পাবনায় বাড়ি ও পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য দুগ্ধ খামার ও চিলিং সেন্টার। তবে এর আড়ালে ভেজাল ও নকল দুধ তৈরির অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, গরুর দুধ ছাড়াই পানি ও বিভিন্ন রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে দুধের মতো সাদা তরল। পরে তা বিভিন্ন চিলিং সেন্টার, বাজার ও স্থানীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় বিক্রি করা হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পাবনার ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর ও ফরিদপুর উপজেলায় নামে-বেনামে দুই শতাধিক চিলিং সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে ৯২টি বিভিন্ন স্বনামধন্য কোম্পানির এবং বাকিগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন। সাঁথিয়া, বাঘাবাড়ী ও বেড়া উপজেলাতেও রয়েছে আরও অনেক চিলিং সেন্টার।
বাঘাবাড়ী ঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল দেশের দুধ উৎপাদন, সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণের অন্যতম বড় কেন্দ্র। তবে বেড়া, সাঁথিয়া, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে গোপনে ও প্রকাশ্যে নকল দুধ তৈরির অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ভোর থেকে সকাল ৯টা এবং সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে চলে এসব কার্যক্রম। অভিযোগ রয়েছে, সয়াবিন তেল, গ্লুকোজ, স্যাকারিন, ইউরিয়া, ডিটারজেন্ট পাউডার, কস্টিক সোডাসহ বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে তৈরি করা হয় দুধের মতো সাদা তরল। এতে রং, ঘনত্ব ও চর্বির মাত্রা এমনভাবে তৈরি করা হয় যে সাধারণভাবে দেখে তা বোঝার উপায় থাকে না।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু ব্যবসায়ী বাজার থেকে আসল দুধ কিনে ছানা বা ক্রিম আলাদা করার পর অবশিষ্ট তরল ফেলে না দিয়ে তাতে বিভিন্ন রাসায়নিক মিশিয়ে নকল দুধ তৈরি করেন। এসব দুধ পরে বিভিন্ন চিলিং সেন্টার ও স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা হয়।
ভেজাল কারবারিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৪০ লিটার ননিবিহীন সাদা পানিতে প্রায় ৪৫০ টাকার রাসায়নিক মিশিয়ে কথিত উচ্চফ্যাটযুক্ত দুধ তৈরি করা যায়। পরে ওই পরিমাণ তরল প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করা হয় বলে তাদের দাবি। এতে প্রতি ৪০ লিটারে প্রায় ১ হাজার ৭৫০ টাকা লাভ হয়।
কারবারিরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন রাসায়নিক অনলাইনে অর্ডার বা ফোনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা যায়। কুরিয়ার বা সরবরাহকারীর মাধ্যমে সেগুলো পৌঁছে যায় কথিত কারখানায়।
তাদের অভিযোগ, চিলিং সেন্টারে নকল দুধ সরবরাহের ক্ষেত্রেও অনৈতিক লেনদেনের সুযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিলিং সেন্টার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে।
এদিকে ভেজাল দুধ তৈরির অভিযোগে পাবনায় সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজনকে জরিমানা করা হয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর বেড়ার পেচাকোলা ঘাট এলাকায় উত্তম ঘোষ ও পলি ঘোষ দম্পতিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করে প্রশাসন। এর আগে ৬ সেপ্টেম্বর সাঁথিয়ার নাগডেমড়া এলাকায় জুঁই ডেইরি ফার্মের মালিককে বিভিন্ন অভিযোগে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া ফরিদপুরের কেয়া ডেইরি, আমিনা ডেইরি, প্রিমিয়াম ফুড, বেড়ার জয়দেব ঘোষ ও ভাঙ্গুড়ার সিংগাড়ি গ্রামের আশরাফুল আলীকেও বিভিন্ন সময়ে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।
তবে ভেজাল দুধের কারবারের কারণে প্রকৃত খামারিরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ তাদের। তাদের দাবি, খাঁটি দুধের উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের কমিশন না দেওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে চিলিং সেন্টারে তাদের দুধের চাহিদা কমে যাচ্ছে।
বাওইখোলা গ্রামের খামারি আশরাফুল ইসলাম বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা কম দামে নকল দুধ বিক্রি করায় প্রকৃত খামারিদের বাজার নষ্ট হচ্ছে। বর্তমানে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা লিটার দরে দুধ বিক্রি করে উৎপাদন খরচও উঠছে না বলে দাবি করেন তিনি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এ অঞ্চলের দুগ্ধশিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়বে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও স্থানীয় খামারিদের তথ্য অনুযায়ী, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে চার লাখ লিটার দুধের চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে উৎপাদন হয় প্রায় সাড়ে তিন লাখ লিটার। উৎপাদন ও চাহিদার এই ঘাটতি কাজে লাগিয়ে অসাধু কারবারিরা নকল দুধ বাজারজাত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
চাটমোহরের রামনগর গ্রামের খামারি শাকিল হোসেনের দাবি, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন কারখানায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ দুধ থেকে ছানা ও ফ্যাট আলাদা করা হয়। এতে যে সাদা তরল অবশিষ্ট থাকে, সেটিই রাসায়নিক মিশিয়ে নকল দুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তার অভিযোগ, এসব নকল দুধের একটি অংশ বিভিন্ন অসাধু মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে পৌঁছায়। সেখানে আসল দুধের সঙ্গে নকল দুধ মেশানোরও অভিযোগ করেন তিনি। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
সাঁথিয়ার স্থানীয় দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল লতিফ বলেন, প্রকৃত খামারিরা সাধারণত দুধে ভেজাল মেশান না। অতিরিক্ত লাভের আশায় কিছু অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী ভেজাল দুধ সরবরাহ করেন। চিলিং সেন্টারে যথাযথ মান যাচাই না হওয়ায় তারা সুযোগ পাচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
অবশ্য প্রাণ ডেইরির ব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন) সৈকত শেখ এসব অভিযোগের বিষয়ে বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল সফটওয়্যার ও এলএস মেশিনের মাধ্যমে ১৩ থেকে ১৪ ধাপে দুধ পরীক্ষা করে সংগ্রহ করে। পরীক্ষায় মানদণ্ডে না টিকলে বা ভেজাল ধরা পড়লে দুধ গ্রহণ করা হয় না।
তার দাবি, ভেজাল দুধ গ্রহণ না করায় গত এক বছরে অসাধু চক্রের হামলায় তাদের কয়েকজন চিলিং সেন্টার কর্মী আহত হয়েছেন। তার মতে, শুধু একটি প্রতিষ্ঠান কঠোর ব্যবস্থা নিলেই এ সমস্যা বন্ধ করা সম্ভব নয়। নকল দুধ তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের বিপণন ও পরিবহন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সব দুধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য অভিন্ন মান যাচাই পদ্ধতি বা এসওপি বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
মিল্ক ভিটার অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক ডা. সাইদুল ইসলাম বলেন, তাদের চিলিং সেন্টারগুলোতে দুধ সংগ্রহের সময় ফ্যাট, এসএনএফ এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় ভেজাল বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ধরা পড়লে দুধ তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল ও ধ্বংস করা হয়।
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির বলেন, প্রাকৃতিক দুধে বিভিন্ন উপাদানের স্বাভাবিক ভারসাম্য থাকে। কৃত্রিমভাবে চর্বির মাত্রা তৈরি করা গেলেও দুধের প্রকৃত গঠন ও পুষ্টিমান নকল করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, প্রাথমিক পরীক্ষায় কিছু ভেজাল শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। এ জন্য স্বীকৃত পরীক্ষাগারে নির্দিষ্ট রাসায়নিক পরীক্ষা প্রয়োজন।
পাবনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদ ভেজাল দুধে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিকের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তার ভাষ্য, রাসায়নিকযুক্ত দুধ বিশেষ করে শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, ভেজাল দুধ প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে দুধে ব্যবহৃত রাসায়নিক শনাক্ত করার জন্য পাবনায় আধুনিক পরীক্ষাগার না থাকায় কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমানে রাজশাহী থেকে মাসে একবার ভ্রাম্যমাণ ল্যাব আসে। জেলায় একটি স্থায়ী ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এটি চালু হলে ভেজাল দুধ শনাক্ত ও প্রতিরোধে কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে বলে জানান তিনি।