ছবি: প্রতিনিধি
বানিয়াচং উপজেলার গরিব হোসেন মহল্লার বাসিন্দা জয়নাল মিয়ার সঙ্গে গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় দেখা হয় হবিগঞ্জ শহরের টাউন হল রোডে। হাতে বাঁশের লাঠিতে ঝোলানো ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার নানা আকারের পতাকা, কাঁধে ব্যাগভর্তি মাথার ব্যান্ড ও হাতের ব্যাজ। বিশ্বকাপ এলেই এসব নিয়ে শহরের অলিগলি ঘুরে ফেরি করেন তিনি।
কথায় কথায় জানা গেল, বিশ্বকাপ মৌসুমেই জেলার বিভিন্ন স্থানে পতাকা বিক্রি করেন জয়নাল। বছরের বাকি সময় কৃষিকাজই তার পেশা। পাঁচ ছেলের মধ্যে দুজন প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে, বাকিরা এখনো বিদ্যালয়ে যাওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি। সারাদিন শহরে পতাকা বিক্রি করে রাতে বাড়ি ফেরেন তিনি।
জয়নাল জানান, ২০০৬ সালে চাচার হাত ধরে এ ব্যবসায় নামেন। সে হিসাবে এবার তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। পাইকারি বাজার থেকে পতাকা ও আনুষঙ্গিক সামগ্রী কিনে পায়ে হেঁটে বিক্রি করেন। গত মঙ্গলবার ২ হাজার ৭০০ টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকেল পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল প্রায় ১ হাজার টাকার। তবে বৃষ্টির কারণে কিছু সময় বিক্রি বন্ধ ছিল।
মৌসুমি এ ব্যবসার বর্তমান অবস্থা নিয়ে আক্ষেপ করে জয়নাল বলেন, “আগে ফুটপাতে এত দোকান ছিল না, অনলাইনেও এত প্রসার ছিল না। তখন বেশির ভাগ ক্রেতাই আমাদের কাছ থেকে কিনতেন। এখন প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় বিক্রি কমেছে। তবু বাড়তি আয়ের আশায় চার বছর পরপর বিশ্বকাপ এলেই আমি হবিগঞ্জে ছুটে আসি।”
সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হয় বলেও জানান তিনি। আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রায়ই মেলে না। ধারদেনা করেই চলতে হয়। তার ভাষায়, “প্রতি মাসেই ধারদেনা, টানাটানি থাকে। তাই নিজের জন্য কম খরচ করি; কিন্তু বাচ্চাদের যেন কোনো কষ্ট না হয়, সেই চেষ্টা করি।” বড় লাভ না হলেও মানুষের বিশ্বকাপ উৎসবের অংশ হতে পারাটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
‘সিজন হইল বিশ্বকাপের’
হবিগঞ্জ শহরের চৌধুরীবাজার এলাকায় ভ্যানে জামা-প্যান্ট বিক্রি করেন লাখাই উপজেলার মতি মিয়া। প্রতিদিন বাড়ি থেকে শহরে এসে নিয়মিত পোশাকের পাশাপাশি এবার বিভিন্ন দলের জার্সিও বিক্রি করছেন।
তিনি বলেন, “সিজন হইল বিশ্বকাপের। তাই অন্য কাপড়ের পাশাপাশি মানুষ এখন পছন্দের দলের জার্সি কিনবে। তাই আমিও জার্সি আনছি। এগুলো বেচে কয়েকটা টাকা বাড়তি কামাই হবে।”
তিনি জানান, সবচেয়ে বেশি চাহিদা আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সির। হাসতে হাসতে বলেন, “দেশে তো বেশি মানুষই আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল করে। আমি নিজেও করি আর্জেন্টিনা।”
ব্যবসার অবস্থা সম্পর্কে তার মূল্যায়ন, “খুব বেশি ভালোও না, আবার খারাপও না। কোনো দিন বেশি বিক্রি হয়, কোনো দিন কম। এখন বিশ্বকাপের সময়ে জার্সিই বেশি বিক্রি হচ্ছে।” ১৩ হাজার টাকার জার্সি এনে গতকাল বুধবার পর্যন্ত প্রায় ৭ হাজার টাকার বিক্রি করেছেন বলে জানান তিনি।
বাজার পরিস্থিতির প্রভাব সংসারেও পড়েছে বলে জানান মতি মিয়া। তার ভাষায়, “আগে যে টাকায় এক সপ্তাহের বাজার হতো, এখন ওই টাকায় দুই-তিন দিনের বেশি চলে না। মেয়ের পড়ালেখা, বাসাভাড়া, খাওয়া-দাওয়া—সব মিলিয়ে খরচ আর খরচ। তাই এ রকম সিজন এলে দু-একটা বাড়তি টাকা কামাইয়ের আশাতেই জার্সি আনি।”
নতুন চাহিদা স্পেন, ফ্রান্স ও পর্তুগালের জার্সি
প্রথমে হবিগঞ্জ শহরের শায়েস্তানগর এবং বর্তমানে শ্মশানঘাট এলাকায় ১৫ বছর ধরে ভ্রাম্যমাণভাবে গেঞ্জি, ট্রাউজার, হাফপ্যান্ট ও শার্ট বিক্রি করছেন হারুনুর রশিদ। ঢাকার বঙ্গবাজার থেকে পণ্য সংগ্রহ করেন তিনি। বিশ্বকাপ এলেই নিয়মিত পোশাকের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের ফুটবল দলের জার্সি ও শর্টসও তোলেন দোকানে।
হারুনুর রশিদ জানান, এবার কয়েক দফায় প্রায় ৬০ হাজার টাকার জার্সি ও প্যান্ট কিনেছেন। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকার বিক্রি হয়েছে। আগে তার দোকানে মূলত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও জার্মানির জার্সি থাকলেও এবার ক্রেতাদের চাহিদায় স্পেন, ফ্রান্স ও পর্তুগালের জার্সিও এনেছেন।
তার দোকানে শিশুদের জার্সি ১২০ থেকে ১৫০ টাকা এবং বড়দের জার্সি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তিনি জানান, মে মাসের ২০ তারিখের দিকে এসব জার্সির পাইকারি দাম ছিল ১০০ থেকে ২০০ টাকা। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর প্রতিটি জার্সির পাইকারি দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে।
এর প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়েছে। হারুনুর রশিদের ভাষায়, “দুই-তিনশ টাকা বেশি দাম দিয়ে মানুষ ফুটপাত থেকে জিনিস কিনতে চায় না; কিন্তু পাইকারিতেই তো দাম বেড়ে গেছে। তাই আমরাও দাম বাড়িয়ে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।”
দাম বাড়ায় বিক্রি কিছুটা কমেছে। তবে জনপ্রিয় দলগুলো এগিয়ে গেলে সমর্থকদের জার্সি কেনার আগ্রহও বাড়বে—এমন আশায় পর্যাপ্ত সরবরাহ ধরে রেখেছেন তিনি।