সার্বিয়াকে শিক্ষার্থীরা যেভাবে পুনরুদ্ধার করল

মতামত

সার্বিয়াকে শিক্ষার্থীরা যেভাবে পুনরুদ্ধার করল
সার্বিয়ার নির্বাচনে বিজয়ের পর সার্বিয়ার তরুণদের উদ্‌যাপন

দুই বছর আগের কথা, রাজনীতি নিয়ে আমার কোনো রকম উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। আমি তখন নিজের শহর নোভি সাদের ‘ফ্যাকাল্টি অব টেকনিক্যাল সায়েন্সেসে’ হিউম্যান রিকোর্স বিষয়ে পিএইচডি করছিলাম; স্বাভাবিক নিয়মেই কাটছিল জীবন।

কিন্তু ২০২৪ সালের নভেম্বরে নোভি সাদের সদ্য সংস্কার করা ট্রেন স্টেশনের ছাউনি ভেঙে পড়ে ১৬ জন মানুষের প্রাণ কাড়ল, আর সবকিছু বদলে গেল। মর্মন্তুদ এই ঘটনার প্রতিবাদে আমি রাস্তায় নেমে মিছিলে যোগ দিলাম। আমার মতো আরও অনেকেরই সেদিন মনে হয়েছিল—এবার সত্যিই একটা বড় পরিবর্তনের সময় এসেছে।

এটা কিন্তু কোনো এড়ানো-অসম্ভব দুর্ঘটনা ছিল না। কাঠামোগত দুর্নীতি আর বিচারহীনতার সংস্কৃতিই যে এই ধসের মূল কারণ, তা একেবারেই স্পষ্ট ছিল। অথচ একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চালিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করার বদলে ন্যায়বিচারের দাবি তোলায় কর্তৃপক্ষ উল্টো আমাদের ওপর চড়াও হলো।

আমাদের নামানো হলো রাজপথে, চলল কাদা ছোড়াছুড়ি ও আক্রমণ; আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নীরব দর্শক হয়ে রইল। বাধ্য হয়ে আমরা আমাদের শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আশ্রয় নিলাম, অনুষদের ভবনগুলোতে নিজেদের অবরুদ্ধ করে দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিলাম।

সার্বিয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ উপেক্ষিত হয়ে এসেছে, কিন্তু আমাদের প্রতিবাদী সভাগুলোতে আমরা নিশ্চিত করেছি যেন তা মেনে চলা হয়। আন্দোলন যতই দানা বেঁধেছে, প্রতিটি প্রতিবাদের লক্ষ্য আমরা সুনির্দিষ্ট রেখেছি—একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারকে আমাদের দাবি মানতে বাধ্য করা।

যেকোনো স্বাধীন দেশে যেসব দাবি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই মেনে নেওয়া হতো, আমরা তেমন কিছু মৌলিক দাবিই করেছিলাম। যেমন নোভি সাদ রেলওয়ে স্টেশনের সংস্কার–সংক্রান্ত সব নথি কোনো রকম কাটছাঁট ছাড়া প্রকাশ করতে হবে এবং কাজের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

রাজপথে আমাদের ওপর যারা হামলা চালিয়েছিল, তাদের গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এসব দাবি মানার বদলে, রাষ্ট্রে বসে থাকা কর্তাব্যক্তিরা আমাদের ‘ফ্যাসিস্ট’ ও ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিতে শুরু করলেন।

সার্বিয়ার নির্বাচনের দৃশ্য
সার্বিয়ার নির্বাচনের দৃশ্য

সোচ্চার হওয়ার কারণে আমাকে ব্যক্তিগতভাবেও নিশানা বানানো হলো। সংবাদমাধ্যম ও যোগাযোগের দায়িত্বে থাকায়, দেশের হাতে গোনা দু-একটি স্বাধীন গণমাধ্যমে আমাকে সাক্ষাৎকার দিতে হতো। এর পরিণতিতে শাসকের প্রচারযন্ত্র আমার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার অর্থ পাচার এবং বিদেশি শক্তির সঙ্গে ষড়যন্ত্রের কাল্পনিক অভিযোগ আনল।

রাষ্ট্রদ্রোহের মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে অনেককে দেশ ছাড়তে হলো; কেউ কেউ ভুয়া ও বেআইনিভাবে সংগ্রহ করা প্রমাণের ভিত্তিতে মাসের পর মাস বন্দী রইলেন।

আমাদের অনেকের ওপর নজরদারি চালানো হলো, মা-বাবাকে হুমকি দেওয়া হলো, চাকরিচ্যুত করা হলো এবং সরকার সমর্থক ট্যাবলয়েডগুলোতে নাম ধরে টানাটানি করা হলো।

কিন্তু কোনো ভয়ভীতিই আমাদের দমাতে পারেনি, বরং আমাদের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছে। শেষ পর্যন্ত যখন পরিষ্কার হয়ে গেল যে এই শাসকগোষ্ঠী কখনো নতি স্বীকার করবে না, তখন আমরা নিজেরাই নির্বাচনের ময়দানে নামার সিদ্ধান্ত নিলাম।

আর এভাবেই জন্ম নিল ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’। উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক আলোচনার মাধ্যমে আমরা সততা ও যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষদের মনোনীত করলাম—এমন কিছু মানুষকে, যাঁরা এক স্তব্ধ হয়ে যাওয়া সমাজের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

আমরা আমাদের দেশকে মুক্ত করেছি এবং সার্বিয়ার স্বাধীন নাগরিক হিসেবে আজ আমরা গর্বিত। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন যদি কোনো কিছু প্রমাণ করে থাকে, তা হলো—এই দেশ কোনো অস্পৃশ্য শাসকগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।

আমাদের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট ও অবিচল—আমরা চেয়েছিলাম সার্বিয়া চলুক আইনের শাসনে, স্বাধীন পাবলিক প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা এবং বিভাজিত এক জাতির মধ্যে পারস্পরিক সংহতির ওপর ভিত্তি করে।

পুরো সার্বিয়াজুড়ে আমরা হাজার হাজার কিলোমিটার পথ হেঁটেছি, নিরলস প্রচারণা চালিয়েছি—আর আমার বিশ্বাস, এর মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের মনে ফের আশার আলো জ্বলে উঠেছিল। সরকারের কোনো মিথ্যা প্রচারণাই সেই ভেজালহীন তৃণমূল গণজোয়ারকে চেপে রাখতে পারেনি।

অবশেষে সেই সরকারের পতন ঘটেছে, আর এখন শুরু হচ্ছে সার্বিয়াকে নতুন করে গড়ে তোলার যৌথ প্রচেষ্টা। ঠিকই, সমালোচকেরা হয়তো তর্ক তুলতে পারেন যে আমরা সংসদে রাজনীতিতে অনভিজ্ঞদের বসিয়েছি।

কিন্তু আসল সত্য হলো, আমরা এমন মানুষদের সংসদীয় আসনগুলোতে এনেছি, যাঁরা দেশের সেবা করতে ব্যাকুল এবং শেখার মানসিকতা রাখেন।

সার্বিয়ার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের দৃশ্য
সার্বিয়ার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের দৃশ্য

আমাদের নতুন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে রয়েছেন অধ্যাপক, চিকিৎসক, আইনজীবী, কৃষক ও বিজ্ঞানী—যাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ। তাঁদের সবারই রয়েছে সৎ কাজ ও নাগরিক সততার এক দীর্ঘ উজ্জ্বল রেকর্ড।

প্রথাগত রাজনৈতিক পটভূমি তাঁদের না থাকতে পারে, কিন্তু বিগত দুই বছর ধরে তাঁরা সুশাসন ও জনআস্থা অর্জনের বাস্তবতা খুব কাছ থেকে অধ্যয়ন করেছেন। সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত না থাকার এই বিষয়টিই আসলে সার্বিয়ার মানুষকে আমাদের ওপর আস্থা রাখতে উৎসাহিত করেছে—তারা কোনো চটকদার বক্তৃতা বা কূটকৌশলে ভোট দেয়নি, তারা ভোট দিয়েছে সৎ ও নিষ্কলঙ্ক মানুষকে।

এই বিজয়ের পর আমরা রাতারাতি অলৌকিক কোনো পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না, আর তেমন কিছু আশাও করছি না। আমরা সার্বিয়ার জন্য খুব স্বাভাবিক কিন্তু মৌলিক একটি পরিবর্তন চাই—একটি স্বাভাবিক, সঠিকভাবে কাজ করা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা।

আমাদের এই প্রথম কাজই হবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া। আর তার জন্য প্রয়োজন শতভাগ স্বাধীন প্রসিকিউটর, সম্পূর্ণ স্বচ্ছ সরকারি কেনাকাটা বা ঠিকাদারি প্রক্রিয়া এবং যারা রাষ্ট্রীয় সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করে লুটপাট করেছে, তাদের আইনগত জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী ও সরকারি কর্মকর্তারা রাজনৈতিক দলের দাসত্ব করতে বাধ্য হয়েছেন এবং তাঁদের অভিজ্ঞতার কোনো মূল্যায়ন হয়নি। আমরা সেই নিষ্ঠাবান সরকারি কর্মচারীদের মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে চাই।

আমরা আমাদের দেশকে মুক্ত করেছি এবং সার্বিয়ার স্বাধীন নাগরিক হিসেবে আজ আমরা গর্বিত। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন যদি কোনো কিছু প্রমাণ করে থাকে, তা হলো—এই দেশ কোনো অস্পৃশ্য শাসকগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।

এই দেশ আমাদের সবার। আমরা প্রমাণ করেছি মানুষের আত্মমর্যাদা নিয়ে কোনো আপস হয় না। এবার আসল কাজ শুরু। এই বিজয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ভয়ের রাজত্বের অবসান ঘটল। বহু বছরের মধ্যে এই প্রথম, আমরা মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পারছি।

  • নোভাক সিমিইন সার্বিয়ার স্টুডেন্ট লিস্ট আন্দোলনের সদস্য। দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।

ঢাকা ইনফো ২৪ একটি বহুমুখী তথ্য বাতায়ন যেখানে আপনি পাবেন ব্রেকিং নিউজ, লাইফস্টাইল গাইড এবং ক্যারিয়ার বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ সব আপডেট। আপনার প্রতিদিনের তথ্যের চাহিদা মেটাতে আমরা আছি আপনার পাশে।

সূত্র: প্রথম আলো · মতামত