইফস্টাইল
  15. শিক্ষা

পাগলা মসজিদের টানে কেন দূরদূরান্ত থেকে আসেন মানুষ?


সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬ ৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

নরসুন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মসজিদকে ঘিরে মানুষের এমন আকর্ষণ যেখানে প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে। কারও হাতে দানের টাকা, কারও হাতে স্বর্ণালংকার, আবার কেউ নিয়ে আসেন গরু-ছাগল কিংবা হাঁস-মুরগি। অনেকে আসেন শুধু নামাজ পড়তে, কেউ মানত নিয়ে, কেউবা মনের কথা আল্লাহর কাছে জানাতে। কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ যেন ধর্মীয় আবেগ, ইতিহাস, লোককথা ও মানুষের বিশ্বাসের এক অনন্য মিলনস্থল।

প্রায় আড়াইশ বছরের পুরোনো এই মসজিদ কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়; সময়ের সঙ্গে এটি কিশোরগঞ্জের অন্যতম পরিচিত ঐতিহাসিক স্থাপনা ও আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। মসজিদকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাসের পাশাপাশি এর বিপুল দানের পরিমাণও দেশজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।

কেন এত মানুষের আকর্ষণ?

পাগলা মসজিদে দান করলে মনের আশা পূর্ণ হয় এমন একটি প্রচলিত বিশ্বাস বহু বছর ধরে মানুষের মধ্যে রয়েছে। এই বিশ্বাসের টানেই দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন। কেউ সন্তান লাভের আশায়, কেউ রোগমুক্তির প্রত্যাশায়, কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যে সাফল্যের জন্য, আবার কেউ মানসিক প্রশান্তির আশায় মসজিদে এসে নামাজ আদায় ও দান করেন।

তবে এ ধরনের বিশ্বাসের সঙ্গে ইসলামের আকীদার বিষয়টি আলাদা করে দেখা জরুরি। আলেমদের একটি অংশের মতে, মসজিদে দান করা সওয়াবের কাজ হলেও কোনো নির্দিষ্ট স্থানে দান করলেই মনোবাসনা পূরণ হবে এমন বিশ্বাস ইসলামের মূল আকীদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দানের নিয়ত হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।

অন্যদিকে মানুষের বাস্তব অনুভূতি ও বিশ্বাসের জায়গা থেকে পাগলা মসজিদকে ঘিরে তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনের এক সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতি। ফলে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি মসজিদটি এখন মানুষের আবেগ ও ঐতিহ্যেরও অংশ।

বিশেষ করে শুক্রবার পাগলা মসজিদ ও আশপাশের এলাকায় মানুষের ভিড় বেড়ে যায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মুসল্লি ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

দানের ধরনেও বৈচিত্র্য

পাগলা মসজিদের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো এর দানবাক্স। নগদ টাকা-পয়সার পাশাপাশি এসব দানবাক্সে পাওয়া যায় স্বর্ণালংকার, বৈদেশিক মুদ্রা, এমনকি বিভিন্ন ধরনের মূল্যবান সামগ্রী। কেউ কেউ মসজিদে চাল, কুরআন শরীফ, জায়নামাজ, মোমবাতি ও আগরবাতিও দান করেন।

মানুষের সামর্থ্যও এখানে নানা রকম। কেউ বড় অঙ্কের অর্থ দান করেন, আবার কেউ সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প কিছু টাকা দেন। অনেকের কাছে দানের পরিমাণের চেয়ে নিয়ত ও আবেগই বড়।

প্রতি তিন-চার মাস পরপর প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে মসজিদের দানবাক্স খোলা হয়। দানবাক্স খোলার খবর প্রকাশ পেলেই দেশজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়।

এক দফাতেই প্রায় ১৬ কোটি টাকা

২০২৬ সালের ২৭ জুন, তিন মাস ২৭ দিন পর পাগলা মসজিদের ১৩টি লোহার দানবাক্স খোলা হয়। সেদিন এসব দানবাক্স থেকে পাওয়া যায় ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা। এর পাশাপাশি পাওয়া যায় বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার।

মসজিদ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রয়েছে। মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্সের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ধর্মীয়, দাতব্য ও সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে এসব অর্থ ব্যয় করা হয়।

জেলা প্রশাসক ও মসজিদ কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন বলেন, পাগলা মসজিদের জমা টাকার লভ্যাংশ থেকে জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় অনুদান দেওয়া হয়। পাশাপাশি অসহায় মানুষ ও জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরও সহায়তা করা হয়।

তিনি জানান, মসজিদের কলেবর বাড়ানোর জন্য আগের সাড়ে পাঁচ একর জায়গার পাশে আরও ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে।

ইতিহাসে পাগলা মসজিদ

কিশোরগঞ্জের ইতিহাসের সঙ্গে পাগলা মসজিদের সম্পর্ক বহু পুরোনো। সুলতানি ও মুঘল আমলে এ অঞ্চলে অসংখ্য মসজিদ ও ধর্মীয় স্থাপনা গড়ে ওঠে। এর মধ্যে পাগলা মসজিদ সময়ের নানা পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে।

তবে মসজিদটির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে একাধিক কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। এর কোনটি ঐতিহাসিকভাবে কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

একটি প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, এক আধ্যাত্মিক পাগলবেশী ব্যক্তি খরস্রোতা নরসুন্দা নদীর মাঝখানে মাদুর পেতে ভেসে এসে বর্তমান মসজিদের স্থানে অবস্থান নেন। তাঁকে ঘিরে মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে। পরে তার মৃত্যুর পর সমাধির পাশে মসজিদটি গড়ে ওঠে বলে লোকমুখে প্রচলিত আছে।

আরেকটি মত অনুযায়ী, হয়বতনগরের জমিদার দেওয়ান জিলকদর খান ওরফে জিল কদর পাগলা নামের এক আধ্যাত্মিক ব্যক্তি এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন। তার নাম থেকেই মসজিদের নাম ‘পাগলা মসজিদ’ হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

আবার কারও কারও মতে, পাগলা বিবি নামে জমিদার পরিবারের এক নারীর নাম থেকেও মসজিদটির নামকরণ হয়ে থাকতে পারে।

ইতিহাস ও লোককথার এসব ভিন্ন বর্ণনাই পাগলা মসজিদকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ আরও বাড়িয়েছে।

স্থাপত্যেও অনন্য

বর্তমান পাগলা মসজিদ আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। তিনতলা ভবনের ছাদে রয়েছে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার গম্বুজ। পাশাপাশি রয়েছে পাঁচতলা ভবনের সমান উচ্চতার একটি সুউচ্চ মিনার।

মসজিদের প্রশস্ত নামাজকক্ষে একসঙ্গে প্রায় ছয় হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। নারী ও পুরুষের জন্য রয়েছে পৃথক নামাজের ব্যবস্থা।

মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্সের বর্তমান আয়তন প্রায় ৩ একর ৮৮ শতাংশ। তবে এর শুরু হয়েছিল মাত্র ১০ শতাংশ জমি নিয়ে। ওই জমি হয়বতনগর দেওয়ানবাড়ির পক্ষ থেকে ওয়াকফ করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

আরও বড় ইসলামিক কমপ্লেক্সের পরিকল্পনা

পাগলা মসজিদকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে আরও বড় একটি ইসলামিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। মসজিদ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আধুনিক তুরস্কের বসফরাস প্রণালীর তীরে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন বহুমুখী মসজিদের আদলে এখানে একটি আধুনিক ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১০ তলা ভবন নির্মাণ করা হবে। সেখানে একসঙ্গে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি নারীদের জন্য পৃথকভাবে প্রায় পাঁচ হাজার মুসল্লির নামাজের ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পাগলা মসজিদ শুধু ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে নয়, দেশের অন্যতম বড় ইসলামিক কমপ্লেক্স হিসেবেও নতুন পরিচিতি পেতে পারে।

কিশোরগঞ্জের গর্ব

বীর ঈশা খাঁর স্মৃতিবিজড়িত, হাওরবেষ্টিত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ কিশোরগঞ্জের রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। জেলার ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের সঙ্গে শোলাকিয়া ঈদগাহ ও পাগলা মসজিদের নাম বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে।

শোলাকিয়া ঈদগাহে দেশের অন্যতম বৃহৎ ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। আর পাগলা মসজিদ পরিচিতি পেয়েছে মানুষের দান, বিশ্বাস, স্থাপত্য ও ইতিহাসের কারণে।

দিন যত যাচ্ছে, পাগলা মসজিদকে ঘিরে মানুষের আগ্রহও তত বাড়ছে। এর বিপুল দান যেমন দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি এর ইতিহাস ও স্থাপত্যও আকর্ষণ করছে দর্শনার্থীদের।

ধর্মীয় স্থান থেকে সামাজিক প্রতিষ্ঠানে

পাগলা মসজিদের বিশেষত্ব এখানেই যে, এটি কেবল নামাজ আদায়ের স্থান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মানুষের দান থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কাজে ব্যয় করা হয় বলে মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি অসহায় ও জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়। ফলে পাগলা মসজিদকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি বড় সামাজিক পরিসর।

একদিকে ধর্মীয় অনুভূতি, অন্যদিকে মানবিক সহায়তা এই দুইয়ের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠানটি কিশোরগঞ্জের মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

কীভাবে যাবেন?

ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে কিশোরগঞ্জ যাওয়ার জন্য আন্তনগর ট্রেন রয়েছে। সকালবেলার ট্রেনে গেলে দিনের মধ্যেই কিশোরগঞ্জ পৌঁছানো যায়। ট্রেনের শ্রেণিভেদে ভাড়া ও সময় পরিবর্তিত হতে পারে।

কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন থেকে অটোরিকশা বা স্থানীয় যানবাহনে সহজেই পাগলা মসজিদে যাওয়া যায়।

ঢাকার মহাখালী থেকে বিভিন্ন পরিবহনের বাসেও কিশোরগঞ্জ যাওয়া যায়। গোলাপবাগ থেকেও বাস চলাচল করে। কিশোরগঞ্জের গাইটাল আন্তনগর বাস টার্মিনাল থেকে অটোরিকশায় সরাসরি পাগলা মসজিদে যাওয়া যায়।

বিশ্বাস, ইতিহাস আর মানুষের টান

পাগলা মসজিদকে ঘিরে মানুষের আকর্ষণের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ ইতিহাস, নানা কিংবদন্তি, অনন্য স্থাপত্য, ধর্মীয় আবেগ, দানের সংস্কৃতি এবং মানুষের ব্যক্তিগত আশা-আকাঙ্ক্ষা।

কেউ এখানে আসেন ইবাদতের জন্য, কেউ দানের জন্য, কেউ ইতিহাস ও স্থাপত্য দেখতে। আবার কেউ আসেন জীবনের কোনো সংকট থেকে মুক্তির প্রত্যাশা নিয়ে। তাদের প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা হয়তো আলাদা, কিন্তু পাগলা মসজিদকে ঘিরে তাদের আবেগের জায়গাটি অনেকটাই অভিন্ন।

এ কারণেই নরসুন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা পাগলা মসজিদ আজ কিশোরগঞ্জের সীমানা পেরিয়ে দেশের মানুষের কাছে পরিচিত একটি নাম। ইতিহাস, বিশ্বাস, স্থাপত্য ও মানবিক কর্মকাণ্ডের সম্মিলনে মসজিদটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।

📰 ঢাকা ইনফো২৪

দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, প্রবাসীদের তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট

আরও পড়ুন
`);w.document.close();setTimeout(function () { w.focus(); w.print(); }, 500);});});